ভালবাসতে জানতে হবে, ভালবাসতে শিখতে হবে

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতীকক্রিয়া।

কাশফিয়া ফিরোজ টিনা

কাশফিয়া ফিরোজ টিনা

“আমারও দেশেরও মাটিরও গন্ধে ভরে আছে সারা মন, শ্যামল কোমল পরশ ছড়াযে নেই কিছু প্রয়োজন “, আহা কি অপূর্ব। গান যে মায়া বিলাতে পারে তা প্রথম জেনেছি আব্বুর কাছ থেকে। গান শুনে যে কাদঁতে হয় তাও শিখেছি আব্বুর কাছ থেকে।
খুব ছোটতে বাসায় ওস্তাদ রেখে আয়োজন করে শুরু আমার গান শেখা।
আব্বু সামনে বসে থাকতো, দিনের পর দিন শুধু উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম, কিন্তু মনতো মানেনা।
আমি ত্যক্ত, বিরক্ত।
মানে আছে কোন? কুইনাইন খাওয়ার মতো লাগতো গান শেখাকে।
এরপর আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
আমাকে জীবনের প্রথম গান হারমোনিয়ামে তুলে শেখানো হবে। আমার সে কি আনন্দ! হারমোনিয়ামে কোন গান প্রথম তুলবো তা নিয়ে কতো জল্পনাকল্পনা।
কিন্তু!
না মানে ঠিক আছে! ওস্তাদজিকে আব্বুর স্পেশাল রিকোয়েস্ট।
অগত্যা, আজ্ঞাবহ হয়েই শিখলাম সেই গান।
আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনের কথা, আমি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাচ্ছি শাহনাজের “একবার যেতে দেনা আমার ছোট্ট সোনার গায়, যেথায় কোকিল ডাকে কুহু দোয়েল ডাকে মুহুর্মুহু, নদী যেথায় ছুটে চলে আপন ঠিকানায়” আর আব্বু হুহু করে কাদঁছে।
আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি তবে দেশের গান শুনে আব্বুকে কাদঁতে দেখেছি বহুবার। যুদ্ধের গল্প বলতে বলতে কাদঁতে দেখেছি। ট্রাকে করে ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে যেয়ে নাকি বসে থাকতো। এক রাতে বঙ্গবন্ধু কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “বাড়ি যা এখন, মা চিন্তা করবে”, একথা বলতে বলতেও কাঁদে।
ক্রিকেটে বাংলাদেশ জিতলেও কাঁদে, ১৬ই ডিসেম্বর মাইকে দেশের গান শুনেও কাঁদে।
কি বিচিত্র মানুষের মন! bangladesh1971
অনেকবার জানতে চেয়েছি, আমরাতো স্বাধীন – ব্যথা কোথায়?
উত্তর পাইনি।
তবে যখন দেখি সারাদিন কাজ শেষে আমেরিকায় বসেও ছোট চাচা লাইভে ক্রিকেট দেখে, তিনি আমার থেকেও ভালো খবর রাখে দেশের, মেরিনা আপা সোশ্যাল মিডিয়ার সমর্থকদের পজিটিভ মেসেজিং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ দলকে অনুপ্রেরণা জোগাতে তৎপর থাকে তখন তার মাঝ থেকে উত্তর খুঁজি।
রক্তে আমার দুরন্তপনা, পৃথিবী জয়ের তাড়না।
আর আব্বু আমাকে স্বপ্ন দেখায়, মা-মাটি-দেশ।
আব্বুর স্বপ্নপুরণে মাত্র ৪ হাজার টাকা বেতনে চাকুরি শুরু বেসরকারি এক উন্নয়ন সংস্থায়। খুব কাছের অনেকেই ছিঃ ছাঃ করেছে।
কোন ধারণাই ছিলনা পারবো কিনা কিংবা জানিনা আদৌ পারছি কিনা, তবে নেশা একটা হয়েছে বৈকি।
ঘুরে বেড়ানোর নেশাটা আব্বুর কাছ থেকেই। ভালই ঘুরতাম আমরা। গাড়িতে সারারাস্তা হেমন্ত, মান্না, ভুপেন, সাবিনা, কিশোর, শাহনাজ, এন্ড্রু সবই চলতো দেদারসে।
কখনো “এই পদ্মা এই মেঘনা, এই হাজার নদীর অববাহিকা। এখানে রমণী গুলো নদীর মতো, নদীও নারীর মতো কথা কয়”
কখনো “মাটির মানুষ আছে সোনার মহল গড়িয়া, জ্বালায়াছে সোনার পিনিস যতন করিয়া”
কখনো “মানুষ মানুষকে পণ্য করে, মানুষ মানুষকে জীবিকা করে”
আহা! কি মায়া।
আজ আব্বু নেই,
মায়া আছে।
মাটির টানে যখন ঢাকার বাইরে যাই, ধুধু প্রান্তর, বাতাসে শীতের গন্ধ, বুনো ফুল, রাজহাঁস, রোদে ঘামে ভেজা চ্যাটচেটে শরীর – তখন মনে হয়, আব্বু তার কিশোরী মেয়েকে ভালবাসতে শিখিয়ে দিয়ে গেছে। প্রকৃতি আর আবেগের যুগলবন্দী। ভালবাসতে জানতে হবে, ভালবাসতে শিখতে হবে।
“চোখ থেকে মুছে ফেলো অশ্রুটুকু, এমন খুশির দিনে কাদঁতে নেই
হারানো স্মৃতির বেদনাতে, একাকার করে মন রাখতে নেই।
ওরা আসবে, চুপি চুপি কেউ যেন ভুল করে গেওনাকো মন ভাঙ্গা গান
সবকটা জানালা খুলে দাওনা”