এযাবৎ মানুষ প্রকৃতি থেকেই প্রাথমিক পাঠগুলো নিয়েছে

রুখসানা আকতার

রুখসানা আকতার

(ইংল্যান্ড থেকে) আমার কিছু নিজস্ব ভালো লাগা আছে । তার মধ্যে একটা হচ্ছে উদ্দেশ্য বিহীন হাটাহাটি । যেমন কখনো খুব মন খারাপ থাকলে আমি খুব নির্জন রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকি আর ভাবতে থাকি । আবার কখনো নির্ভার মন নিয়ে পার্কের সবুজ ঘাসের মাঝে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখি ।অনেক সময় নীলাকাশে ভেসে ভেড়ানো সাদা মেঘের উড়ানের সঙ্গে আমার মনটাও উড়ে যায় কখনওবা গাঙ ফড়িঙের পিছনে ছুটতে থাকা  দুরন্ত শৈশবে । কখনওবা বানিয়াচং এ চাঁদনী রাতে লতিফাবু এর কোল ঘেঁষে শুয়ে পাতাল দেশের রাজকন্যা আর পঙ্কিরাজ  ঘোড়ায় চড়া রাজকুমারের গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ার সময়ে অথবা নানী বাড়ির পুকুর ঘাটে লতিফাবু ,করুনাবু ,মেমরাজ মুই ,মোন্নরা মুই এদের  ষোড়শী বেলার স্নান পর্বের আনন্দ মুখর মধ্যাহ্ন আমাকে পেয়ে বসে । সব যেন চোখের সামনে ভাসতে থাকে।

আমার আগের বাসাটার ঠিক পাশে একটা মিনি ফরেস্টের মতো সিমেট্রি ছিল । প্রায় ই  ইচ্ছে করে এর পাশ দিয়ে  হেঁটে  ভিতরের উঁচু উঁচু গাছ গুলো দেখতে দেখতে ঘরে ফিরতাম । কখনো কখনো সিমেট্রির ভেতরে পাতা বেঞ্চে বসে পাখির ডাক শুনতাম আর নিজেকে নিয়ে ভাবতাম । বলতে গেলে নিজেকে নিজে জানার চেষ্টা করতাম। নিজস্ব ভুল ক্রটিগুলো কাঁটাছেড়া করে দেখতাম । অনেক সময় ফেলে আসা জীবনের নিষ্ঠুর কাহন মনে করে হৃদয় ভারাক্রান্ত হতো । আর সেই ভারাক্রান্ত হৃদয়ের মেঘ বৃষ্টি হয়ে আমার চোখের সরসী জলে ভরে আসতো।pb_b_nov-1-2

আমার এই উদ্যেশ্য বিহীন ঘুরাঘুরি শৈশবে শুরু হয়েছিল। হবিগঞ্জ এবং বানিয়াচং এর সবুজ গাছ গাছালি, বিস্তীর্ন ধান সরিষার খেত , নদী , খাল বিল ,পাহাড় সব কিছু আমার মনের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে ,যা আমাকে বার বার টেনে নিয়ে যায় আমার শৈশবে। অনেকে যখন শুনেছে যে আমি সিমেট্রিতে গিয়ে বসি বা হাটাহাটি করি ,জিজ্ঞেস করেছে ভয় করে কিনা। কবরস্তান নিয়ে ভয়টা আমার ছোট বেলাতে ই চলে গিয়েছিল। আমাদের হবিগঞ্জের স্টাফকোয়াটারের  সীমানার বাইরে দক্ষিণ পূর্ব কোনে একটা ছোট গ্রাম ছিল সেই গ্রাম আর ইনতাবাজ গ্রামের বিস্তীর্ণ একটা এলাকা জুড়ে ডোল কলমি গাছ দিয়ে ঘেরা একটা বিশাল কবরস্থান ছিল । সেখানে দিনের বেলায় গরু ছাগল চড়ে বেড়াতো । ছুটির দিনগুলোতে আমরা সমবয়সী বাঁদর গুলো দল বেঁধে সে কবরস্থানে চলে যেতাম । সেখানে গিয়ে আরো কয়টা নতুন কবর হয়েছে গুনতাম । কখনো গর্ত হয়ে যাওয়া কবরে উঁকি দিয়ে ভিতরে আগুন দেখার চেষ্টা করতাম । না আগুন দেখিনি তবে ভিতরে মানুষের হার গুড় দেখতে পেতাম । একজন দেখলে ডেকে বাকিদের দেখতাম। কখনো হাঁটতে হাঁটতে ইনতাবাজ গ্রামের পাশ দিয়ে সাদা কাশবন পেরিয়ে  খেতের আইল ধরে হেঁটে  , সুপারি বাগান পেরিয়ে মাছুলীয়া গ্রামে মহররমের পুতি শুনতে চলে যেতাম।শুনতে শুনতে চোখে পানি চলে আসতে । নিষ্ঠুর সীমার কিভাবে মানুষ হয়েও এত হৃদয়হীন ছিল।আর ইমাম হোসেনের কষ্টের কথা ভেবে আমাদের কান্না চলে আসতো। আবার ফিরতি পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সীমার কে পেলে কে কিভাবে শাস্তি দিতাম সেই আলোচনা করতে করতে ঘরে ফিরতাম । কোনোদিন কোনো বিপদে পড়িনি । বরং মাঝে মাঝে গ্রামের লোকজন ডেকে বাসা কোথায় জিজ্ঞেস করতেন । পানি খাওয়াতেন। পথ হারিয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করতেন অথবা তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে যেতে বলতেন না হলে মা যে চিন্তা করবেন সেটা মনে করিয়ে দিতেন। কত নিরাপদ ছিল আমাদের শৈশব । আর এখন একটা পাঁচ ছয় বছরের বাচ্চাও আমাদের দেশে নিরাপদ না । কোনো না কোনো ভাবে মানুষ নামের জানোয়ারদের পৈশাচিক লালসার শিকার হবে।

আমরা নষ্ট হয়ে গেছি । আমাদের ভিতরের মনুষত্ব হারিয়ে গেছে । এখন আমরা দাঁড়িয়ে মানুষ কোপানো দেখি । সেই কোপানো মোবাইলে ধারণ করি । ভুলে যাই অন্তত পাঁচটা মানুষ ক্রমাগত ডিল ছুড়ে মেরে ও ওই জানোয়ারটাকে থামানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। এখন আমরাই আমাদের বাচ্চাদের শৈশব কেড়ে নিয়েছি ।আমরা, আমাদের সমাজ আর রাষ্ট্র ওদের উপযুক্ত নিরাপত্তা দিতে পারিনা ।তাই ওরা এখন প্লে স্টেশন ,গেইম এর মাল্টি চ্যানেল নির্ভর। ওরা প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে পারেনা ।ওরা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির রূপের ভিন্নতা ,বৈচিত্রতা , বিশালতা দেখতে এবং অনুভব করতে পারেনা। তাই ওদের চিন্তা ভাবনায় ও সীমিত হয়ে পড়ে । নিজের জন্মস্থান , নিজের আশপাশের প্রকৃতি পরিবেশ যদি অজানাই রয়ে যায় তাহলে চিন্তার প্রসার ঘটবে কিভাবে।

যুগে যুগে মানুষ প্রকৃতি থেকে ই প্রাথমিক পাঠ গুলো নিয়েছে । প্রকৃতি একটা সিস্টেম এর মধ্যে দিয়ে চলে । প্রকৃতির মধ্যেও জোটবদ্ধতা আছে ,একাত্মতা আছে । ডিসকভারি চ্যানেল এর ডকুমেন্টারি গুলো দেখলে আরো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। মানুষের চিন্তার জগৎ সীমিত হয়ে গেলে মানুষ বোর হয়ে যায় ফলে একধরণের ফ্রাস্টেশনে ভোগে ।চিন্তার প্রসার না ঘটলে নিজেকে আর বেশি দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না । উদ্দেশ্যে বিহীন চিন্তা ভাবনায় তলিয়ে যায় ।উল্টা পাল্টা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে । যা পরবর্তীতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে।

বাচ্চাদের নিরাপদ  ভয়হীন পরিবেশ দিতে হবে । ওদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। প্রকৃতির বিশালতা মানুষকে উদারতা শেখায়।’আমার সোনার বাংলা , আমি তোমায় ভালোবাসি’। শুধু জাতীয় সংগীত গাওয়ালে ই হবে না ।সোনার বাংলাকে চেনার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে । একে শ্রদ্ধা করতে শেখাতে হবে ।এর প্রাকৃতিক পরিবেশকে কিভাবে রক্ষা করা করতে হয় শিখাতে হবে । ব্যক্তি স্বার্থে পাহাড় বা বন কেটে  এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় সুন্দরবন ধ্বংস করে , শুধু বইপুস্তক এ গ্লোবাল ওয়ার্মিং পাঠদান করে ,মুখস্ত করিয়ে কিছু শেখানো যাবে না । দেশকে ভালোবাসলে ,এর প্রকৃতিকে ভালোবাসলে সেই ভালোবাসা মানুষের প্রতি সংক্রমিত হবে ফলে কেউ দেশের ক্ষতি করতে কোনো নাশকতায় জড়ানোর আগে দেশের কথা ভাববে মানুষের কথা ভাববে।