পাহাড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে লেখা

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

(কলকাতা থেকে) ছোটবেলায় তো একেবারেই পড়াশোনা করতাম না…৷
তবু যদি কখনও বা চক্ষুলজ্জার খাতিরে পড়তে বসতেই হতো, তা হলে সবার আগে খুলতাম ঢাউস অ্যাটলাসটা…৷ ভাল্লাগত…৷
কোন দেশে কী কী অদ্ভুত নামের শহর, কোথায় কোন নদী, কোন রেলপথ কোত্থেকে কোথায় গিয়েছে, কোন এলাকায় কেমন গাছ হয়, কোথায় পাহাড়ি এলাকা, কোনখানটাই বা সমুদ্র ছুঁয়ে ফেলা…. দেখতাম খুঁটিয়ে…৷
একটা জিনিস মনে হতো খুব, মানচিত্রে সব জায়গার এত খুঁটিনাটি থাকে, কিন্তু কোনও জায়গার মানুষের কথা থাকে না কেন… মানে কোন এলাকায় কত মানুষ, তারা কী পরে, কী খায়, কোন ভাষায় কথা বলে…এ সব…৷
পরে বুঝেছি, মানচিত্রের অর্থ কখনওই মানুষ নয়…৷
কারণ রাস্তা-নদী-শহর বদলালে মানচিত্র বদলায়, কিন্তু মানুষের বাঁচা-মরায় মানচিত্র বদলায় না…৷ অথচ মজার ব্যাপার হল, মানচিত্রের ওপরেই নির্ভর করে অনেক মানুষের বাঁচা-মরা…৷
আর মানচিত্র মেপে নেওয়ার যুদ্ধে মানুষের মৃত্যু নাকি গৌরবের…!
মানে আমি তোমার জন্য মরে যাব, তুমি জানতেও পারবে না, অথচ তোমার জন্য মরার গৌরব সংক্রামিত করবে আরও অনেকগুলো জীবন…কী আশ্চর্য না…?
আমার ছোটবেলায় মানচিত্র আছে, যুদ্ধ নেই…৷ যুদ্ধের কথা একটু একটু শুনেছি আর পড়েছি কেবল…৷
প্রিয়তম চিলেকোঠার ওপর নাকি যুদ্ধবিমান পাক খায়, বিকেলের চা উনুন থেকে নামতেই পাড়া জুড়ে কার্ফুর পর্দা মুড়ে যায়, চাল-ডাল-নুন-তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়, কত কত জনের চাকরি যায়, সাপ্তাহিক ডাকে পাহাড় থেকে সারি সারি কফিন নেমে আসে…৷
তবে এর কোনও কিছুই বোধ হয় ততটা জোরদার ব্যাপার নয়, যতটা জোরদার দেশের প্রতি ভালবাসা…৷ আর সেই ভালবাসা নাকি প্রতিশোধ দাবি করে…৷ দাঁতেরতিয়াষ মুখোপাধ্যায়99 বদলে চোয়াল দাবি করে…৷ তো সেই চোয়াল-উপড়োনো যুদ্ধ নাকি হেব্বি ব্যাপার..৷ আর উপড়োতে গিয়ে মরে যাওয়া…ওই যে, গৌরব…!
সহজ হিসেব নাকি বলে, সতেরো জন মারা যাওয়ার শোকটা ভুলতে আরও সতেরো জনকে পাল্টা মারা জরুরি৷ সতেরো…চৌত্রিশ…একান্ন…আটষট্টি…পঁচাশি… মৃত্যুর নামতা বেড়ে চলুক…৷
মানচিত্রের সীমারেখাগুলো প্রকট হোক…৷ দিনের শেষে কোথাও কোনও মানুষ বেঁচে না থাকলেও তার কিছু যাবে আসবে না…৷
আমাদেরও কি কিছু যাবে আসবে…?
ক’দিন আগেও আমার টাইমলাইন ভরে ছিল নরম কাশফুলে… আজ সেখানেই যুদ্ধ যুদ্ধ রব…৷ পোস্টকর্তারা অভিন্ন ব্যক্তি…৷
আমি মানচিত্র নিয়ে পাহাড় যাচ্ছি, যে পাহাড়ে যুদ্ধ নেই…৷