‘কালো কালো এত বল, তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেন

istiak

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

 সাম্প্রতিক সময়ে খুব নামকরা বহুজাতিক কোম্পানীর একটা বহুল প্রচলিত রঙ ফর্সাকারী ক্রীমের নামে আদালতে মামলা হয়েছে। মহামান্য আদালত জানতে চেয়েছেন ঐ রঙ ফর্সাকারী ক্রীম, শরীরের ত্বক ফর্সা করার জন্য যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল সবার প্রতি সেটা কিভাবে নির্ধারিত হয়েছিল? মানে আসলেই যে গায়ের রঙ ফর্সা করে তার প্রমান কি? এখন আদালতের ব্যাপার আদালতেই নিষ্পত্তি হবে। আমাদের কাজ হলো গায়ের রঙ ফর্সা করা কেন দরকার সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা। আমাদের দেশে দুটো জিনিষ থাকলে আপনার সাত খুন মাফ।এক; যদি ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন আর দুই; যদি গায়ের রঙ ফর্সা হয়! যে মেয়ের গায়ের রঙ ফর্সা, তার চেহারা সুরত যাই হোক না কেন বিয়ের বাজারে তার দারুন ডিমান্ড! ছেলেরা অবশ্য গায়ের রঙের সুবিধা খুব একটা পায় না, তাদের বেলায় টাকাটা মূখ্য। আজকাল অবশ্য ছেলেদের রঙ ফর্সা করার ক্রীমও বাজারে পাওয়া যায়, নিশ্চয়ই গোপনে অনেক ছেলেই ইউজ করে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে বেশ কিছু কথা বলার আছে। আপনাদের ক্রীম যদি এতই ভালো হয় তাহলে যে মেয়েটা এমনিতেই সুন্দরী, তাকে মডেল বানানোর দরকার কি? আফ্রিকার কোন মেয়েকে মডেল বানানো হোক। শাখরুখ খান কেন, ক্রিস গেইলকে বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হোক!

mirror_capgrasএবার আসা যাক আমাদের মানে বাঙালী জাতির এত সাদা চামড়া প্রীতি কেন সেই প্রশ্নে। আমাদের পূর্ব পুরুষ মানে বঙ্গীয় ব-দ্বীপ এলাকায় বাস করা লোকজনের গায়ের রঙ তো মাটির মতই শ্যামলা ছিল। হঠাৎ এত সাদার প্রতি ভক্তি উদয় হোল কিভাবে? নিশ্চয় ইংরেজদের শাসন শুরু হবার পর থেকে। বাংগালী হিসেব করে দেখল লুংগির বদলে প্যান্ট পরে হাফ সাহেব হয়ত হওয়া যায়, কিন্তু গায়ের চামড়া তো বড় বাধা হয়ে রইল। এদিকে স্বদেশীদের আন্দোলনে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী দেশ ছাড়ল বটে, কিন্তু বাংগালীদের যে চির আক্ষেপ গায়ের রঙ নিয়ে সেই কথাটা ভুলল না। বহু বছর পরে আবারো যখন বিদেশী কোম্পানীগুলো এদেশে এসে ব্যবসা শুরু করল, তারা প্রত্যেকটা পণ্যের মূল বিজ্ঞাপন করল গায়ের রঙ ফর্সা করা নিয়ে। সাবান মাখবেন রঙ ফর্সা হবে, ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধোবেন রঙ ফর্সা হবে, গরমে পাওডার লাগাবেন রঙ ফর্সা হবে, শীতে লোশন ব্যবহার করবেন রঙ ফর্সা হবে, টয়লেট পেপার ইউজ করবেন তাও রঙ ফর্সা হবে ( শরীরের কোন অংশের সেটা বলা যাচ্ছে না)! মোবাইল ফোনের বাজারেও সেই ফোনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, যে ফোন দিয়ে ভাল ছবি ওঠানো যায়। সোজা কথায়, যে ফোনে ছবি এডিট করে ভোতা মুখ সোজা করা যাবে, কালো মুখ ফর্সা করা যাবে সেই ফোন সবার হাতে হাতে। কালো ছেলের নাম এখন পদ্মলোচন রাখা যেতেই পারে। তবে ফেসবুকের কাজ ফেসবুকে, বাস্তবে কিন্তু মুখে আটা ময়দা মেখে ফর্সা হওয়ার চেষ্টা করলে সাথে ফেভিকল ইউজ করা উচিৎ। কিছুদিন আগেই তো পত্রিকায় পড়লাম, হানিমুনে যেয়ে সমুদ্রে নেমেছিল এক নববিবাহিত দম্পতি। ঢেউ এর ধাক্কায় নতুন বউএর মুখের মেকআপ উঠে যেতেই বাধল যত বিপত্তি। স্বামী তো আর চিনতে পারেনা! না, এ মেয়ে তো সেই মেয়ে না, যার রুপে পাগল হয়ে বিয়ে করলাম। অতঃপর, ডিভোর্স! কালো বউ নিয়ে বাংগালী ছেলেদের দু:খও কম না। তবে, কবি এক্ষেত্রে সরব, ‘কালো কালো এত বল, তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেন?’ যাই হোক, সাদা-কালো নিয়ে এ জগৎ সংসার যেমন চলছে চলুক। যাদের রঙ ফর্সা করা দরকার তারা আরো বেশি করে ক্রীম ব্যবহার করতে থাকুক। তবে এসব ক্রীম নিয়ে আমার একটা জিজ্ঞাসা আছে। গায়ের রঙ সাদা হওয়াটাই যদি সৌন্দর্য্যের মাপকাঠি হয় তাহলে রঙ ফর্সা করার ক্রীম শুধু মুখে মাখার জন্য কেন বানানো হবে, মানুষের মুখটাই কি শুধু কালো হয়? তারা কী জানেন না, প্রদীপের নিচেই অন্ধকার থাকে!