কেউ নেই এই শিশুদের জন্য- না পরিবার, না সরকার!

 শারমিন শামস্


শারমিন শামস্

পিডোফাইল- মানে যারা শিশুদের প্রতি যৌণ আকর্ষণ বোধ করে। এই আকর্ষণ থেকে তারা শিশুদের যৌণ নিপীড়ন করে। যৌন নিপীড়নের পাশাপাশি শিশুদের নানা ধরণের নির্যাতন করাও এদের বৈশিষ্ট্য। পিডোফিলিয়া একটা মানসিক অবস্থা, একটা মানসিক কাঠামো।এদের মানসিক গড়নটাই এমনএরা যৌণতার জন্য শিশুদের বেছে নেয়। তবে সব পিডোফাইলই চাইল্ড মলেস্টার না, এদের কেউ কেউ চাইল্ড মলেস্টার হয়- যারা শিশুকে যৌন নির্যাতন করে। আর কেউ কেউ যৌনতার জন্য শিশুদের প্রতি গোপনে আকর্ষণ অনুভব করে।এই দুই প্রকারই খুবই ভয়ংকর। সমাজে এ ধরনের লোকের সংখ্যা কম না। এরা অধিকাংশই পুরুষ, তবে নারীও আছে এদের মধ্যে।

শিশুদের প্রতি সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন এখন খুবি আলোচিত একটা ব্যাপার। এ নিয়ে বড় বড় গবেষণা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এখন পিডোফিলিয়াকে মানসিক অসুস্থতা ধরা হলেও এটির কোন চিকিৎসা আছে বলে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। কিছু সাইকোথেরাপি আছে, তবে সেগুলো খুবই অনির্ভরযোগ্য এবং সাময়িক।

শিশু নির্যাতন এই দেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়ন হরহামেশা ঘটছে। এসবের মূল শিকার মেয়ে শিশুরাই, তবে ছেলে শিশুরাও রেহাই পায় না। এই ভয়াবহতা এ সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। শিশু নিপীড়ক অমানুষেরাবন্ধু, আত্মীয়, হিতৈষী,ভালোমানুষেরভেক ধরে থাকে। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় অতি কাছের লোকটিই শিশুকে নির্যাতন করে। কারণ তার জন্য সেটিই সুবিধাজনক। তো এই পিশাচদের আটকাবেন কীভাবে? তাদের তো চিকিৎসাও নেই। সুযোগের অভাবে এদের কেউ কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকে। সুযোগ পেলেই যতটা সম্ভব লালসা চরিতার্থ করে নেয়।sadness_

শিশু নিপীড়ন কীভাবে রুখবেন সেটি নিয়ে কথা হচ্ছে আজকাল। বাবা মাকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। বাচ্চাকে নানা কৌশলে বিষয়গুলো বোঝানোর ব্যবস্থা হচ্ছে যাতে সে নিজেও বুঝতে পারে কোনটা ভালো আদর আর কোনটা খারাপ আদর। এসবই ঘটছে। কিন্তু সেই সচেতনতার জোয়ার শহরাঞ্চলেই পৌঁছেনি ঠিকমত, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে তা আশা করাই ভার। ফলে ‘বড় আব্বা’ ডাকের সুযোগ নিয়ে সাইফুল মিশে গেছে পূজার পরিবারের সাথে। পূজাকে ধরে নিয়ে আঠারো ঘণ্টা আটকে রেখে ধর্ষণ করা তার জন্য সহজ হয়েছে। কারণ বাচ্চাটি তাকে বিশ্বাস করতো, তাকে ‘বড় আব্বা’ বলে ডাকতো।

পূজার প্রতি সাইফুলের লালসা নিশ্চয়ই একদিনের ঘটনা না। সে নিশ্চয়ই অনেকদিন ধরেই পূজার সাথে নানান আপত্তিকর আচরণ করেছে, যা পূজার অসচেতন বাবা মা খেয়াল করেনি, বোঝেনি, জানেনি। শিশু পূজা ব্যাপারটি অস্বস্তিকর বুঝেছে কি না জানি না, কারণ সে এতটাই শিশু, মাত্র পাঁচ বছরেরর একটা বাচ্চা, সে ভালো খারাপ আদরের পার্থক্য বোঝার বয়সেও পৌঁছায় নাই। তো সাইফুল হলো বড় আব্বা, সাইফুলকে পূজার বাপ মা বিশ্বাস করেছে, আর সেই বিশ্বাসের বলি হয়েছে ছোট্ট পূজা। সেই বলি এত বীভৎস, এত নোংরা, এত অমানবিক, তা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়।

বাপ মা হতে হলে একটি জরায়ু, ডিম্বানু আর শুক্রানু থাকলেই হয় না, বাপ মা হইতে আরো কিছু বস্তু লাগে। সেসব না থাকলে বাপ মা না হওয়াই ভালো। যে সন্তানকে পৃথিবীতে আনা হয়েছে, তাকে নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব বাবা মায়েরই। হতে পারে সুবল দাশ আর তার স্ত্রী দরিদ্র, অশিক্ষিত। কিন্তু যৌন নিপীড়ন নির্যাতন সম্পর্কে তারা অজ্ঞ, এটা আমি বিশ্বাস করি না। জীবনের অভিজ্ঞতা আর শিক্ষা বলে সে বস্তু আছে, যেকোন প্রাপ্তবয়স্ক পোড় খাওয়া মানুষ তা সম্পর্কে জানে। পূজার বাপ মা তাদের সেই জ্ঞান কাজে লাগায় নাই। লাগানোর প্রয়োজনও বোধ করি মনে করে নাই। এটি একটি দিক। পরিবারে শিশুকে নিরাপত্তা দেয়া, শিশুকে সাবধানে রাখা, শিশুকে রক্ষা করা। এটি পূজার ক্ষেত্রে ঘটেনি। এবং বাংলাদেশে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই বিষয়টি অতি সাধারণ। সেখানে খোলা মাঠে ঘাটে বাচ্চারা খেলে বেড়ায়, চড়ে বেড়ায়। এখন পুঁতিগন্ধময় পৃথিবীতে আপনার সন্তানকে রক্ষা করতে হবে। তাই বাইরের খোলা ময়দানে শিশুর চঞ্চলতা স্বর্গীয় হলেও, সেই স্বর্গ তো আর চাইলেই পাচ্ছেন না। কি পাচ্ছেন? পাচ্ছেন লাশ, ধানক্ষেতে পাটক্ষেতে শিশু আর কিশোরীর লাশ, ক্ষতবিক্ষত শরীর।

একটা সুস্থ সুন্দর সমাজ, নারী ও শিশুর জন্য একটা নিরাপদ পরিবেশ দেবার অঙ্গীকার নিয়ে যারা ক্ষমতার চর্চা করে বছরের পর বছর, তাদের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে বসে থাকি আমরা। ভাবি, একদিন সব রাত্রির অন্ধকার কেটে আসবে সোনালী ভোর। কিন্তু ভোর আসলেই নিখোঁজ কন্যার নিথর শরীর ভেসে ওঠে খালে বিলে, হলুদের ক্ষেতে। ক্ষতবিক্ষত, রক্তাত্ত শরীর- যা সেই বড় আব্বার দান। সেই বড় আব্বা, যারা মিশে থাকে আপনের ভিড়ে। আদরের ছলে যারা শিশুর শরীরে হাত ঘষে। আর অথর্ব অযোগ্য বাপ মা তা দেখেও দেখে না, টেরও পায় না। ঠিক যেরকম ক্ষমতাসীনেরা। ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে প্রতিদিন বাড়ে ধর্ষিতার ভিড়, নিপীড়িত শিশুদের কান্নায় ভারি হয়ে থাকে হাসপাতালের বাতাস। স্বাধীন দেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা আর গণতন্ত্রের ইটকাঠ পাথরেরা তা দেখেও দেখেনা, টেরও পায় না!