অন্য এক চে গুয়েভারা

আর্নেস্টো চে গুয়েভারা। লড়াই করেছেন দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে, লড়াই করেছেন আফ্রিকায়। গেরিলা যুদ্ধের পটভূমি রচনা করেছেন সারা বিশ্বে। মার্কসবাদের মন্ত্রে দীক্ষা নেয়া এই মানুষটি জন্মেছিলেন আর্জেন্টিনায়। পড়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞান। মোটর বাইকের পেছনে চেপে ঘুরে বেড়িয়েছেন গোটা দক্ষিণ আমেরিকা। দেখেছেন মানুষ আর তাদের বঞ্চনা। বন্দুক হাতে যুদ্ধ করে কিউবায় প্রতিষ্ঠা করেছেন সমাজতন্ত্র। বিপ্লবের আগুন জ্বালতে গিয়ে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন বলিভিয়ার মাটিতে।che-jugando-ajedrez
সারা পৃথিবীতে বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন চে গুয়েভারা। ষাট এবং সত্তরের দশকে পৃথিবী জুড়ে তাঁর নামে তরুণরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিপ্লবে। বেহিসাবী তারুণ্যের হৃদয় জুড়ে আজও আছেন তিনি। কিউবা বিপ্লবের পর জাতিসংঘে বক্তৃতা দিতে গেলে সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেন তাকে। অনেকেই জানতে চেয়েছিলেন, খ্যাতিমান গেরিলা যোদ্ধা হয়ে ওঠার পেছনে কোন বিষয়টা তার মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে? চে স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে জাতিসংঘ ভবনের দরজায় দাঁড়িয়ে উত্তর দিয়েছিলেন-ভালোবাসা। ভালো না বাসলে গেরিলা হওয়া যায় না।
কেমন মানুষ ছিলেন চে গুয়েভারা? কী খেতে পছন্দ করতেন তিনি? কোন ব্র্যান্ডের সিগার তার পছন্দের ছিল? কোন খেলার প্রতি ছিল তার গভীর আসক্তি? প্রাণের বাংলায়  প্রচ্ছদে এবারের আয়োজন অন্য আলোয় দেখা বিপ্লবী চে গুয়েভারার অনালোচিত অবয়ব।

খবরের চে, খাবারের চে
খাবারের বিষয়ে চে‘র খুব একটা দূর্বলতা কখনোই ছিল না। তবে খাবার টেবিলে গুছিয়ে খেতে বসতেন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, সেখানে তিনি ফরাসীদের চাইতেও বেশী স্পর্শকাতর ছিলেন। একজন দক্ষিণ আমেরিকান হিসেবে বিশেষ ভাবে গ্রিল করা মাংস ছিল তার পছন্দের তালিকায়। ডিশটির নাম ‘আসাদো’। তবে প্রিয় খাবার হিসেবে সবসময় তিনি বলতেন লাইম জুস দিয়ে ম্যারিনেট করা মাছ। এই পদটির নাম ‘সাভেচি’। এটি এক ধরণের সামুদ্রিক মাছ। আজও ল্যাটিনpay-guevara-cigar-box আমেরিকার অনেক দেশে রেস্তোরাঁর খাবারের তালিকায় সার্ভিস চে গুয়েভারা নামে এই ডিশটি পরিবেশিত হয়।
তবে চে গুয়েভারার দিন শুরু হতো দক্ষিণ আমেরিকার এক বিশেষ ধরণের চা দিয়ে। চা খেতে খুব পছন্দ করতেন তিনি। কখনো ওয়াইন থাকতো তাঁর খাদ্য তালিকায়।

download-22অবিচ্ছেদ্য ছিল ধূমপান
তবে ধূমপান আর চে ছিলেন প্রায় অবিচ্ছেদ্য। মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর এজেন্টদের কাছেও একটা সিগারেট চেয়ে খেয়েছিলেন তিনি। সিগারেটে ভীষণরকম আসক্ত ছিলেন চে। তার ধূমপান নিয়ে বেশ মজার কিছু গল্প প্রচলিত আছে। এসব কাহিনি তার সহযোদ্ধাদের লেখা বইতে স্থান পেয়েছে। গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল বিসয়ক একটি বই লিখেছিলেন চে। সেখানে তিনি একজন গেরিলা যোদ্ধার ব্যাক প্যাকে অবশ্যক কিছু জিনিসের তালিকা দিয়েছিলেন। সেই তালিকায় আছে, পানির ক্যান্টিন, কম্বল, বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে প্লাস্টিকেরছোট তেরপল, রাইফেলে দেয়ার জন্য তেল জাতীয় পদার্থ, শুকনো খাবার, খাবার সংরক্ষণের জন্য লবন এবং সিগারেট। চে গুয়েভারার ভাষায় ‘সিগারেট একজন নিঃসঙ্গ গেরিলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু’।
শ্বাসকষ্ট ছিল চে গুয়েভারার নিত্যসঙ্গী। তারপরেও ধূমপান বন্ধ করেননি তিনি। কিউবায় যুদ্ধরত অবস্থায় কৃষকদের পরামর্শে শ্বাসকষ্ট কমাতে তিনি ‘কাম্পানা’ নামে একটি বিশেষ ধরণের ফুল শুকিয়ে সেটার ধোঁয়া পান করতে শুরু করেন। কিন্তু তাতে শ্বাসকষ্ট একটুও দূর হয়নি তার। ১৯৫৬ সালে  প্রথম চে গুয়েভারা সিগার খেতে শুরু করেন। মূল গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারার আনন্দে তিনি সিগার খেতে শুরু করেছিলেন হঠাৎ করেই। তারপর থেকে এই বস্তুটি তার আঙুলের ফাঁক থেকে আর বিদায় নেয়নি। সিগার খাওয়ার পক্ষে অদ্ভূত সব যুক্তি ছিল তাঁর। তিনি বলতেন, সিগারের ধোঁয়ায় জঙ্গলের মশা দূরে সরে থাকে।
এসব অদ্ভূত যুক্তি থেকে চিকিৎসকরাও তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি। কিউবার নিউজ সার্ভিসের দুই সাংবাদিক জেসাস আরবোলিয়া এবং রোর্বেতো এফ ক্যাম্পোসের একটি লেখা থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এই দুই সাংবাদিক চে‘র ধূমপানের নেশার ওপর লিখতে গিয়ে জানিয়েছেন, কিউবা বিপ্লবের পরেও চে গুয়েভারা খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। কিউবায় ক্যাস্ট্রো সরকারের মন্ত্রি সভায় বাণিজ্য মন্ত্রী হয়েও একজন সাধারণ যোদ্ধার মতোই ছিল তার জীবনযাপন। কারো কাছ থেকে কখনোই কোন উপহার সামগ্রি গ্রহণ করতেন না তিনি। তবে কেউ যদি তাকে বই বা সিগার উপহার দিতো তাহলে খুশি মনে সেগুলো নিয়ে ফেলতেন চে।
কোন বিশেষ ব্র্যান্ডের সিগার খেতেন চে? তার পছন্দের তালিকায় প্রথম ছিল মন্টেক্রিস্টো ব্র্যান্ডের সিগার।  এর বাইরে এইচ. উপম্যান ও পার্তাগাস ব্র্যান্ডের সিগারও ছিল তার বিশেষ পছন্দের। তবে ঝামেলার সময় ব্র্যান্ড নিয়ে মাথা ঘামাতেন না তিনি।
শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় কিউবায় চিকিৎসকরা একবার তার ধূমপানের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। চে গুয়েভারা আর ধূমপান করতে পারবেন না, এটাই ছিল তাদের সাফ কথা। কিন্তু চে তো এই নিষেধের দেয়াল মানার মানুষ নন। ডাক্তারদের অনেক অনুরোধ করে দিনে একটি সিগার বা চুরুট খাওয়ার অনুমতি আদায় করে নেন তিনি। তারপর একটি হাতে বানানো অস্বাভাবিক বড়  আকৃতির চুরুট তিনি খেতে শুরু করেন। ডাক্তারদের দেয়া কথা ভঙ্গ করেননি তিনি। সারাদিনে একটিই খেয়েছেন।
কঙ্গোতে চে গুয়েভেরা গিয়েছিলেন বিপ্লব সংগঠিত করতে। কঙ্গোর লেক টাঙ্গানিকা নৌকায় চড়ে অতিক্রম করার সময় মাঝে মাঝেই তার কাছে সিগার থাকিতো না। তখন সেইসব অভাবের দিনে চে নাকি একটি সিগার কেটে চল্লিশ ভাগ করে পান করতেন। সহযোদ্ধাদের মুখে এমনও শোনা যায় তিনি সিগারের ধোঁয়া একটি বোতলে জমিয়ে রাখতেন। সিগারের স্টক ফুরিয়ে গেলে পরে সেই ধোঁয়া নাক দিয়ে টেনে নিতেন।
বেশ কয়েক বছর আগে চে গুয়েভারার ব্যবহৃত একটি কাঠের সিগার বক্স নিলামে উঠেছিল। বার‘শ পাউন্ডে সেই বক্স বিক্রি হয়। সম্ভবত সেটাই ছিল এই বিপ্লবী নেতার একমাত্র ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিস যা নিলামে উঠেছিল।বক্সের ওপর খোদাই করে লেখা ছিল  চে‘র নাম।

বই পোকা চেce3683f1f19d3a008032307768fae92c
বই পড়ায় সুখ্যাতি ছিল চে গুয়েভারার। যেখানেই যেতেন হাতে থাকতো বই। কিউবায় গভীর জঙ্গলেও সহযোদ্ধারা তাকে বই পড়তে দেখেছে। নানা ধরণের বই পড়তেন চে। তারমধ্যে রয়েছে ইতিহাস থেকে  চিকিৎসা বিজ্ঞান পর্যন্ত। কিটসের কবিতা পড়তে পছন্দ করতেন চে। চে ইতিহাস পড়তে পছন্দ করতেন। তারসঙ্গে পড়তেন আমেরিকা, আর্জেন্টাইন ও ইউরোপের কথাসাহিত্য। জুল ভার্নের রচনা সমগ্র ছিল তাঁর প্রিয় বইয়ের তালিকায়। ছিল বারবার পড়া দাস ক্যাপিটাল। তার প্রিয় লেখকের তালিকায় ছিলেন জ্যাক লন্ডন। ফ্রয়েড আর ব্রাট্রান্ড রাসেল সবসময় রাখা থাকতো তাঁর শয্যার পাশে। আরেক ধরণের বই চে খুব মন দিয়ে পড়তেন। সেটি হচ্ছে দাবা খেলার বই।

আসক্তি ছিল দাবায়
একবার চে বিখ্যাত জার্মান দাবা খেলোয়াড় প্যাচম্যানকে বলেছিলেন, ‘মন্ত্রীত্বের কাজটা আমার একদম পছন্দ নয়। আমার জীবনে ইচ্ছে দুটো, হয় আপনার মতো দাবা খেলা অথবা ভেনিজুয়েলায় বিপ্লব ঘটানো।’ দাবা খেলাটাও ছিল চে‘র কাছে তীব্র এক প্যাশন।নিজে ভীষণ ভালো দাবা খেলতেন। কাজের ফাঁকে অবসর পেলেই তিনি চলে যেতেন দাবা খেলা দেখতে। কথা বলতেন খেলোয়াড়দের সঙ্গে। ছবিও তুলতেন সেখানে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে তাঁর দাবা খেলার আগ্রহ এবং ভালো খেলার সুনাম এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছির যে বিশ্বখ্যাত দাবা খেলোয়াড়রা চে‘র ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন, এক সময়ের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ববি ফিশার, মিগুয়েল নাজডর।
চে নিজেও সুযোগ পেলেই বসে পড়তেন বোর্ডে গুটি সাজিয়ে। তারপর কেটে যেত ঘন্টার পর ঘন্টা। এই বিপ্লবী ডুবে যেতেন বুদ্ধির খেলায়।

ইতি তোমাদের বাবাvili6pg
সখে, অভ্যাসে বিচিত্র এক মানুষ ছিলেন চে গুয়েভারা। বিপ্লব, লড়াই আর জটিল কর্মক্ষেত্র সেই অন্যরকম মানুষটাকে প্রায় আড়াল করেই রেখেছে বছরের পর বছর। আচ্ছা, বাবা হিসেবে কেমন মানুষ ছিলেন তিনি? রুক্ষ, কঠিন এক বিপ্লবীর বুকের ভেতরে কোথাও কি ছিল ভিন্ন এক মানুষের গল্প? চে গুয়েভারার মেয়ে এলিয়েদা গুয়েভারা বাবা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, আমার বাবা ছিলেন একেবারে অন্যরকম একজন মানুষ। আমরা বাবাকে খুব বেশী একটা কাছে পাইনি। কিন্তু যতক্ষণ থাকতেন ভীষণ কাছাকাছি থাকতেন। আদর করতেন অসম্ভব।
এলিয়েদার জবানীতে জানা যায়, চে দেশের বাইরে গেলে মেয়েকে চিঠি লিখতেন। সেসব দেশের নানা কাহিনি জানাতেন চিঠিতে। কিন্তু সবচাইতে মজার ব্যাপার হচ্ছে চে মেয়েকে চিঠিতে রূপকথার গল্প লিখে পাঠাতেন। খবর নিতেন অন্য সন্তানদের লেখাপড়ার। কঙ্গোতে যুদ্ধ করার সময়ও চে মেয়ের কাছে চিঠিতে বিভিন্ন বন্য প্রাণীদের গল্প লিখে পাঠাতেন।
খুব গোপনে কিউবা ত্যাগ করে বলিভিয়ায় চলে গিয়েছিলেন চে। সঙ্গী ছিলো কয়েকজন বিশ্বস্ত কমরেড। কিউবা ছেড়ে যাবার আগেও মেয়েকে চিঠি লিখে জানিয়ে গিয়েছিলেন বিপ্লবের আগুন জ্বালতে যাওয়া এই অনন্য প্রমিথিউস-আর্নেস্ট চে গুয়েভারা।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট