তাহাদের কথা…

বিভূতিভূষণ ও রমা দেবী

বিভূতিভূষণ ও রমা দেবী

প্রথম স্ত্রী গৌরীর অকাল মৃত্যুর পর রমা চট্টোপাধ্যায় নামে এক সাহিত্য অনুরাগী কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
তারাশঙ্কর বন্দ্যাপাধ্যাযের স্ত্রী উমাশশী কোনদিন জানতে পারেননি তার স্বামী কোনদিন তাকে একটি বই উৎসর্গ করেছিলেন কি না। আবার আরেক কথাশিল্পী মানিক বন্দোপাধ্যায়ের স্ত্রী কমলা বন্দোপাধ্যায় স্বামীর মদের বোতলে মিশিযে রাখতেন জল। লুকিয়ে রাখতেন সিগারেটের প্যাকেট।
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, চার্লস ডিকেন্স অথবা ভার্জিনিয়া উলফ দাঁড়িয়ে লিখতেন। আবার এদের একেবারেই উল্টো মেরুতে ছিলেন জেমস জয়েস। উপুড় হয়ে শুয়ে না লিখলে তাঁর লেখাই বের হতো না।অন্যদিকে বারো ঘন্টা অফিসের কাজ করে লেখার সমযই পেতেন না ফ্রাঞ্জ কাফকা।
প্রখ্যাত নাট্যকার আর্থার মিলার বিয়ে করেছিলেন যৌন আবেদনময়ী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোকে। বিয়েটা পাঁচ বছরও টেকেনি। আবার ভালোবাসার মানুষ কবি টেড হিউজেসকে বিয়ে করেও কবি সিলভিয়া প্ল্যাথ এক সকালে পাশের ঘরে সন্তানদের ঘুমে রেখে গ্যাস ওভেনে মাথা ঢুকিয়ে আত্নহত্যা করেছিলেন।

Haruki Murakami

ছুটছেন মুরাকামি

এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচাইতে রহস্যময় লেখক বলা হয় বি.ট্র্যাভেনকে। কোন সাংবাদিক অথবা প্রকাশক তাকে সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য লাভ করেনি। গোপন স্থান থেকে পান্ডুলিপি পাঠাতেন তিনি। বলতেন,লেখকের আসল পরিচয তার লেখায়।
বিচিত্র সব কাহিনি বিশ্বখ্যাত সব লেখকদের। লেখালেখির জগতের বাইরে ভিন্ন এক জীবন, ভিন্ন সব অভ্যাস। সাহিত্যিকদের জীবনের অদ্ভূত কাহিনি নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ রচনা।
শুরুতেই বলছিলাম বিভূতিভূষণের দ্বিতীয় বিয়ের গল্প।প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পর প্রায় কুড়ি বছর একা ছিলেন বিভূতিভূষণ। তারপর প্রৌঢ় বযসে তাঁর জীবনে এলেন তিরিশ বছরের ছোট রমা। সাহিত্য অনুরাগী রমার সরাসরি বিযের প্রস্তাব শুনে বিভূতিবাবু নাকি গায়ের জামা খুলে বুকের কাঁচাপাকা লোম দেখিয়ে বলেছিলেন ‘আমি তো বুড়ো হযে গেছি। আর কতদিন-ই বাঁচবো’।এই উত্তরে কিন্তু রমা পিছিয়ে যাননি। উত্তর দিয়েছিলেন ‘আপনি যদি আর এক বছরও বাঁচেন তবুও আপনাকেই আমি বিযে করবো’। এই বিয়ের পর মাত্র দশ বছর বেঁচে ছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

18poe

এডগার এলান পো

এই ভালোবাসার মানুষটিকে কী নামে ডাকতেন রমা দেবী? বিভুতিভূষণকে অজীবন তিনি আপনি করে সম্বোধন করলেও নাম দিয়েছিলেন ‘মঙকু’।বিভূতিভূষণ তাকে ‘কল্যাণী তুই’ বলেই সম্বোধন করতেন। মজার বিষয় হচ্ছে রমাও কিন্তু গল্প লিখতেন। তবে তাঁর সাহিত্য জীবন তেমনভাবে আলোর মুখ দেখেনি। একবার শুধু বিভূতিভূষণের সঙ্গে একটি পত্রিকায় তারও গল্প ছাপা হয়েছিল।
কমলা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘর বেঁধেছিলেন বোধ হয় ঝড়ের সঙ্গে। সেই ঝড়ের নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সীমাহীন দারিদ্র্য, লেখালেখি আর কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সংসার থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করেই রেখেছিল। কিন্তু তাতে তাঁর লেখায় কিন্তু ছেদ পড়েনি। সংসারে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের পাশাপাশি লেখার সংগ্রামটাও চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।এই যুদ্ধে সবসময় বিনা প্রতিবাদে পাশে ছিলেন কমলা, যাকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ডাকতেন ‘ডলি’ বলে।
প্রতিদিন পাঁচ প্যাকেট সিগারেট, ফ্ল্যাস্ক ভর্তি অফুরান চা আর অপরিমিত মদ খেতেন মানিক। অনেক সময় তাঁকে মদের হাত থেকে রক্ষা করতে ডলি বোতলে জল মিশিয়ে রেখে দিতেন। সঙ্গে চলতো স্বামীর মৃগী রোগের চিকিৎসা। এই রোগের আক্রমণে অজ্ঞান হযে যেতেন মানিক।
এই দুঃখ কষ্টের জীবনের মধ্যে কলকাতার টালিগঞ্জের পৈত্রিক বাড়ি বিক্রি করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আট হাজার টাকা পেয়েছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির আজীবন সদস্য হিসেবে সে টাকার পুরোটাই তিনি দলের তহবিলে জমা করে দিয়েছিলেন স্ত্রীকে কিছু না জানিয়ে।অবশ্য ডলি এর কোন প্রতিবাদ জানাননি। কারণ স্বামীকে তিনি ভালো করেই চিনতেন।

ডলি কষ্ট পেয়েছিলেন স্বামীর এই আচরণে? পেলেও সেসব যন্ত্রণা কখনো প্রকাশ করেননি। নিজের যুদ্ধটা চালিয়ে গেছেন। শুধু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখতে না পারলে, জ্যোৎস্না রাতে বাঁশি হাতে স্বামীকে বসে থাকতে দেখলে কষ্ট পেতেন ডলি।
একটা জীবন তীব্র বিষাদের যন্ত্রণাকে বহন করতে না-পেরে শেষ পর্যন্ত আত্নহত্যা করেছিলেন আমেরিকান কবি সিলভিয়া প্ল্যাথ। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন আরেক কবি টেড হিউজেসকে।

ernest-hemingway

দাঁড়িয়ে লিখতেন হেমিংওয়ে

কিন্তু ‘একদিন তার মরিবার হলো সাধ’। এড়িয়ে যেতে পারেননি তিনি সেই বোধকে। ১৯৬৩ সালের ফ্রেব্রুয়ারী মাসের এক ভোরবেলা লন্ডনের বাড়িতে সন্তানদের পাশের ঘরে ঘুমন্ত রেখে রান্নাঘরের গ্যাস স্টোভে মাথা ঢুকিয়ে নিজের প্রাণ নিজেই কেড়ে নিলেন তিনি।
বিষন্নতার এই রোগ থেকে মুক্তির জন্য অনেক চিকিৎসা করিয়েছিলেন প্ল্যাথ। ইলেকট্রিক শকথেরাপী পর্যন্ত চলেছিল। কিন্তু সুস্থ হয়ে ওঠেননি।
আত্নজৈবনিক উপন্যাস ‘বেলজার’ অথবা ‘ড্যাডি’ কবিতায় তাঁর এসব ঘোর উচ্ছন্নতার আভাস পাওয়া যায়।
মৃত্যুর ঘটনায় সাহিত্য মহলে বোধ হয় সবচাইতে বেশী আলোচিত হয়েছেন অ্যাডগার অ্যালান পো। ১৮৪৯ সালের ৩ অক্টোবর আমেরিকার বাল্টিমোর শহরের একটি রাস্তায় প্রায় অচৈতন্য অবস্থায পাওয়া যায় পো-কে। তার পরনের পোশাকও তার নিজস্ব ছিলো না। তাকে দ্রুত একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চার দিন অজ্ঞান থেকে ১৮৪৯ সালের ৭ অক্টোবর অ্যাডগার অ্যালান পো মারা যান।
তার মৃত্যুর অনেক পরেও মৃত্যর রহস্র নিয়ে গবেষণা চলেছে। তাঁর জীবনী লেখকদের কেউ কেউ বলেছেন, সেই রাতে পো প্রচুর মদ্যপান করে মারা যান। কারো কারো প্রশ্ন আছে, সে রাতে পো কী মৃত্যুর মাত্রায় পান করেছিলেন? আবার কেউ বলেছেন, তিনি রাস্তায় গুন্ডাদের হাতে পড়েছিলেন। তবে এই আমেরিকান লেখকের মৃত্যুর রহস্যের কিন্তু আজও কোন কিনারা হয়নি।রহস্য গল্পের লেখকের মৃত্যু রহস্যাবৃতই থেকে গেল।
লেখকদের অস্বাভবিক মৃত্যু সাহিত্যের পাঠকদের কৌতুহলকে জাগিযে রাখে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এরকমে অনেক লেখকের নাম শোনা যায় যারা জীবিত থেকেও নিজেদের সরিয়ে রেখেছিলেন লোকচক্ষুর সামনে থেকে। যেন এটাই ছিল জীবনের সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।এই অদ্ভূত মানসিকতার কোন কারণ কেউ বের করতে পারেনি। ইন্টারনেটে তথ্য ঘাঁটতে ঘাঁটতে জানা গেল পাই কোহেন নামে আমেরিকার এক ঔপন্যাসিক সাংবাদিকদের কবল থেকে রক্ষা পেতে লাফিয়ে পড়েছিলেন দোতলার জানালা দিয়ে।
এমনি আরেক লেখক ছিলেন হেনরি ড্রজার। নিজের জীবনের তেতাল্লিশটি বছর শিকাগো শহরের একটি ফ্ল্যাটে কাটিয়ে দিয়েছিলেন। একমাত্র বন্ধুর সঙ্গে শুধুমাত্র চিঠির মাধ্যমেই যোগাযোগ করতেন। না ছিল তার পরিবার-পরিজন,না-ছিল বন্ধু। ড্রজারের মৃত্যুর পর একটি ট্রাংক থেকে ১৫,১৪৫ পৃষ্ঠার উপন্যাসের পান্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়েছিলো।উপন্যাসটির নাম ছিল ‘দি স্টোরি অফ দি ভিভিয়ান গার্লস’।

kafka-pic-1425652281

কাফকা লিখতেন সারা রাত

ড্রজার নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। ১৯৭৩ সালে অন্তরালে থাকা এই লেখক মারা যান।
এমনি অরেক অদ্ভূত লেখক ছিলেন মেক্সিকোর অধিবাসী লেখক বি.ট্র্যাভেন। সবার চোখের আড়ালে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি। অন্যদের কাছ থেকে নিজেকে লুকিযে রাখতে গোপন ঠিকানা থেকে লেখার পান্ডুলিপি পাঠাতেন তিনি। শেষে প্রকাশক, সাংবাদিকরা তাকে অবিষ্কার করতে সেই ঠিকানা অনুসরন করে বোকা হয়েছিলেন নিজেরাই। সেই ঠিকানাও ছিল মিথ্যে ঠিকানা। সেখানে অন্য এক ব্যক্তি বসবাস করতেন।
তবে তাঁর উপন্যাস ‘ট্রেজার অফ দি সিয়েরা মাদ্রা’ পাঠক মহলে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল সে সময়।

henry-darger11

লুকিয়ে থাকা লেখক ড্রজার

লেখকদের অদ্ভূত জীবনের মতো লেখালেখি নিযেও আছে অনেক ছুৎমার্গ। জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামিকে লিখতে বসার আগে দৌড়াতে হয় দশ কিলোমিটার। শুনতে হয় গান।
অর্নেস্ট হেমিংওয়ে অবশ্য লিখতে বসার আগে শরীরচর্চা করতেন না। তবে তিনি খুব ভোরে উঠে লিখতে বসতেন। লিখতে শুরু করার আগে আগের দিনের লেখাটা ভালো করে একবার পড়ে নিতেন।
চাকরি ফ্রাঞ্জ কাফকার লেখালেখির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল। কাজ করতেন তিনি একটি বীমা কোম্পানীতে। সেখানে ১২ ঘন্টার শিফটে কাজ করতে হতো। তাতে বাড়ি ফিরে লেখার টেবিলে বসার আর কোন শক্তি অবশিষ্ট থাকতো না কাফকার। শেষে গভীর রাতে লেখার অভ্যাস করেন ‘ দ্যা ট্রায়াল’ উপন্যাসের এই লেখক। রাত ১১টায় লিখতে বসে ভোর পরযন্ত চালিযে যেতেন কাজ।শরীর ভেঙ্গে আসতো, মন বিক্ষিপ্ত হযে যেত কিন্তু থামতেন না কাফকা।
দাঁড়িয়ে লিখতেন হেমিংওয়ে, চার্লস ডিকেন্স আর ভার্নিয়া উলফ।বিশ্বাস হয় এই তথ্যটি? কিন্তু এটাই সত্যি। আবার এও এক অদ্ভূত তথ্য যে, ডিকেন্স রাতেরবেলা বেড়াতে যেতেন প্যারিস শহরের লাশকাটা ঘরে। তাঁর এই অদ্ভূত স্বভাবের অবশ্য কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি খুন হওয়া বা আত্নহত্যা করা মানুষের মৃতদেহ দেখতেন।
দুনিয়া কাঁপানো ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসের লেখক জেমস জয়েস বিছানায় শুয়ে লিখতেন। তখন তাঁর পরনে থাকতো সাদা রঙের ব্লেজার। তিনি লিখতেন মোটা ক্রেয়ন পেন্সিল দিয়ে। ছোটবেলা থেকে চোখের অসুখ ছিল। শেষদিকে চোখে ভালো দেখতে পেতেন না। সেজন্যই মোটা রঙ পেন্সিল ব্যবহার করতেন। সাদা ব্লেজার পড়তেন যাতে আলোর প্রতিফলন খাতার ওপর বেশী মাত্রায় পড়ে।

leo-and-sophia-tolstoy

লিও টলস্টয় ও স্ত্রী সোফিয়া

বিয়ে আর প্রেম নিয়ে সাহিত্যিকদের নানা কাহিনি প্রায়ই শোনা যায়। পৃথিবী খ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও টলস্টয় পারিবারিক জীবনে ছিলেন অসুখী। ‘আনা কারেনিনা; উপন্যাসটি লিখে শেষ করার পর তিনি উপলব্ধি করেছিলেন স্ত্রী সোফিয়ার সঙ্গে আর বনিবনা হচ্ছে না তার। মানসিকভাবেও তারা অনেক দূরে সরে গেছেন। টলস্টয় সংসার থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন নিজেকে।দূরে গিয়ে একেবারে সাধারণ এক জীবন যাপন করেন তিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত।
আবার এই বিয়ে করে ঝামেলায পড়েছিলেন নাট্যকার আর্খার মিলার। তার প্রেমে পড়েছিলেন আবেদনময়ী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো। ভালোবাসা গড়ালো বিয়ের পিঁড়িতে। কিন্তু তারপর ঘটলো মিলারের স্বপ্নভঙ্গ। মনরোর মতো জেদি, বদমেজাজি মহিলার পাল্লায় পড়ে তার জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে গিয়েছিল। দিনের পর দিন মানসিক যাতনায় ভুগে পাঁচ বছর পর বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন মিলার। এই কয় বছর একটি লাইনও তিনি লিখতে পারেননি।
প্রথম দেখায় প্রেমে পড়েছিলেন বৃটিশ কবি ডিলান টমাস। পাত্রী ক্যাটালিন ম্যাকনামারা। ডিলান টমাসের মদ প্রীতি তখন কিংবদন্তী তুল্য। ক্যাটালিনও পান করতেন অপরিমিত। লন্ডনের এক পাবে দুজনের দেখা হয়েছির। তারপর বিয়ে। কিন্তু বিয়ের পর স্ত্রীর হাতে বিস্তর মারধোর খেতেন টমাস। তবে এই বিয়ে বিচ্ছেদে গড়ানোর আগেই মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ডিলান টমাস মারা যান একসঙ্গে ১৮ পেগ মদ খেয়ে।

নয়ন আহামেদ