তার বেঁচে থাকা

রুদ্রাক্ষ রহমান

শামসুর রাহমানের অনেক গুণ। সবেচেয়ে বড় গুণ, তিনি কবি। তার পরিচয় তিনি কবি শামসুর রাহমান। তিনি অনেক অনেক অনালোচিত  কবিতার নান্দনিকতায়-উজ্জ্বল কবিতা লিখেছেন; কবিতার সঙ্গে কটিয়েছেন পুরো একটা জীবন। তবে তাকে এক ধরনের অমরত্ব দিয়েছে- ‘আসাদের শার্ট’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’ এবং ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাগুলো।

রবীন্দ্র অধ্যায়  আলগোছে একটু পাশে সরিয়ে রেখে এটা বলতে প্রয়াস করি যে, কবিতা লেখাও যে অনেক উজ্জ্বল একটা কাজ, কবিজীবনও যে এমনতর মহিমান্বিত হতে পারে, বাংলাদেশে, বাঙালি মুসলমানের সামনে তার মহীরুহসম উদাহরণ দাঁড় করিয়ে গেছেন শামসুর রাহমান। তিনি সুদর্শন, মিষ্টভাষী, স্বভাবে শিশির-আঘাতী, আমৃত্যু প্রেমপিপাসু।

 আমার এখনো এক ধরনের অহংকার হয় এই ভেবে যে, এই কবিকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। তার সঙ্গে অনেক পথ হাঁটার দাগ আছে। এ কথাটা আবারও বলতে লোভ হচ্ছে আমার; এমনি এক ২৩ অক্টোবরের সকালে, কবির শ্যামলীর দোতলা বাড়ির দক্ষিণের ঘর। নরম রোদ এসে স্মিত হেসে জন্মদিনের আলোকমালা পরিয়ে দিচ্ছে কবির গলায়। তিনি ঝলমলে এক কিশোর তখন। লেখার টেবিল ডাকছে। কলম অপেক্ষা করছে তার জন্য। রুলটানা ডায়েরির পাতা শঙ্খযোনি মেলে দাঁড়িয়ে আছে তার স্পর্শ পেতে। তিনি  মেতেছেন রোদের সঙ্গে খেলায়। ঠিক তখন টেলিফোনে ঝংকার তোলে ধ্বনি। তিনি ক্রেডেল থেকে রিসিভার তুলে নিয়ে বলেন, ‘হ্যালো’। একট পরই কবির চেহারা রঙ বদলায়।  মনে হয় সহ¯্র গোলাপ পাপড়ি এসে ঢেকে ফেলে তার মুখম-ল। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি টেবিলের কোণায় অপেক্ষমান চায়ের কাপ তুলে নেন অন্য হাতে। শব্দহীন চুমুক বসান। তারপর বলেন, ‘চায়ের পেয়ালায় ওষ্ঠ ছুঁইয়ে জীবন পান করছি’।

কবি শামসুর রাহমান জীবন পান করতে শিখেছিলেন। এই খুনের শহরে, এই হিংসার শহরে, এই হানহানি, দখলের শহরে, অনেক শত্রুর সঙ্গে লড়তে লড়তে তিনি স্নিগ্ধ-নাগিরক কবিতা লিখতে পারতেন এবং চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি তা অব্যাহত রেখেছিলেন। ডায়েরির একটি পাতা- নামে কবিতায় তিনি লিখেছেন

সকালের রোদে এই সাতই আশ্বিনে

আরো একটি দিন এলো জানাতে সাদর

সম্ভাষণ। বিছানায় শুয়ে-শুয়ে চাদরে পা ঘষি,

অন্যমনে আঙুল চালিয়ে দি চুলে,

কোথাও উজ্জ্বল মোটরের হর্ন বেজে ওঠে (শুনি)

চেনা শব্দ হরেক রকম। টিক টিক ঘড়ি বাজে, ঠিক ঠিক

টিকটিকি সাড়া দেয় সহযোগী তন্ময় নিষ্ঠায়।

বাথরুমে গড়ায় কলের পানি, বারান্দায় দেখি

হাওয়ায় টবের ফুলে সে কী গলাগলি।

আলোলাগা ভালোলাগা বেলা

 খেলা করে সত্তার প্রাঙ্গণে

বেঁচে আছি।

আলনায় ঝোলানো আমার

ইজের কামিজ সাদা দেয়ালের ফুল,

টেবিলে পুরনো ছবি, শুকনো ফল, দাড়ি কামাবার

সরঞ্জাম, অসমাপ্ত কবিতার পান্ডুলিপি, বই

সবকিছু ঝলমলিয়ে ওঠে

আশ্বিনের রোদ্দুরে এবং

মনে হয় থাকব এখানে চিরদিন।

যখন পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে

রুটি মাখনের ঘ্রাণ, সোনালি চায়ের

সুগন্ধ, চুড়ির শব্দ, দরজার আড়ালে তোমার

কণ্ঠস্বর ছোঁয় প্রাণ, ভাবি কী সুন্দর

এই বেঁচে থাকা…

এই হলেন শামসুর রাহমান, নাগরিক কবি, বেঁচে থাকার কবি, বাঁচিয়ে রাখার কবি।

জন্মদিনের শুভেচ্ছা তাকে। তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাববেন আশ্বিন থেকে ভাদ্রে।