আমার শহর: সিউড়ি

নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবীর সমস্ত ছোটো শহরেরই বোধ হয় একটা অভিমান জমা থাকে।বাইরে থেকে খুব একটা বোঝা না গেলেও যারা তার খুব কাছাকাছি থাকে, তারা টের পায় কতখানি মেঘ জমে আছে। এখন প্রশ্ন হল,  আমরা সবাই কোথাও না কোথাও থাকি- শহর, গ্রাম, মফস্বল।  কিন্তু সেই অভিমানের আচ কতজনই পেয়ে থাকি! যাই হোক, আমার সাথে আমার শহরের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। যদিও আমার সে বিষয়ে সবিশেষ ধারনা ছিল না। যখন এম.এ পড়তে যাবার জন্য শহর ছাড়লাম তখন অনুভবে এসেছিল ব্যাপার টা।siuri22

সিউড়ি। নিতান্তই ছোটো শহর।  এ মাথা থেকে ও মাথা এক বার পাক দিতে বড়জোর  ১৮ মিনিট লাগবে। কিন্তু ঘটনাচক্রে বীরভূম জেলার সদর শহর আবার সিউড়ি। কিছুই তেমন নেই, তবে অফিস কাছাড়ির সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। তবুও সদর শহর বলতে যে সম্ভ্রম টুকু জন্মায়, তা আমার কোনোদিনও বোধ হয় নাই। আমাদের স্কুলের একজন মাস্টারমশাই বলতেন,  সিউড়ি আবার শহর হল! সিউড়ি বড় গ্রাম। তখন রাগ হত। ভাবতাম দুদিনের যোগী, বাইরে থেকে চাকরী করতে এসে আমাদের জায়গা কে গ্রাম বলে! আসলে বয়স কম ছিল বলেই হয়ত শহর কে বড় গ্রাম বলায় যারপরনাই রাগ হয়েছিল। কিন্তু এখন সে বিশ্বাস আরও বদ্ধমূল হয়েছে। এবং তাতে কোথাও মানাভিমানের লেশ মাত্র নেই। শহরের ক্যুইন্টএসেন্সিয়াল যে চরিত্র গুলো থাকে তা আমায় কখনো টানে না। সেদিক থেকে মফস্বল,  গ্রাম অনেক ভাল। মানুষ সবসময় একটা আত্মীয়তা খোঁজে,  যেকোনো ফর্মে। যেটা ভীষন সাব্জেক্টিভ। বড় শহরের অবজেক্টিভিটি এতটাই বেশি যে সে সবাইকে ধারন করলেও কাছে আসতে দেয় না।

এইরকমই একটা ছোটো জায়গা আমাদের সিউড়ি। ভাললাগা, হাসি, কান্না, শৈশবকাল,  স্কুল, কলেজ জীবন,  প্রথম প্রেম, মাঝপথে রিট্রিট সব কিছুরই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে এই সিউড়ি। আমরা যখন ছোটো তখনো এত লোকজন আসেনি সিউড়িতে। এখন সংখ্যাটা বেশ বেড়েছে।
একটা অভিমানের কথা দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম। হ্যা, সত্যি একটা অভিমান থাকে। আমি বুঝেছি সেটা। এম.এ পড়তে কোলকাতার কাছাকাছি গিয়ে উঠলাম একটা সময়। siuriসেখানকার বন্ধুবান্ধব দের সিউড়ি জায়গাটা এক্সাক্টলি কোথায় তা বলতে বেশ বেগ পেতে হত। আমার এক শিক্ষিকা কোলকাতা থেকে আসতেন পড়াতে। তাকে আমি কোনোভাবেই বোঝাতে পারলাম না আমাদের জায়গাটা ঠিক কোথায়। শেষমেশ বলতে হল, শান্তিনিকেতন থেকে ঘন্টা দেড়েকের রাস্তা। আমার এভাবে ঠিকানা বোঝাতে বেশ আপত্তি চিরকাল। যাদবপুরের এক বান্ধবী খালি বলতো তোর বাড়ি বীরভূমে, না? তার কাছে বীরভূম অনেকটা আফ্রিকার মত। বেশ অন্ধকার, কুসংস্কারময়, যাদুদেশ যেন। কিছুতেই তাকে বোঝানো গেল না, বীরভূম নামের কোনো জায়গা নেই। ওটা জেলার নাম। এসব দেখেশুনে একটা অব্যক্ত ক্ষোভ নিয়ে সপ্তাহান্তে বাড়ী আসতাম। আর আমার সাইকেল টা নিয়ে খুব কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম আমাদের শহরটার। মসজিদ মোড় এর ভিড় কমে এলে পর দেখতাম একাকী ইন্দিরা গান্ধী দাঁড়িয়ে আছেন বহুদিন যাবত। আর অচেনা পথচারী কে বলে দিচ্ছেন দিকনির্দেশ। আমি তার কাছে গিয়ে দাড়াতাম। আশেপাশের ঘরমুখো দোকানীদের বাড়ি ফেরার পর আমি বেবাক তাকিয়ে  অদ্ভুত এক ঘুমের দৃশ্যে আচ্ছন্ন আমরা বাড়ী ফিরে আসতাম। siuri33
এইভাবে ২৪ টা বছর ঘর করা হয়ে গেল শহেরটার সঙ্গে। কোলকাতা থেকে অনেক টা দূরে। নিজের মত করে একাত্ম হয়ে গেলাম কখন বুঝতেই পারলাম না। কাঠের, প্লাস্টিক এর চেয়ারওয়ালা হলে ঘেমেনেয়ে সিনেমা দেখাটাই আনন্দের করে তুললাম। ঠেলা গাড়ির ফুচকা ঘুগনি,সস্তার  চিলি চিকেন পরোটা খেয়ে হাজার হাজার জন্মদিন সেরে ফেললাম। এও এক  অভিযোজন।

ওয়াসিম আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। প্রতিদিন সন্ধ্যেয় আমায় ফোন করতো। আমি টিউশন পড়িয়ে ফেরা অব্দি দাস কাকুর চা দোকানে অপেক্ষা করতো। আমরা নিয়ম করে আড্ডা দিতাম। এই অসহিষনুতার বাজারেও আমরা দাঁড়িয়ে থাকি মাথা তুলে। এই সম্প্রীতির আবহ আমাদের অহংকার। আমরা একসঙ্গে পুজো দেখি, ঈদের নেমন্তন্ন খাই।

তবে এখন আর সেই মলিনতা নেই। মানুষের হাতে রেস্ত এসে গেল। নামজাদা সোনার দোকানের পোস্টার ছেয়ে গেল একদিন। খেলার মাঠ রাতারাতি দখল হয়ে বাড়ি হয়ে গেল। আধুনিক শহরের সব রঙই লেগে গেল। কিন্তু তাও এখনো রাস্তাঘাট শুনশান হয়ে গেলে আমি ইন্দিরা গান্ধীর মূর্তির নীচে গিয়ে দাড়াই। দেখি,  আজন্ম ক্ষতে লাগিয়ে দিচ্ছে আশ্চর্য মলম আমার শহর।