পুরানোর গন্ধ

রুদ্রাক্ষ রহমান

সবাই পুরানোর গন্ধ-ঘ্রাণ পায় না; কেউ কেউ পায়। পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পেয়েছেন জীবনানন্দ দাশ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আর কেউ না-পাক, কবিকে, লেখককে পুরানোর গন্ধ  পেতেই হয়। একে হয়তো কেউ বলবেন ‘অতীতের জন্য হাহাকার’ সেরেফ নস্টালজিয়া।  আমি বলি, লাবণ্যধারা, ঐতিহ্যময় অতীত, পুরানো কিছু থাকলে তার জন্য হাহাকার তো থাকবেই।
বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত কোনো প্রকাশনা অব্যাহতভাবে একশ’ বছর মানে একটি শতাব্দী পার করতে  পেরেছে কি না আমি জানি না। দৈনিক সংবাদ সত্তর ছুঁই ছুঁই করছে। কোনো বই প্রকাশনী সংস্থা নেই এখানে, যার ঐতিহ্য শত বছরের। কলকাতায় আছে নিশ্চয়! সে ধারাবাহিকতাকেও আমি বাংলা প্রকাশনার সংগ্রামের সঙ্গে শামিল করতে চাই।
আমার হাতে এ মুহূর্তে একটি বই, নাম ‘আনন্দসঙ্গী’- আনন্দবাজার পত্রিকা সংকলন ১৩২৮ থেকে ১৪০৩ বঙ্গাব্দ। মানে ৭৫ বছরের ধরে চলতে থাকা ঘটনা প্রবাহ। ১৯২২ সাল, আনন্দবাজার পত্রিকার যাত্রারম্ভ। তারপর চলেছে। আমার কথা তা নিয়ে নয়, কথা এই সংকলনটি নিয়ে। ১৯২২ থেকে ৭৫ বছরের কতগুলো সময়। আনন্দবাজারের সাহিত্য বিভাগে নিয়মিত যে গল্প ছাপা হতো তা থেকে বাছাই কিছু নিয়ে এ সংকলন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরলাবালা সরকার, পরশুরাম, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী, মনোজবসু, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত, শিবরাম চক্রবর্তী, সরোজকুমার রায় চৌধুরী, অন্নদাশঙ্কর রায়, সৈয়দ মুজতবা আলী, প্রবোধকুমার সান্যাল, সতীনাথ ভাদুড়ী, লীলা মজুমদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, আশাপুর্ণা দেবী, সুবোধ ঘোষ, বিমল মিত্র, অজিতকৃষ্ণ বসু, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্তোষকুমার  ঘোআনন্দসঙ্গীষ, শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, বিমলকর, রমাপদ চৌধুরী, গৌরকিশোর ঘোষ, সমরেশ বসু, মহাশ্বেতা ভট্টাচার্য, হিমানীশ গোস্বামী, ইন্দ্রমিত্র, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, মতি নন্দী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শংকর, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়, তুলসী সেনগুপ্ত, অতীত বন্দ্যোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, বুদ্ধদেব গুহ,নবনীতা দেব, বাণী বসু, দিব্যেন্দু পালিত, শেখর বসু,রমানাথ রায়, সমরেশ মজুমদার, সুব্রত সেনগুপ্ত, শৈবাল মিত্র, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, রামানাথ মণ্ডল, আবুল বাশার, অমর মিত্র, মানব চক্রবর্তী, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, জয় গোস্বামী এবং সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় এই হলো সংকলনটির ৭৫ বছরের বাছাই লেখকের বাছাই গল্প। এর ভূমিকা লিখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
সুনীল বাংলা ভাষার এক স্মার্ট লেখক, ঝরঝরে গদ্য আর পদ্য ছিলো তার কলমের ডগাতে। এই বইয়ে তাই তার ভূমিকাটি হয়েছে অনন্য সাধারণ। সুনীল লিখছেন, ‘একদা রবীন্দ্র-বিরোধী বুদ্ধদেব বসুর অধিকাংশ ছোট গল্পই রবীন্দ্রধারায়, যেমন অন্নদাশঙ্কর রায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সন্তোষকুমার ষোঘ এবং বিমল কর।… মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কোনও ধারারই ধার ধারেননি, তিনি স্বতন্ত্র।… সৈয়দ মুজতবা আলী একটি সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের গদ্যভাষা নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর আগে এবং পওে অনেকেই সরস গল্প লিখেছেন, কিন্তু খাঁটি মজলিশী গদ্য লিখেছেন তিনিই একমাত্র এবং তাঁর কোনও উত্তরসুরি দেখা গেলো না।’

আমার হাতের সংকলনটি আরো নানা কারণে অনবদ্য। সুনীল তথ্য দিচ্ছেন, ‘আনন্দবাজার পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে নিয়মিত প্রকাশিত ছোটগল্প শুধু যে পাঠদেকর কাছেই জনপ্রিয় হয়েছিল তা নয়, লেখকরাও আকৃষ্ট হয়েছিলেন, তার প্রমাণ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই পত্রিকায় গল্প লিখতে রাজি হয়েছিলেন।’ এই সংকলনে থাকা বরীন্দ্রনাথের ‘রবিবার’ গল্পটি ছাড়াও ‘ল্যাবরেটরি’ আর ‘প্রগতি সংহার’ নামে আরো দুটি গল্প রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকার জন্যে।
কত-কত গল্প সংকলনটার শরীর জুড়ে। সময় আর কালকে ধরে রাখার এক নান্দনিক প্রয়াস গল্পের ভাষায়, কাহিনিতে। ১৯৬০ সালের ১০ নভেম্বর সরলাবালা সরকারের লেখা ‘একটি পাড়াগাঁয়ের মেয়ের প্রেমকাহিনী’ নামে একটা গল্প ছাপা হয়েছিলো। তাতে একটা লাইন আছে এমন-‘ধান দিলে খই হয় এমনি গায়ের তাত’  জ¦রের তীব্রতা বোঝাতে এমন একটি উপমা, বাক্য ব্যবহার করেছিলেন তিনি
অনন্য এক বাঙালি প্রতিভা সত্যজিৎ রায়। তার ‘পিকুর ডায়েরী’ গল্পটি আছে এই সংকলনে। গৌরকিশোর ঘোষের দেড়পাতার একটি গল্প আছে ‘প্রশ্ন’ নামে। দুই বন্ধুর গল্প। ১৯৭৩ সালের ৯ নভেম্বর প্রকাশিত। গল্পের শেষটা এভাবে-‘পঁচিশ বছর আগে আমি অার ও একই রকম ছিলাম। তবে ওকে, কেন আজ সহ্য করতে পারি নে!’ দুই বন্ধু, একজন বোহেমিয়ান একজন প্রতিষ্ঠিত, সেই কাহিনি, চিরন্তর। সময় বদলায় কাহিনি বদলায় না।
এমন অনেক ছবি, অনেক ঘটনা, অনেক বেদনা, হাহাকার ইতিহাস ধরা পড়েছে ৭৫ বছর সময়ের মধ্যে লেখা গল্পগুলোয়।
সংকলনের শেষ গল্পের লেখক বর্তমানে কবিতার বরপুত্র জয় গোস্বামীর গল্প দিয়ে। ‘মল্লার যেখানে নামে’ গল্পে দুপুরের গাছের সঙ্গে কথা বলছিলেন গল্পের এক চরিত্র। গাছ তাকে বলছে, ‘তুমি তাদের জন্যই লেখো, যাদের সঙ্গে তোমার এখনও দেখা হয়নি।’
তো আমি এখনো পুরানোর সঙ্গে থাকি। পুরানোকে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরি। ৫০ বছর আগে প্রকাশিত কোনো একটি বই পেলে রীতিমত মগ্ন হই তাতে। যেমন কবি ইরাজ আহমেদের বইশালে সন্ধান পেয়েছিলাম বিভূতিভূষণের ‘ইছামতী’। ৫০ বছরা আগে প্রকাশিত ১৫০ বছর আগে ইছামতীর তীরবর্তী জনপদের জীবন এমন করে বর্ণনা করা হয়েছে এই উপন্যাসে, মনে হবে চরিত্রগুলো এখনো নিশ্বাস ফেলছে। পুরানো দিন, পুরানো বই, পুরানো ছবি, পুরানো একটা গান আমাকে ভাবায়।