রিক্সা ও আমার শ্যামলি…

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতীকক্রিয়া।

এস এম আমিনুল

এস এম আমিনুল

কোন কোন সম্পর্কের নাম হয় না, কোন কোন সম্পর্কের নাম দিয়ে তাকে মলিন করার চেষ্টা করতে হয় না।
বাসা থেকে প্রতিদিন সকালে রিক্সা নিয়ে শ্যামলি যেতাম, শ্যামলী বাসস্টপের কাছাকাছি একজন বয়স্ক অন্ধ ভিক্ষুক গলির ভেতরে বসে থাকতো, প্রতিদিনই একই ছেড়া ময়লা পাঞ্জাবী,লুঙ্গী আর টুপি পরে রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে একই ভাবে বসে থাকতো। তার চীর সঙ্গি একটা জীর্ণ লাঠি আর ভিক্ষার বাটিতে পরে থাকা কয়েকটি ছেড়া টাকা আর কয়েন।
তখন ছাত্র ছিলাম, পকেটে টাকা থাকতো না,কলেজে যাওয়ার সময় আমি প্রতিদিন তাকে আমার টিফিনের টাকা থেকে কিছু টাকা দিতাম, টাকা দিয়ে মাঝে মাঝে ব্যাস্ত রাস্তায় তার পাশে আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকে দেখতাম, আমার কি যে মায়া লাগতো, কি যে ভয়াবহ মায়া। সে খুধা লাগলে কিভাবে খাবার কিনে খায়? পিপাশা লাগলে না জানি কত কষ্ট পায়, টয়লেটে কি করে যায়। আহারে বেচারা, তার আপন হয়তো কেউ নেই। মাঝে মাঝে ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে যখন তিনি কাঁপতেন, আমি পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম, বৃষ্টিতে আমি ভিজতাম বলে আমার ছাতা থাকতো না। তার মাথায় ছাতা ধরা হতো না।
আমার ২ টাকার নোট হাতে নিয়ে সে আমার জন্য অনেক দোয়া করতো, সে আমাকে চেনে না, শুধু আমার কণ্ঠ বুঝতে পারতো, মাত্র ২-৫ টাকা দিতাম বলে লজ্জায় কখনো কথা বলতাম না, মাঝে মাঝে আমার জমানো ২০ টাকা তাকে হাতে দিয়ে বলতাম, ” এটা ২০ টাকার নোট, পকেটে রেখে দেন “, তাকে হয়তো আমার মত করে কেউ আপনি বলে কখনো ডাকেনি।fboct03-2

এখন আমি ডলারে বেতন পাই, আমার আজ অনেক টাকা ( আমার প্রয়জনের চেয়ে বেশি ), প্রথম অস্ট্রেলিয়াতে আসার পর বড় ভাইয়াকে বলেছিলাম, ” ভাইয়া, আমার প্রিয় একজন মানুষ আছে, তাকে কিছু টাকা দিয়ে এসো”। ভাইয়া একটুও বুঝেনি, সেই প্রিয় মানুষটা একজন ভিক্ষুক।

প্রতিবার দেশে গেলে আমি কিসের যেন টানে শ্যামলীর সেই গলির রাস্তায় যাই, বয়সের ভারে আজ সে নুয়ে পড়েছে, তার আশে- পাশে এখন বসে কয়েকজন প্রফেশনাল ভিক্ষুক। তাদের অভিনয় আর চিৎকারে এই সদা মাথা নুয়ে থাকা বুড়া ভিক্ষুককে কেউ আর টাকা দেয় না, তার পাশে পরে থাকে খালি একটা ভিক্ষার থালা।
এবার দেশে গিয়ে তাকে খুঁজে বের করলাম, কাছে গিয়ে বললাম, ” চাচা কেমন আছেন ? ”
আমাকে অবাক করে দিয়ে উত্তর দিলেন, ” আলহামদুলিল্লাহ্‌ বাবা, আপনি কেমন আছেন ”
আমি বললাম, ” আমাকে চিনেছেন ? আমি অস্ট্রেলিয়াতে থাকি এখন, অনেক দূরের একটা দেশ ”
তিনি বললেন, ” চিনেছি বাবা, আপনে প্রতিদিন সকালে আমার সামনে রিক্সা থিকা নামতেন “..
তার হাতটা ধরে তাকে কিছু টাকা দিয়ে চলে এলাম, এখন আমি অনেক ব্যাস্ত, আমার টাকা আছে, সময় নেই, তাকে একটা পাঞ্জাবী কিনে দেয়ার সময় আমার হল না।

মাঝে মাঝে এমন গভীর রাতে ( এখন রাত ৪ টা ১৫ বাজে ) সেই ভিক্ষুক চাচার কথা মনে পরে, আমি চোখ মুছি।
মাঝে মাঝে কেউ যখন জানতে চায়, ” ভালবাসা কি ?”, আমি মনে মনে বলি, ” ভালবাসার সংজ্ঞা হয় না রে পাগল, ভালবাসা নিজেই একটা সংজ্ঞা।
কিছু কিছু সম্পর্কের নাম দিতে হয় না, অনুভব করতে হয়।