সব শিয়ালের এক রা

istiak

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

আগে ছোটবেলায় যখন গ্রামে বেড়াতে যেতাম, তখন শেয়ালের ডাক শোনা যেত। শহরেও একটু নিরিবিলি জায়গা হলে রাতে মাঝে মধ্যে শেয়ালের ডাক শোনা যায়। শেয়ালের ডাকের মধ্যে অদ্ভুতভাবে একটা রিদম আছে। দেখা যায় আগে একটা শেয়াল হুক্কা-হুয়া করে ডেকে ওঠে, তারপর দলের বাকিরাও সেই সুরে তাল মেলায়।তারপর ননস্টপ চলতেই থাকে কিছু সময়ের জন্য। আবার কিছুক্ষণ বিরতি, তারপর আবারো সেই হুক্কা-হুয়া। আজকাল ফেসবুকে ঢুকলে কেমন যেন সেই গ্রামের আমেজ পাই, মানে শেয়ালের কথা মনে পড়ে। কেউ একজন সাইড থেকে হুক্কা- হুয়া বলা মাত্রই সমগোত্রীয় দলের বাকীরাও সুর তুলে হুক্কা- হুয়া ডাক শুরু করে। জাতীয় ক্রিকেট দলের কোন খেলোয়ারের হয়ত জন্মদিন, কেউ একজন শুভকামনা জানিয়ে কিছু একটা লিখল, ওমনি বাকীরাও শুরু করে দিল শুভকামনা জানানোর প্রতিযোগিতা। আবার দুদিন পরেই হয়ত সেই একই খেলোয়ার কোন ম্যাচে ভালো খেলতে পারলনা, কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে মনের ঝাল মেটাতে ফেসবুকে কিছু একটা লিখল, ওমনি বাকীরাও গালি গালাজের বন্যা বইয়ে দিল। যখনই কোন ইস্যু নিয়ে কথা ওঠে, আমরা কিছুদিন সেই ব্যাপারটা নিয়ে হুক্কা-হুয়া করি, তারপর চুপ হয়ে যাই। আবার নতুন কোন ইস্যু পেলে শুরু হয় হুক্কা-হুয়া, তারপর আবারো চুপ। এভাবেই একের পর এক ঘটনা ঘটে কিন্তু তার শেষ পরিনতি কি হয়, সেটা দেখার সৌভাগ্য কারো হয়না। ‘কোন এক রেস্টুরেন্টের খাওয়া ভাল’ ব্যাস! এই কথা বলতে দেরী, তারপরে ঐ রেস্টুরেন্টে শ’য়ে শ’য়ে ‘চেক ইন’ দিতে দেরী নেই। তারপর কয়েক মাস গেলো আর তখন কেউ ওদিকে ভুলেও পা দেবে না। কেন? এত ভাল রেস্টুরেন্ট হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল? ‘অমুক ফিল্মটা খুব ভাল’ কেউ একজন শুধু লিখল আর হাজার হাজার চলচিত্র বোদ্ধার জন্ম হয়ে যাবে দুই তিন দিনের মধ্যে। এমনভাবে সবাই ফেসবুকে লেখালেখি করবে যেন সারা বছর খুব বাংলা সিনেমার খবর রাখে।এখন যদি নিরপেক্ষ কেউ ঐ বিশেষ সিনেমাটার সামান্যতম সমালোচনাও করে তো তার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার শুরু হয়ে যাবে দলগত ভাবে। imagesশেয়াল সংস্কৃতি আর কি! অন্যকে ফলো করার মাঝে কি মজা আছে কে জানে? অবশ্য যে বা যারা অন্যকে দেখে হুক্কা-হুয়া করে তাদের দেখে হয়ত আরেক দল লোক মজা পায়। গ্রামের এক বৃদ্ধ দাদু তার তিন নাতিকে নিয়ে এক বাড়ীতে দাওয়াত খেতে যাবার আগে নাতিদের উদ্দেশ্যে উপদেশ দিলেন, তোমরা ওখানে গিয়ে কোন রকম দুষ্টুমি করবে না। আমি যা যা করি, যেখানে বসি যেভাবে বসি ঠিক সেভাবেই সব কিছু করবে। মনে রাখবে কোন রকম বেয়াদবি করবে না। নাতিরা দাদুর কথায় সায় দিয়ে তার সাথে উক্ত বাড়িতে গেল। দাদুকে বসতে দেয়া হলো। পাশাপাশি নাতিরাও বসল। এক নাতি লক্ষ্য করল দাদুর লু্ঙ্গি অসর্তকতাবশতঃ উপরে উঠে গিয়ে ভেতরের অনেক কিছু বেড়িয়ে পড়েছে। নাতি মনে করল এভাবেই হয়তো বসতে হবে। কোন সমস্যা নেই। সঙ্গে সঙ্গে সে দাদুর মতোই কাপড় তুলে বসল। তাকে দেখে অন্য দু’জনও একই রকম করে বসল। এর মধ্যে আমন্ত্রণকারী বাড়ির মালিক এসে দেখেন অবস্থা তো বেগতিক! উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে হাসির রোল উঠল। শেষটা কি হলো বলব না, কারন বাকীগুলোর মত এই গল্পেরও শেষ আমার জানা নেই! গল্পের শেয়াল গল্পেই থাক, সত্যিকারের শেয়াল গ্রামেই থাক আমরা বরং ফেসবুকে হুক্কা-হুয়া শুনতে থাকি। কেউ যদি ঐ দাদুর নাতিদের মত অন্যের দেখাদেখি নিজের লুংগি উপরে তুলে বসে থাকে, বুদ্ধিমান লোকের তা দেখে মজা নিতে সমস্যা কি?