এই শহর কেড়ে নিয়েছে অল্পই,দিয়েছে অনেক কিছু

রিয়াদুল হক

রিয়াদুল হক

তিলোত্তমা এই ঢাকা নগরী  সবার আগ্রহের জায়গা। ঢাকায় যেন কি আছে।  এই ঢাকায়ই হয়তো কারো জন্যে লুকিয়ে আছে অপার সম্ভাবনা, আবার কারো জন্যে শুধু  মরিচিকা, যাকে ছুতে গেলেই হাওয়া।প্রতিদিন লাখো মানুষের ভিড় হয় এই শহরে। কেউ কেউ বলে ঢাকা শহরে নাকি টাকা উড়ে বেড়ায়। কেউবা গান বাধে “ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে”।ট্রেন ট্যাক্সি বাস সব গুলো বাহনের পেটগুলো  বোঝাই হরেকরকম মানুষের স্বপ্ন দিয়ে। এই শহর সহজে ঘুমায় না। জেগে থাকে রুগ্ন কোন অভুক্ত শিশুর চোখে, শীতে কম্পনরত কোন বৃদ্ধার ঝুলিতে, পার্কে টহল রত পুলিশেরচোখে। যাদের ছুটি নেই ,অবিরাম লাঠি নিয়ে দাড়িয়ে থাকে যেকোনো উৎসবে, সম্মেলনে। এই শহরে কোথাও আজ কোন আন্তরিকতার ছোঁয়া অবশিষ্ট নেই।এই ব্যস্ততার নগরীতে কিছু মানুষকে একেবারে দর্শক হিসেবে পাওয়া যায়।দিনে দিনে বাড়ছে এই নগরীর মাhatirjheel1নুষ কিন্তু সংকুচিত হচ্ছে মানুষের হৃদয়। আজকাল ব্যস্ততার যুগে দুবেলা মেহমানদারীতে ও হাঁপিয়ে উঠছে নগরীর মানুষেরা। আতিথেয়তাকে উটকো ঝামেলা মনে করছে। আমি এই নগরীর এক বাসিন্দা প্রতিদিন ভোরে অফিসের উদ্দেশ্য বের হয়ে অনেক চমকিত হই। নারী পুরুষ সমান তালে বাসে নিজের অবস্থান দৃঢ় করে পৌঁছে যাচ্ছে গন্তব্যে। রিক্সা দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকেই খেয়াল করবেন কোন বহুতল ভবনের নিচে কন্সট্রাকশন সাইটে কিছু লোক দাড়িয়ে মেশিনে ইট বালু মিক্সিং দেখছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওভাবেই তাকিয়ে আছে । কি যেন বোঝার চেষ্টা তাদের। দুপুর গড়ালেই কিছু খেয়ে এসে আবার দাঁড়ায়।হয়তো কোন মহিলার ব্যাগ টান দিয়ে দৌড় দিয়েছে একদল ছিনতাইকারী আর নিরুপায় মহিলা দাঁড়িয়ে নিরবে কাঁদছে কারন সে বের হয়েছিলো আজমির যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। তার ছেলে সেই ঘটনা পুলিশকে জানাতে একবার কলাবাগান থানা একবার ধানমণ্ডি থানা যাচ্ছে।দুই থানা থেকেই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন এই এলাকা আমাদের অন্তর্গত নয়। আছে এবং নাই করতে করতে ছিনতাইকারী পগাঢ় পাড়। সেটাও একদল দাড়িয়ে দেখছে।ভোরবেলা মেয়েকে স্কুলে দিতে রাস্তায় বের হয়ে ছিনতাইয়ের কবলে পড়া পুরনো খবর।dhaka_jahajbari7

কোন গাড়িওয়ালা রিক্সা ওয়ালাকে বেদম পেটাচ্ছে গাড়িতে দাগ ফেলে দেয়ার জন্যে তাও দেখছে মানুষ ।সিগন্যালে বাস থামিয়ে রাখার জন্যে চলছে ইচ্ছেমত গালিগালাজ ড্রাইভারকে ।ড্রাইভারও এক চোট নিয়ে নিচ্ছে। এই সব কিছু কে সঙ্গী করে একবার অফিসের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে আসতেই দেখি আমার সামনের গাড়ি গুলো বেঁকে বেঁকে যাচ্ছে। খানিকটা অবাক হয়ে খেয়াল করলে দেখি একজন ৭০-৭২ বছর বয়সের বৃদ্ধ রাস্তায় পড়ে আছেন আর কাঁটা মাছের মতো লাফাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে আমি আমার সি এন জি থেকে নেমে গেলাম। দেখলাম প্রায় ৫০ জনের একটা দল রাস্তার এপারে এই দৃশ্য দেখছে। এগিয়ে গিয়ে কেউ ধরছে না বৃদ্ধ কে। নিজের উপর অনেক রাগ হলো। তাদের খানিকটা ভৎসনা করে সেই বৃদ্ধের কাছে গেলাম। আমার সি এন জি ড্রাইভারও এগিয়ে গেল আমার সঙ্গে। লোকটার পা দু টুকরো হয়ে গেছে ভিতর দিয়ে, শুধু চামড়ার প্রলেপটা আছে উপর দিয়ে। কোনভাবে লোকটাকে কোলে নিয়ে কাছাকাছি হাঁসপাতাল খুঁজতে থাকি। মহাখালির কাছে এক হাসপাতালে নিয়ে যাই। কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রথমে  বাঁধ সাধেন চিকিৎসা দিতে। আমাকে অনেক ধরনের প্রশ্ন করেন যার অর্থ হয়তো এরকম যে আমিই মনে হয় বৃদ্ধকে রান ওভার করেছি। অনেক কথোপকথনের তিনি রাজি হন। লোকটার খরচ কে নির্বাহ করবে ডক্টর আমাকে জিজ্ঞেস করে। আমি লোকটার trafficalertপ্যান্টের পকেটে রাখা মোবাইল থেকে লাস্ট ডায়াল নম্বরে ফোন দেই। নম্বরটা ছিল সেই বৃদ্ধের মেয়ের। তারা ফোনে জানায় যে সব খরচ তারা বহন করবে। আমার জন্যে এই শহরে এরকম অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম তাই খানিকটা ভয় পাচ্ছিলাম। এরকম মুহূর্তে চিকিৎসারত ডাক্তার আমাকে বললেন, এরকম ব্যস্ত নগরীতে আমার মতো মানুষ নাকি অনেক কম, শুনে খুশি হলাম, মুহূর্তেই আবার ভয় পেলাম ডক্টর সাহেবের আরেকটা কথায়, তিনি বললেন, রুগি যদি আপনার কোলে মারা যেত তখন আপনি কি করতেন? মৃত কোন শরীর কোন হাসপাতাল গ্রহন করেনা। এই লাশ নিয়ে আপনাকে জায়গায় জায়গায় ঘুরতে হতো। অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো।বললেন এই শহরে কোন আইন নেই। শুনেই আমি বেশ প্রকম্পিত হলাম। খানিক সময় পড়ে দেখলাম একটা কালো গাড়ি থেকে স্যুট পড়া  একজন সুদর্শন ভদ্রলোক নামলেন। এসেই আমার সঙ্গে হ্যান্ড সেইক করলেন।বললেন, ওয়েল ডান বয়, ইউ হ্যাভ ডান অ্যা গ্রেট জব। ভদ্রলোক হেসে এগিয়ে গেলেন চিকিৎসকের কাছে। মোবাইলে কিছু ছবি দেখালেন। যেখানে দেখা যাচ্ছে কিভাবে আমি দুর্ঘটনার জায়গা থেকে বৃদ্ধটিকে উদ্ধার করছি।ডাক্তার সাহেব এতক্ষনে স্বাভাবিক হলেন। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম, এই ভেবে যে যাক একজন তো এসেছে আমাকে ব্যাক আপ দিতে। বৃদ্ধের স্ত্রী আসলেন আমাকে বুকে নিয়ে অনেক দোয়া করলেন, বললেন যতদিন উনি বেঁচে থাকবেন নামাজে বসে আমার জন্যে আল্লাহ্‌র কাছে আমার জন্যে দোয়া চাইবেন।গাড়ি দিয়ে সেই ভদ্রলোক আমাকে নামিয়ে দিলেন বললেন, ভয় পাবেনা, ভাল কাজ করলে এই শহরে আমার মতো আল্লাহ কাউকে না কাউকে মিলিয়ে দিবেন যিনি তোমার সাহায্যে এগিয়ে আসবেন।dhaka_skyline1

এই শহরের বুকে লুকিয়ে আছে আমার জীবনের প্রথম ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা। যা মনে করে অনেকসময় নস্টালজিক হয়ে পড়ি। খারাপ কিছু ঘটে গেলেও নিজের শহর নিজেরই থাকে ভালোবাসি ঢাকায় থাকতে।