সেই না-দেথা কলকাতাও একদিন রিনু ঠিক খুেঁজে পাবে

rini

রিনি বিশ্বাস

পিনাকীর জন্মদিন, বাড়িতে রান্না না করে আমরা তিনজন বাইরে ডিনার করবো বলে ঠিক করা হয়েছিল, সকালেই; কোথায় যাওয়া যায় তার উত্তরে কর্তামশাই বলেছিলেন ‘খোঁজ করে দেখি, নতুন কোন্ জয়েন্টে হানা দেওয়া যায়..’ তার ফলেই সন্ধ্যেবেলা গাড়িতে উঠে কর্তাগিন্নীর সংলাপ ‘আজ আমরা ‘স্পাইস্ ক্রাফ্ট’-এ খেতে যাবো’ ‘সেটা কোথায়?’ ‘হাজরা ল’কলেজের উল্টোদিকে, মাম্মাম..’ মা বাবা অতঃপর একসঙ্গে পুত্রকে প্রশ্ন করে ‘তুমি জানলে কি করে?!’ অপাপ বিস্ময়মাখা দুচোখ বড়বড় করে তার উত্তর ‘রাস্তায় হোর্ডিং-এ লেখা দেখেছি তো’! শ্রীমানের চেয়েও বড়বড় চোখে এবার মা তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকে, যে ততক্ষণে গাড়ির জানলা দিয়ে আবার দুচোখ মেলে ধরেছে কলকাতার বহুবার যাতায়াত করা সেই চেনা রাস্তায়… একই রাস্তায় পাবলোর সঙ্গেই তো আমাদেরও চলাফেরা! তবু কত কিছু তো আজকাল চোখেই পড়েনা! আগে কিন্তু পড়তো.. যখন সদ্য চিনতে শুরু করেছিলাম আমার এই শহরটাকে! রিক্সায় যেতে যেতে কলকাতার সঙ্গে ছোট্ট রিনুর প্রথম দেখা! না, এপাড়া থেকে ওপাড়া যাওয়া আসার সময় মোটেই নয়! বরং বেশ দূরের পথেই তার সঙ্গে প্রথম আলাপ! বুঝিয়ে বলি, রিনুর পেট্রোলের গন্ধে পেটগুলিয়ে উঠতো একদম ছোটবেলা থেকে..ব্যস্, গাড়িতে ওঠা বন্ধ! তাবলে কি তার বাইরে বেরোনো বন্ধ হয়ে গেছিল?! উঁহু.. বরং রিনুর মা-বাবাই অন্য বন্দোবস্ত করেছিলেন.. মাসে একবার করে রিনু বেড়াতে যেতো। বেহালা চৌরাস্তা থেকে তার ঠাকুরমার বাড়ি, টালিগঞ্জে, রিক্সায় চড়ে, রীতিমত হাওয়া খেতে খেতে! তখন তারও অমনই দুটো ডাগর চোখ, যা অপলকে চিনতে চেষ্টা করতো চারপাশটাকে, যার নাম সে আরেকটু বড় হয়ে জানবে-বারবার মনেমনে আউরাবে আর ঝুপুস করে ভালোবেসে ফেলবে- ক ল কা তা.. তার শহর.. kolkata-3যে শহরে তার মা থাকে, বাবাই থাকে, ঠাকুরমা থাকে, সোনাকাকা থাকে, দিম্মা থাকে আর থাকে তার খুব কাছের পিসি-স্বপ্নাপিসি! যখন রিনু আরেকটু বড়, তখন সে ভর্তি হল ‘নিউ চিল্ড্রেন্স হোমে’.. সক্কালবেলা লাল টিউনিক পরে বাবাইয়ের হাত ধরে আধো ঘুমে যখন সে স্কুলে যেতো তখন মোটেই বুঝতোনা কোথা দিয়ে কোথায় যাচ্ছে, বুঝতো বাড়ি ফেরার সময়, স্বপ্নাপিসির সঙ্গে গল্প করতে করতে! তখনই তো সে দেখেছিল, একটা রাস্তা কিভাবে গলির সঙ্গে মিশে যায়, হঠাৎ ছোট গলি কেমন করে বড় রাস্তা হয়ে যায় নিমেষে! কলকাতায় যে অনেক অ নে ক এমন গলি আর রাস্তা আছে সেটা রিনু আবিষ্কার করবে আরো বেশকিছু বছর পরে.. বিশেষ একজনের পাশে হাঁটতে হাঁটতে.. একটা লাল দোতলা বাস.. তার টার্মিনাস থেকে উঠে পাশাপাশি বসে পড়া..তারপর কত রাস্তাকে নতুন চোখে দেখতে দেখতে পৌঁছে যাওয়া আরেক টার্মিনাসে.. শেষ স্টপ.. তবু গন্তব্যে পৌঁছনো হয়না তাদের.. ফুরোয়না অফুরান কথারা.. অতএব আবারো সেই বাসেই উঠে বসা.. এবং এবার দোতলায় উঠে এক্কেবারে সামনের সিটে.. কলকাতাটা যে কত সুন্দর, তা আবারো এভাবেই টের পায় ‘রিনু’.. ভালোবাসার হাত ধরাধরি করে চেনাশোনা হয় উত্তরের কত গলির সঙ্গে.. একসময় হাতটা ছেড়ে যায়.. উত্তর থেকে যায় সেই উত্তরে শুধু রিনুর তা জানা হয়না!! সাদামাটা আটপৌরে কলকাতা ছাড়াও অন্য কলকাতার সঙ্গে রিনুর পরিচয় হয় পেশার খাতিরে.. এ এমন কলকাতা যে সকলকে কাছে টানে, যে শিল্পচেতনায় সবার সামনের সারিতে.. বইপাড়া, বইমেলা, ফুটবল, নাটক, সিনেমা, গানের অনুষ্ঠানে জমজমাট সেই কলকাতাকে কোনমতেই আটপৌরে বলা যাবেনা.. তার চোখ ধাঁধানো জৌলুস.. এলোমেলো পায়ে শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে একটু পিছিয়ে যাই.. gorer_mathবাবাইয়ের সঙ্গে পায়ে পায়ে হেঁটে রিনু প্রথম চিনেছিল মিছিলের কলকাতাকে.. ব্রিগেড চলোর সেইসময়টাতেও রিনু বেশ ছোট! শোকের শহরকেও রিনু চিনেছিল বাবাইয়ের হাত ধরেই.. সত্যজিৎ রায় যেদিন চলে গেলেন, নন্দন চত্বরে বাবাইয়ের হাত ধরে সেদিন দুভাইবোন প্রথম দেখেছিল কলকাতাকে কাঁদতে! সেদিনই প্রথম রিনুও দেখেছিল তার বাবাইয়ের দুচোখ বেয়ে নেমেছে জলের ধারা… মা রিনুকে চিনিয়েছিল শহর কলকাতার সাহসী চেহারা.. বেড়িয়ে ফিরছিল তারা কলকাতার বাইরে থেকে। মায়ের হাত ধরে হাওড়া স্টেশন থেকে টালিগঞ্জ যাওয়ার ট্যাক্সি ধরেছিল তারা! রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা! ময়দানের কাছাকাছি এসে ট্যাক্সি ড্রাইভারের হঠাৎ অন্য মূর্তি! বেশি টাকা না দিলে সে দুই বাচ্চা সমেত ভদ্রমহিলাকে ওই ফাঁকা ময়দানেই নামিয়ে দেবে! মা কিভাবে যে তাকে বাড়ি অবধি যেতে বাধ্য করেছিল ঠিক মনে পড়েনা! তবে পাড়ায় ঢোকার পর উঁচু গলায় একটা শব্দ উচ্চারণেরও সাহস সেই অভব্য ট্যাক্সিওয়ালা পায়নি, এটা মনে আছে স্পষ্ট! ভাগ্যিস সেদিন মায়ের সাহসটুকু ছিল সম্বল! কলকাতার যে কত চেহারা, পরতে পরতে তার যে কত রং তা যে না দেখেছে সে আদৌ বুঝবেনা.. কলকাতা আমার শহর, যে আমার সঙ্গে সঙ্গে বড় হল, হচ্ছে আজও.. এখন অবশ্য রিনুর সব দেখাই ‘সেই’ একজনের চোখ দিয়ে.. যে এখনও এত রং চেনেনি, তার চোখে শুধু বিস্ময়ের রং-ই মাখামাখি হয়ে আছে.. আর আছে চিনতে চাওয়ার আকুলতা..না দেখা কলকাতাকে দেখার ব্যাকুলতা.. তাই থাকুক.. কলকাতার মধ্যের সেই না-দেখা কলকাতাও একদিন রিনু ঠিক খুঁজে পাবে, তার সঙ্গে, তারই নিজের এই শহরের পথে হাঁটতে হাঁটতে.. হাঁটতে হাঁটতে