আউট, নট আউট

fb_img_1477561850821আহসান শামীমঃ ক্রিকেটের মাঠে ব্যাটসম্যানের কবজি ঘুরিয়ে ছক্কা হাঁকানো অথবা বোলারের জাদুমন্ত্রসম আঙুলে-কোনকিছুই বোধ হয় তার হাতের মতো অসীম ক্ষমতাবান নয়। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কার কথা বলছি? ঠিক ধরেছেন আম্পায়ারের কথাই হচ্ছে। সে হাতের মাথায় লাল আলোর অমোঘ নির্দেশের মতো জ্বলে ওঠা তর্জনী, আউট। ব্যাস, আগুনের মতো জ্বলে ওঠা ব্যাটসম্যানের সব কান্ডের ওপর ফুলস্টপ। বোলার অথবা ফিল্ডার কেউ-ই এই ক্ষমতাবান আঙুলের আওতার বাইরে নন। এটাই ক্রিকেটের নিয়ম।
কিন্তু মাঠের এই বিচারকের রায়ও অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সিদ্ধান্তের ভুল আঙুল এক পক্ষকে অনেক সময় পরাজয়ের খাতায় নাম লেখাতে বাধ্য করে। এমন নজির ক্রিকেট ইতিহাসের আলমারি ঘাঁটলে ভুড়ি ভুড়ি পাওয়া যাবে। এখন চলছে বাংলাদেশ ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজ। সিরিজের প্রথম খেলায় আম্পায়ারিং নিয়ে সমালোচনা শোনা যাচ্ছে নানা মহলে। ভিডিও ফুটেজ, খোলোয়াড়দের শরীরী ভাষা, তাদের আচমকা প্রতিক্রিয়া এই সমালোচনাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। আর এই সমালোচনা শুধু বাংলাদেশে নয় বিদেশী গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে। এই আলোচনা সমালোচনা নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ রচনা সাজানো হয়েছে। 4146
‘স্টোকসের চমৎকার বোলিং, তবে বাজে আম্পায়ারিং করেছেন ধর্মসেনা। তার দুটো সিদ্ধান্তই ভুল হয়েছে । শফিউল শট খেলতেই গিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা ভালো ছিল না।’
টুইটারে এমনই একটা টুইট করেছেন ক্রিকেট ম্যাগাজিন ‘দ্য ক্রিকেটার’ এর সম্পাদক সাইমন হিউজ।
চট্টগ্রাম টেস্টে সফরকারী ইংল্যান্ড আর টাইগারদের পক্ষে মোট ২৭ টা রিভিউ হয়েছে। ক্রিকইনফোর মতে, এটি একটি বিশ্ব রেকর্ড। যা আম্পায়ারিংয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্কের পটভূমি তৈরি হয়েছে ।
চট্টগ্রামে সাদা পোশাক আর লাল বলে ইংলিশদের বিপক্ষে টাইগারদের রোমাঞ্চকর লড়াই। জয় পরাজয় ছাপিয়ে আলোচনায় ছিল ডিআরএস সিস্টেম আম্পায়ারদের রায়ের পর রিভিউ নিয়ে সিদ্বান্ত বদলের দৃশ্য।
রিভিউতে সাফল্যের পাওয়া গেছে ১১ টা। কাগজে কলমে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্ত ১১ বার। ধর্মসেনার সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে আটবার। বাকি তিনটা ক্রিস গ্যাফেনির। থার্ড আম্পায়ার রিভিউ দেখেও প্রথম ইনিংসে সাব্বিরের আউট। বলটা স্টোকসের তালুবন্দী হবার আগে মাটি ছুঁয়েছিল তা ছবিতে স্পষ্টই দৃশ্যমান। তখন থার্ড আম্পায়ার ভারতের এস রভির বিতর্কিত সিদ্ধান্তের শিকার সাব্বির। ভারতের এই আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই গেল বছরে তাসকিন, আরাফাত সানির ওপর ঝুলিয়ে দিয়েছিল নিষেধাজ্ঞা । আইসিসি এই ক্ষেত্রে তার বাই লজের তোয়াক্কা করেনি ।খেসারত দিতে হয়েছিল টাইগারদের । আইসিসির আইনে পরিস্কার উল্লেখ করা আছে, ” কোন টুর্ণামেন্ট চলাকালীন সময়ে কোন খেলোয়াড় এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে না” । 1813

চট্টগ্রাম টেস্টে রিভিউর আবেদন ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে আম্পায়ার ভুল সিদ্ধান্তে রিভিউ নেওয়া সম্ভব হয়নি এমন ঘটনার সংখ্যা চার।
পরে রিপ্লেতে দেখা গেছে, অধিনায়কের হাতে রিভিউ থাকলে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হতো।
সামাজিক যোগাযোগে দারুন সমালোচিত বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড প্রথম টেস্টের আম্পায়াররা। টেস্টের শেষ দুই উইকেটেরও নিস্পওি হলো রিভিউ আবেদনে । আইসিসির আইন তোয়াক্কা না করে রিভিউ আবেদনে সাফল্যে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের স্বপ্ন অধরা থেকে গেল ।
পঞ্চম দিনের চতুর্থ ওভারের খেলা চলছিল। বাংলাদেশ আবারও বাজে আম্পায়ারিংয়ের শিকার । ইং
ল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে প্রথম টেস্টের শেষদিনে ম্যাচ যখন চরম নাটকীয়তায় মোড় নেয় তখন শফিউল ইসলামকে বিতর্কিত আউট দেন টিভি আম্পায়ার । এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
উন্নত প্রযুক্তির সময়েও কেনো এমন বিতর্কিত আউট দেয়া? যেখানে প্রযুক্তিগত সুবিধা ব্যবহার করে গোটা দৃশ্যটি বারবার দেখে নেয়া সম্ভব।
এলবিডব্লিউ নিয়ে অনেক রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা হচ্ছে, সামনে আরো হবে। আগের নিয়মে “আম্পায়ার’স কলে” আম্পায়ার আউট না দিলে ব্যাটসম্যানকে আউট করার জন্য বল অন্তত অফ ও লেগ স্টাম্পের মাঝামাঝি কোথাও লাগতে হতো। আর আম্পায়ার আউট দিলে বল যদি স্টাম্প বা বেলের ছোঁয়াও লাগে, তাহলেও সিদ্ধান্তটা কার্যকরী থাকবে। তবে নতুন নিয়মে রিভিউতে একটু পরিবর্তন এসেছে। এখন তিন স্টাম্পের মধ্যে লাগলেই আম্পায়ার আউট না দিলেও থার্ড আম্পায়ার সিদ্ধান্তটা পরিবর্তন করতে পারবেন। তাইজুলের ক্ষেত্রে ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছে।
স্টোকসের তৃতীয় বলে আবারও বল পায়ে লাগে শফিউলের। তবে এবারও পিচের বাইরে পড়ে বল। বলটি অফ স্ট্যাম্পে হালকা স্পর্শ করত। তবে এবারও ধর্মসেনা অনেক চিন্তা-ভাবনা করে শফিউলকে আউট দিলেন।1404793173_1-org
আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী কোনো ক্রিকেটার যদি শুধু পা এগিয়ে দিয়ে বল আটকানোর চেষ্টা করেন এবং ওই বল যদি স্ট্যাম্পের কোথাও লেগে যায় তাহলে সেটা আউট। এক্ষেত্রে শফিউল পায়ের সাথে ব্যাটও এগিয়ে দিয়েছিলেন। তবে ব্যাটটা পরে বলের দিকে যায়।
শফিউল ইসলাম রিভিউ নিলেও কাজ হয়নি। টিভি আম্পায়ার ভারতের রভি ধর্মসেনার সিদ্ধান্তকে সঠিক রায় দিয়ে শফিউলকে আউট ঘোষণা করেন। আর বাংলাদেশকে মেনে নিতে হলো ২২ রানের পরাজয়।
সাকিবের জোরালো আবেদন। সেই আবেদনে আম্পায়ারের আঙ্গুল তুলে সায় দেয়া। মঈন আলী আউট মেনে না নিয়ে রিভিউর আবেদন করলে ফল তার পক্ষেই আসে। এরকম আরো দুই বার সাকিব বনাম মঈন আলী বনাম আম্পায়ার পর্ব চললো মাঠে। প্রতিবারই আম্পায়ার পরাজিত মঈন আলীর কাছে।
এটা ঠিক কথা , চট্টগ্রামের উইকেট কখনো কখনো অস্বাভাবিক আচরণ করে। কিন্তু তাতে এতবার বোকা বনে যাবেন আম্পায়াররা? বিষয়টা ভাববার সুযোগ করে দেয় ।
পঞ্চম দিনে পুরোনো বলে দারুণ রিভার্স সুইং করাচ্ছিলেন ইংল্যান্ডের পেসাররা।
পঞ্চম দিনে ১.৩ ওভার পরই নতুন বল নেওয়ার সুযোগ ছিল ইংল্যান্ডের। কিন্তু কুক পুরোনো বলে পেসারদের দিয়ে বোলিং করাতে থাকেন। চট্টগ্রামে এখন ভিন্ন আলোচনা। গুঞ্জন উঠেছে ‘বল টেম্পারিং’ করেছে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল! অভিযোগটা সরাসরি না করলেও টাইগার দলপতি মুশফিকুর রহিম এমন একটা কিছুরই ইঙ্গিত দিয়েছেন। স্টুয়ার্ট ব্রডের আগুন ঝরা বোলিংয়ের পাশাপাশি বেন স্টোকস লাইন ও লেংথ মেনে বোলিং করে যান। স্টোকস রিভার্স সুইংও দিতে পারছিলেন নিয়মিত। প্রথম ইনিংসেও এ ঘটনা বারবার চোখে পড়েছে।
পুরোনো বলে রিভার্স সুইং করাতে হলে কোনো দল বা বোলারের জন্য ‘বল টেম্পারিং’ জরুরী হয়ে পড়ে। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন শেষ করে বের হওয়ার পথে মুশফিক বলেন, ‘এটা নিয়ে ক্রিকইনফোর লিখলে ভালো হয়।’
মুশফিক বলেন, ‘আমি ব্যাটিংয়ের সময় বল নিয়ে বেশ কয়েকবার আম্পায়ারকে অভিযোগ জানিয়েছি, বারবার বলার চেষ্টা করেছি বলে কোনো সমস্যা আছে কি না। আমার মনে হয়েছে ওরা (ইংল্যান্ড) খেলার সময় বলে কোনো কিছু করেছে। কারণ পুরোনো বল ওদের হাতে চলে যাওয়ার পর নতুনের মতো হয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন পাউডার দিয়ে ঘষে কেউ নতুন করেছে!’ এসব তথ্য পাওয়া গেছে রাইজিং বিডি অনলাইন পোর্টালের সূত্রে।kayes1
ধর্মসেনা নিজে ১৭২ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা আর বোধ থেকেই সিদ্ধান্ত দেন আম্পায়াররা। সন্দেহ নেই, ধর্মসেনা এখানে চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বললে খুব ভুল বলা হবে না আশা করি। দ্বিতীয় টেস্টেও তাঁরই দায়িত্ব পালন করার কথা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত জেতা হয়নি বাংলাদেশের। তবে ২০ উইকেট অবশ্যই বাংলাদেশের প্রাপ্তির খাতায় যোগ হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে টেস্ট খেলতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছে ইংল্যান্ডের মত দলকে। এটাই বা কম কিসের।
বাংলাদেশ বাজে আম্পায়ারিংয়ের শিকার এই প্রথম নয়। এর আগে গেল নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে খেলার সময় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বিপক্ষে যায়। তখন আম্পায়ারের দায়িত্বে ছিলেন ইয়ান গোল্ড এবং আলিমদার।সেই খেলাও ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের পরাজয়ের কারণ আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে।
৩৩ রানের জয়ের লক্ষ্য নিয়ে ৫ম দিনের খেলা শুরু করে বাংলাদেশ। উইকেটে ছিলেন সাব্বির রহমান এবং তাইজুল ইসলাম। দুজনেই ভালোভাবে ইংলিশ পেসার স্টুয়ার্ট ব্রড এবং বেন স্টোকসকে মোকাবেলা করছিলেন।জয়টা হাতছাড়া করতে হয় টাইগারদের বিপক্ষে বাজে আম্পায়ারিং আর আউট নট আউটের দ্বিধার মাঝখানে ।
২৮ অক্টোবর ইংলিশদের বিপক্ষে শেষ টেস্ট ঢাকায় । বাংলাদেশের দলে থাকছেন শুধু একজন পেসার । চট্টগ্রামের টার্নিং উইকেট ঢাকায়ও দেখতে চায় টাইগারদের টিম ম্যানেজমেন্ট।ঢাকার টেস্টেও সম্ভবত আম্পায়ারিং করবেন চট্টগ্রামের আম্পায়াররাই। বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুরাগী মানুষের দৃষ্টি এখন ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়ামের দিকে।