বাংলাদেশের প্রশংসায় বিদেশী গণমাধ্যম

আহসান শামীমঃ চট্টগ্রাম টেস্টে বাংলাদেশের পরাজয়টা মেনে নিতে পারছেন না বিখ্যাত ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রাফের ক্রীড়ালেখক জোনাথন লিউ।
বাংলাদেশের ক্রিকেটকে দীর্ঘদিন থেকেই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন লিউ। তিনি জানেন বাংলাদেশ খেলে আবেগ দিয়ে। একইসাথে সেই আবেগে আক্রান্ত হয় কোটি ক্রিকেটপ্রেমী। টেলিগ্রাফের সাংবাদিক লিউয়ের মতে, ‘চট্টগ্রামে বাংলাদেশ জিতলে তা শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুরাগীদের জন্যই আনন্দের বার্তা নিয়ে আসত না, টেস্ট ক্রিকেটে ঘোষিত হতো নতুন এক শক্তির আগমন বার্তা। বাংলাদেশের জয় ক্রিকেটের অন্যান্য দুর্বল ও ক্ষুদ্র দেশগুলোকেও অনুপ্রাণিত করত দারুণভাবে। বাংলাদেশের জয় ক্রিকেটের ঐতিহ্যের নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতো, নতুন এক গল্পগাথার জন্ম দিত। যে গল্পগাথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ত। আলোচিত হতো।’ এই জয়কে ইংলিশ দলের ‘মানসিক শক্তি’ ও ‘দৃঢ়তা’রও জয় বলা হচ্ছে। অবশ্য  ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফে লেখা এক কলামে জোনাথন লিউ লিখেছেন, ‘এই ম্যাচে বাংলাদেশ জিতলে টেস্ট ক্রিকেটেরই ভালো হতো।’

জোনাথন লিউ

জোনাথন লিউ

তিনি শুরুতেই লিখেছেন, নিজের দেশে হিসেবে আমি অবশ্যই চাইব ইংল্যান্ডের জয়। কিন্তু আমি বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের দেখে কেমন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। ইংল্যান্ড তো অনেক টেস্ট খেলে, অনেক সিরিজ জিতে; কিন্তু সেদিন মনে হয়েছিল রান তো মাত্র ২৮৬, কী এমন ক্ষতি হতো বাংলাদেশ জিতলে? আমার মনে হয়েছিল বাংলাদেশ জিতলে ভালই হতো। সবশেষে ক্রিকেটের বিস্তার এবং টেস্টে সকল দেশের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে এই বিখ্যাত ক্রীড়ালেখক লিখেছেন, “আপনি ব্রিটিশ হিসেবে নিজেদের ক্রিকেট দলের উন্নতি চাইছেন, কিন্তু ক্রিকেটের উন্নতি চাইছেন কি ? নাকি শুধু মুশফিকুর রহিমের হতাশায় ক্লিষ্ট মুখখানি দেখে যেতে চান? টেস্ট খেলুড়ে  দেশগুলো কি সমান সুযোগ পাচ্ছে? ক্রিকেটে এখন ব্যপকহারে রাজনীতি প্রবেশ করছে যা সত্যিই আশংকাজনক। বিভক্ত ক্রিকেটবিশ্বের সিদ্ধান্ত সার্বজনীন নয় তা প্রমাণ করতে আরও কিছু দরকার আছে?”
নিজের বক্তব্যের পক্ষে আরও শক্তপোক্ত যুক্তি প্রদান করেন লিউ। তিনি লিখেছেন, “যদি আপনি সত্যিকারের ক্রিকেটপ্রেমী হন তবে শুধু নিজের দেশের মাঝেই আটকে থাকবেন না। আপনি তখন ক্রিকেটের মঙ্গল চাইবেন। আমি অবশ্যই আমার দেশকে সবার আগে সমর্থন করব। কিন্তু যখন দেখব কোন একটি দেশের ক্রিকেটাররা নিজেদের সর্ব্বোচ্চটুকু দিয়ে উন্নতির চেষ্টা করে যাচ্ছে তখন তাদের কেন সমর্থন দেবো না? আমি ব্রিটিশ তাতে কি আসে যায় । ইংলিশদের পক্ষে বিতর্কিত আম্পায়ারিংয়ের শিকার বাংলাদেশের ক্রিকেট এমন ধারনা থেকেই তিনি তার কলমে প্রতিবাদ স্বরূপ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সেদিন জিতলে ক্রিকেটের  জয় হতো ।
ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি মেইলে বাংলাদেশে বসেই কলাম লিখছেন বেয়ারস্টো। তিনি চট্টগ্রামে টেস্ট জয়ের বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর লেখায়। বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম টেস্টের জয়টা বিরাট এক জয়। আমার কাছে এই জয় ২০১৩ সালে অ্যাশেজ সিরিজে ট্রেন্টব্রিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই জয়টির মতোই। যে ম্যাচটা আমরা জিতেছিলাম ১৪ রানে।’

টেস্টের চতুর্থ দিনটা বেয়ারস্টোর কাছে ছিল সবচেয়ে কঠিন। মাঠ থেকে হোটেলে ফিরে নাকি বেঘোরে ঘুমিয়েছিলেন তিনি। তবে পঞ্চম দিন সকালে ইংল্যান্ড দল যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিল বলে লিখেছেন এই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান, ‘অনেকেই বলছে, আমরা নাকি চতুর্থ দিন শেষে ঘুমহীন রাত কাটিয়েছি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, আমি সে রাতে প্রচণ্ড ক্লান্ত ছিলাম। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে উইকেটকিপিংয়ের চ্যালেঞ্জ ছিল, মনোযোগ রেখে রান করার চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে আমি রাত সোয়া নয়টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি। টানা ঘুম দিয়ে সকালে উঠি। পঞ্চম দিন সকালে মাঠে আমরা বেশ ফুরফুরে ছিলাম। আমরা জানতাম যে দুটি ভালো বলই বাংলাদেশকে অলআউট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু দিনের দ্বিতীয় ওভারে বেন স্টোকসের বলে তাইজুল ইসলামের গ্লাভসে লেগে বল যখন সীমানা ছাড়া হলো, তখন প্রমাদ গুনেছিলাম। কিন্তু স্টোকস তো বাংলাদেশকে শেষ করে দিল দুটো বলেই।’
বাংলাদেশ সফরটা বেশ উপভোগ করছেন বেয়ারস্টো। কলামে প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশ সফরে ইংল্যান্ডে দলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার, ‘এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর উপভোগ করছি। চট্টগ্রামে যে হোটেলে আছি, সেটা তো দুর্দান্ত। নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। এই নিশ্চিন্ত নিরাপত্তাই আমাদের ক্রিকেটে মনোযোগী হতে সাহায্য করেছে। আমার মনে হয় সেটি দলের খেলাতেই প্রতিফলিত। আমরা এখন প্রস্তুত হচ্ছি শুক্রবার ঢাকায় শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের জন্য। টেস্টটা যথেষ্ট কঠিনই হবে। প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ কিন্তু বেশ দ্রুতই শক্তিশালী দল হয়ে উঠছে। ইংলিশ ক্রিকেটার জনি বেয়ারস্টো বাংলাদেশকে রাখলেন অন্যরকম এক উচ্চতায়।bd_cricket
চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট ২২ রানে জিতেছে ইংল্যান্ড। শেষ ইনিংসে ২৮৬ রান তাড়া যে কোনো প্রেক্ষাপটেই বেশ কঠিন। চট্টগ্রাম টেস্টের উইকেট বিবেচনায় সেটি ছিল প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি।  ইমরুল কায়েসের দারুণ শুরু, মুশফিকুর রহিম ও সাব্বির রহমানের দারুণ এক জুটিতে স্বপ্ন দেখছিল বাংলাদেশ। জয়টা ছিল হাতের মুঠোয় । পন্চম   দিনের সকালেই শেষ হয়ে যায় সেই স্বপ্ন। স্টোকসের দুটি বলে তাইজুল ও শফিউল বিদায় নিলে ২২ রানের জয় পায় ইংলিশরা। অন্যদিকে চট্টগ্রামের টেস্টে যে দুটি বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন স্বয়ং আম্পায়াররা। বৃটিশ গণমাধ্যমে ব্যাপারটা খুব ভালো ভাবে মেনে নেননি । ডেইলি মেইল চট্টগ্রামের প্রথম টেস্টে বিতর্কিত  আম্পায়ারিং নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ।
চট্টগ্রাম টেস্টে সর্বোচ্চ ২৬ টা  রিভিউ নেওয়া হয়েছে। ক্রিকেটে এই সিস্টেম চালু হওয়ার পর থেকে যা সবচেয়ে বেশি।
এমন জয়ে অ্যালিস্টার কুকের দল উচ্ছ্বসিত হলেও খুশি হতে পারেননি সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভন। এভাবে খেললে ভারতে পাঁচ টেস্টের সিরিজে ধবলধোলাই হওয়ার কথাও জানান ভন। বাংলাদেশ টস জিতে আগে ব্যাট করলে ম্যাচের ফল অন্য রকম হতেই পারত। উত্তরসূরিদের সতর্ক করে দিয়ে ভন বলেন, ‘টসে জিতেও মাত্র ২২ রানে জিতেছে ইংল্যান্ড’। টেস্ট জয়ের উচ্ছ্বাসে আপত্তি নেই ভনের, তবে এ ম্যাচ থেকে শিক্ষা নিতে বলছেন তিনি, ‘হ্যাঁ, জয়টা উদ্‌যাপন করুক তারা’। কিন্তু তাদের একটু সময় নিয়ে অবস্থাটা বোঝা উচিত। প্রথম ইনিংসে আমাদের স্পিনাররা যেভাবে বল করেছে, ভারত ৬০০ রান করবে। আর যদি ভারতেও আমাদের ২১ রানে ৩ উইকেট পড়ে,তাহলে ২০০ পেরোতে হবে না ।
বাংলাদেশের সাথে  শেষ টেস্ট খেলার জন্য প্রস্তুত ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল। তবে শুধু বাংলাদেশের কথা চিন্তা করলে হচ্ছে না। কারণ, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি তাদের যেতে হবে ভারতে। সেখানে শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে সিরিজ খেলবে তারা। এ উপলক্ষে স্পিনে ইংল্যান্ডের শক্তি বৃদ্ধি করতে পরামর্শক হিসেবে পাকিস্তানের কিংবদন্তি স্পিনার সাকলাইন মুশতাককে নিয়োগ দিয়েছে ইসিবি।