কুমির তোর জলে নেমেছি

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়িরমতোকিছুটাআনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়িবিভাগে।

কনকচাঁপা

ছোট বেলায় শান্তিবাগ থাকতাম। বাসার নম্বর ছিলো ২৮৪। চার দিকে চার টা বাসা। বাইরের মুখ ছিলো মুখোমুখি। রাস্তা থেকে নামলে পর পর ডানদিকে দুটো বাসা বা দিকে দুটো বাসা। আমরা বাচ্চারা যখন বিকেলে আসরের নামাজ শেষে খেলতে বের হতাম আম্মা পাউডার দিয়ে চুল ঝুটি করে চোখে কাজল দিয়ে দিতেন।
মায়ের আদর ভালবাসা মেখে দু একটি জামা রোজ অদল বদল করে খেলতে নেমে যেতাম। খেলার নাম কি ছিলো বলতে পারবে? আমরা খেলতাম ‘কুমির তোর জলে নেমেছি’। চার বাড়ির চারটি দুই ধাপের সিড়ি।নিজেরা নিজেরা মুছে নিয়ে বসতাম।সবাই এসে পড়ে দশ বিশ গুনে একজন কুমির হত।সিড়ি গুলো আমাদের ডাঙা বা ঘর। কুমির নজর রাখতো কে জলে নামে। জলে নেমে অন্যের ঘরে যেতে konokchapaহবে। কুমির ছুঁয়ে দিলে সেই কুমির। খেলাটা ছিলো খেলা।কিন্তু শিশু ছিলাম তো! শিশুদের আকাশ অনেক বড় এবং সত্য! যখন ডাঙা ছেড়ে জলে নামতাম তখন নিজেকে এতিম মনে হত।ভয়ংকর ভয় পেয়ে বসতো।মনে হত কোথাও কেউ নেই।মাঝ দরিয়ায় আমি একলা।কুমির কাছে এগিয়ে আসতেই চিৎকার করতাম।মাগোওওওওও।রতনাপা কিলাতেন।এই চুপ থাক।
কিন্তু আমি! সত্যি সত্যি জলে নেমে খেই হারাতাম।আমার সেই চারটি বাসার ছোট মাঠ রুপি ছোট জায়গাটা জলে থৈথৈ লাগতো। আমি হাবুডুবু খেতাম। ভাবতাম আম্মা কি জানালা দিয়ে দেখছেন? আমাকে উদ্ধার করছেন না কেন? আব্বা যদি তখন এ পথ দিয়ে যেতেন! আমি কেঁদে ফেলতাম।জীবনের ছোটছোট খানাখন্দ আমাকে খুব ভয় পাইয়ে দিতো। আমি পরস্পর বিরোধী স্বভাবের একজন মানুষ। খুবই বুদ্ধিদীপ্ত কিন্তু সহজ সরল।জীবনের ডাঙায় থেকে পাশে সমান্তরাল থৈথৈ জলের কুমির গুলোর ছলচাতুরী তে তখনো ভয় পেতাম, এখনো পাই। শিশু বয়সের সেই খেলার জীবন আর এখনকার এই বাস্তবতায় একই ব্যপার ঘটে যায় নিরন্তর। তা হলো তখন কুমির বলে কয়ে নির্ধারিত সময়ে হানা দিতো। কিন্তু এখন আর কুমিরের হানার কোন সময়গময় নেই।পুরোটা জীবন জুড়ে শুধু কুমির শুশুক কামট ভরা।কোন দিক থেকে কখন সে আক্রমণ করবে আমরা কেউ জানিনা! এই জীবনের সুখ রুপি ডাঙার ওপর কুমির রুপি দুঃখ গুলোর বড়ই হিংসা।