রাঙামাটির রঙে বদলে যাওয়া ভাবনা

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতোকিছুটাআনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

কনকচাঁপা

একেবারে কিশোরী আমি।অভাব না হলেও কঠিন হিসেবের সংসারে বড় হচ্ছি আমি, আরো তিনজন ভাইবোন এর সঙ্গে। বছরে দুইবার করে দাদাবাড়ি যাই।আর নিয়ম করে গান ও পড়াশোনা। সে এক অনন্য সাধনার জীবন।সত্যিকার অর্থেই একঘেয়ে জীবন। মেঝো মামা হঠাৎ রাঙামাটি বিয়ে করলেন।মামী ধরলেন রাঙামাটি যেতে হবে সবাইকে।কোন এক ফুরফুরে তিরতিরে সকালে বিশাল বাস এ রওনা হলাম রাঙামাটি। আব্বা কে রেখে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছিল।আবার রাঙামাটি! এমন জায়গায় জীবনেও যাইনি।তো সেখানে যাচ্ছি এই ভেবে খুবই শিহরিত। বইপত্র, হারমোনিয়াম, কিছু খেলনাপাতি রেখে রওনা হলাম সবার সঙ্গে।কোথায় একটা অস্থিরতা কাজ করছে।বুঝতে পারলাম আব্বাকে ছেড়ে যাওয়াই এর কারন। একসময় চিটাগাং পৌছালাম।বাস থেকে নেমে লাঞ্চ করলাম দলবেঁধে। আবার বাসে উঠলাম। একটু পর আমার চোখ বিস্ফারিত। প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে।মঞ্চনাটকে যেমন কার্ডবোর্ডের আবহ বদলে যায় ঠিক তেমন। ইট কাঠের বদলে ঘন গাছপালা কালো মাটির বদলে লাল মাটি মসৃণতা র বদলে এবড়োথেবড়ো প্রকৃতি আমাকে অস্থির করে দিচ্ছিলো।বাসের মধ্যে মামা খালা রা চিপস বিস্কিট খেতে ব্যস্ত। আমি ওদের দেখে ভাবছি এটা কি খেয়ে সময় নষ্ট করার সময় হলো? ছোট খালা ফোঁড়ন কেটে বলেন এই যে কবি আপনার ভাগের চিপস আমাকে দেন! konokchapaআমি খুব নিরব হয়ে গেলাম।আম্মা বাসের মধ্যেই আমার পাশে এসে বসলেন। তার চোখে জিজ্ঞাসা।বালিকা থেকে কিশোরী হয়েছি।মা খুব টেনশন করেন।কারন তার সদ্য সাবালিকা মেয়েটির মন শরতের আকাশ হয়ে গেছে।কখন যে ঝরে! মা বুঝে উঠতে পারেন না। আমি নিরব।প্রকৃতি গিলছি।জীবনে সিরাজগঞ্জ বগুড়া আর ঢাকা ছাড়া কোথাও যাইনি। রাঙামাটি আমার কাছে স্বপ্ন! আহা! ধীরেধীরে প্রকৃতির ভেতরে প্রকৃতি আমার ভেতরে নিমগ্ন হয়ে গেল।একটা সময় চোখ লেগে আসছিল।চোখে মনে হয় মরিচের কাজল লাগিয়েছি।আব্বাকে ফেলে আসার দুঃখ গলার কাছে দলা পেকে ছিল।আম্মা কি একটু বলায় তা অস্রু হয়ে গলে পড়লো। একে আনাই ঠিক হয়নি—আম্মার স্বগতোক্তি। আমি অবাক।আম্মা কি বুঝতে কি বুঝলেন! যাইহোক। রাঙামাটি মামীর বাপের বাড়ি গিয়ে পৌঁছুলাম।বিশাল নিজস্ব টিলায় তাদের বাড়ি।অপূর্ব। অপূর্ব। দারুন বাঁশ ও টিন মিলানো বাড়ি।খেয়ে দেয়ে ঝিঁঝিঁ পোকার গানে দারুন আঁধারে ঘুমিয়ে পড়লাম।পরদিন ভোরবেলা ঘুম ভাংলো।কলপাড়ে ইয়া বিশাল বিশাল শিং ওয়ালা শামুক!ভয়।পেয়ে যাওয়ার মত! নাস্তা খেয়ে বাড়ির পেছনটায় যেতেই নতুন এক পৃথিবী আমার সামনে নিজেকে উন্মোচিত করলো। আহা! আহা! আল্লাহ! তুমি কোথায়? এই তোমার সৃষ্টি? এমন সুন্দর? এতো অপূর্ব? তাই বুঝি শিল্পীরা এভাবে আঁকতে পারেন! বিশাল টিলার একদম ওপরে ওঁদের বাড়ি আর বাড়ির একদম নীচে কুলুকুলু পাহাড়ি নদী।দূরে নীল সবুজ ধুসর কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়। আহা।আহা।দূরে মেয়েরা কাপড় বাড়ি দিয়ে দিয়ে ধুচ্ছে নদীতে।তারা কাপড় আছড়ানোর অনেক পরে সে শব্দ আমার কানে আসে। আমি মজার খেলা পেয়ে গেলাম।বাড়ির পেছনে টিলার উঁচু পাড় থেকে লাফিয়ে নেমে একদম নদীর বালুকাবেলা তে চলে গেলাম।বালুতে নাম লিখি।নিজের নাম।আর একটা নাম বা অক্ষর লিখতে মন চায়।মন চায় যোগ চিহ্ন আঁকতে।কিশোরীর মন যে চাতক পাখীর মত, ক্ষণেক্ষণে কিভাবে বদলায় তা আমি কিশোর বয়সেই বুঝে গেলাম।আর একজনের নামের আদ্যাক্ষর লিখতে গিয়েই লজ্জায় লাল হয়ে মনে মনে তাঁর সঙ্গেই কথা বলতে থাকি।বুঁদ হয়ে– কল্পনায়—- আহা! এভাবে চারদিন ছিলাম।রোজ ভোর বেলা যে টিলার পেছনে যেতাম খাওয়ার সময় না হলে আর ভেতরবাড়ি যাওয়াই হত না। মামীর মা বলেন তোমার কি হল নানু! আমার কাছে আসোই না! আমি ভাবি এঁরা কতই না সুখী! এতো সুন্দর জায়গায় থাকেন। আমি সেই পেছন বাড়ির টিলার উপর থেকে যে ছবি বুকে এঁকে নিয়েছি সে ছবি আমি ইনশাল্লাহ একদিন আঁকবো। ফিরে এলাম ভীষন এক জ্যন্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে।সঙ্গে আমার আহ্লাদী অবুঝ কিশোরী কে নদীর বালুকাবেলা তে বিসর্জন দিয়ে  নিয়ে এলাম নতুন আমি কে। এবংআমি বুঝলাম এক. পাহাড় অনেক উঁচুতে থাকে। দুই. বালুকাবেলা অনেক নীচুতে থাকে তিন. নদীর ভেতর কিছু চোরা পাথর থাকে। চার. দূর পাহাড়ের গায়ে যে আকাশ তাকে পাহাড় কখনওই নাগাল পায় না। পাঁচ. পাহাড়ের গায়ে মেখে থাকা আকাশী, নীল ধুসর,আবছায়া রংগুলো সত্যি না ।ছয়. শব্দ আর আলোর মাঝে কোনও বন্ধুতা নেই আর।