অনন্য সাদাত হোসেন মান্টো

mantoলেখক ভবিষ্যত দ্রষ্টা। তার চেতনার দৃষ্টি সময়কে অতিক্রম করে যায় সবসময়। আর এখানেই একজন সাহিত্যিকের রচনা তার নিজস্ব পটভূমি আর সময়কে অতিক্রম করে চিরকালীন সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করে। উর্দূ ভাষার সাহিত্যিক সাদাত হোসেন মান্টোর রচনা পাঠ করতে গেলে এই ভাবনাটাই আবার নতুন করে ভাবিয়ে তোলে।

ভিন্ন এক সময়ে বসে সাহিত্য রচনা করেছিলেন মান্টো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে পৃথিবীকে, পৃথিবীর মানুষদের ক্ষত বিক্ষত করে দিয়ে থেমেছে। তখন বিশ্বের মানুষ বদলে যাওয়া আর্থ-সামাজিক পরিস্থির আয়নায় নিজের মুখ দেখছে। সামাজিক নিয়ম, রাজনীতি, অর্থনৈতিক শৃংখলার জায়গাটিও তখন প্রায় বিধ্দস্ত। মানুষের মানসিকতার জমিনেও তখন প্রবেশ করেছে প্রচুর বেনো জল।বিশ্বজুড়ে পরিবর্তনের এই ঢেউ আমাদের উপমহাদেশেও এসে আঘাত করেছিল। সে এক অদ্ভূত সময়।একদিকে কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে সংগ্রাম যেমন তীব্রতর হচ্ছিল তেমনি মানুষের মনে স্থায়ী আসন তৈরী করে নিয়েছিল স্বাধীনতার চেতনা। কিন্তু এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের আড়ালে তৈরী হচ্ছিলো আরেক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষপট। সেই নতুন রাজনৈতিক কৌশলের নাম দেশ বিভাগ।
ধর্মের ঢাল ব্যবহার করে ভারতবর্ষকে রাজনীতির ছুরি দিয়ে কেটেছেটে নতুন এক অবয়ব দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসক আর তাদের সহগামীরা। তার পরিণতি ১৯৪৭ সালের দাঙ্গা। তার পরিণতি শুধুমাত্র ধর্মের ওপর ভিত্তি করে নতুন একটি স্বাধীন দেশ তৈরী হওয়া।
দাঙ্গার ভয়াবহ আগুনের মাঝে বসে গল্প লিখেছেন মান্টো। তাঁর লেখা গল্প ‘খোল দো’, ‘ঠান্ডা গোশত’ অথবা ‘টেবাটেক সিং’ যেন ধারালো ছুরি হয়ে আঘাত করেছে এই উপমহাদেশের রাজনীতির অন্ধকার যুগের সূচন কালকে।টেনে খুরে ফেলেছে ছদ্ম রাজনীতির মুখোশ। উলঙ্গ করে দেখিয়েছে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারকে।
এখনো গল্পগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়, অন্ধকার যুগের সীমানায় আমরা রয়ে গেছি, যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন মান্টো। ‘খোল দো’ গল্পের সেই ধর্ষিতা মেয়েটিকে আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কি খুঁজে পাওয়া খুব দুরূহ? যে খোল দো কথাটা শুনেই অবচেতনার অন্ধকারে স্বয়ংক্রিয় ভাবে খুলতে উদ্যত হয়েছিল তার পরনের সেলওয়ার।অন্ধকারের এই উন্মোচন তো আজও রয়ে গেছে আমাদের সমাজে। ধর্ম নামক শক্তিকে ব্যবহার করে আমরা তো সেই অশুভ সময়কেই আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় রত। এখানেই একজন কথাশিল্পী হিসেবে মান্টো অনন্য।তিনি এতো বছর আগেই এই উপমহাদেশের রাজনীতির প্রকৃত চরিত্রকে বুঝতে পেরেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন রাজনীতির ভবিষ্যত যাত্রার নিশানা।
নিজের লেখালেখি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন এভাবে, ‘শিল্পকলাকে মানুষ অনেক উচ্চে স্থান দিয়েছে। এর যে পতাকা তা স্বর্গে গিয়ে ঠেকেছে। কিন্তু এ কথা অবিস্মরণীয়ভাবে সত্য যে প্রতিটি শ্রেষ্ঠ এবং মহান জিনিসই এক টুকরো রুটির জন্য উদগ্রীব।
আমি কিছু বলতে চাই, তাই আমি লিখি। আমি কিছু রোজগারের জন্য লিখে থাকি এবং রোজগার করি_তাই অনেক কথা বলতে পারি।নিজস্ব অনুভূতির কথা মুক্তভাবে লিখতে গিয়ে bombay-stories-coverবিপদে পড়েছিলেন এই লেখক। অশ্লীলতার দায়ে আদালত তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত হয়েছিল। নিষিদ্ধ হয়েছিল তাঁর লেখা। কিন্তু তাতে থেমে যায়নি তার কলম।
মান্টো ভারত বিভাগের পর তাঁর স্ত্রী সুফিয়া তিন কন্যাসহ লাহোর চলে যান। পরে ১৯৪৮ সালে তিনি মুম্বাই থেকে কাউকে না বলে লাহোর চলে আসেন। ১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মান্টো লাহোরে পরলোক গমন করেন। দীর্ঘ ২১ বছর তিনি সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। এর মধ্যে দশ বছর তাকে অশ্লীলতার অভিযোগে মামলার জন্য আদালতে ঘোরাঘুরি করতে হয় এবং অনেক আর্থিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তবে নীতির প্রশ্নে আপোস করেননি।
মান্টো সম্পর্কে কৃষণ চন্দর লিখেছেন, ‘উর্দু সাহিত্যে অনেক ভালো গল্পকারের জন্ম হয়েছে; কিন্তু মান্টো দ্বিতীয়বার জন্ম নেবে না, আর তার স্থান কেউ পূরণ করতে পারবে না। মান্টোর বিদ্রোহ আধুনিক সভ্যতার পাপের বিরুদ্ধে। তার এই প্রচ্ছন্ন বিদ্রোহের মাঝে আমরা খুঁজে পাই মান্টোর ক্ষোভ, ঘৃণা আর ভালোবাসা।’

অদ্বিত আহমেদ