ইস্পাতঃ মানুষের ইস্পাত হয়ে ওঠার কাহিনি

14484950_683161831849740_2536742395159066605_nশফি আহমেদঃ প্রিয় বই ইস্পাত পড়েছিলাম ১৯৭৪ সালে এস এস সি পরীক্ষা দেবার পর।তখন থেকেই নিকোলাই আস্ত্রভস্কি নামটি মনে গেঁথে আছে। জীবনকে বদলে দেয়ার মতো বই।তার নায়ক পাভেল করচাগিন। লেখক অস্ত্রভস্কির জীবনকাল ১৯৯০৪-১৯৩৬।
সংক্ষিপ্ত হলেও এই মানুষটির পুরো জীবনটাই এক মহানকীর্তি গাথা। বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩২ বছর। পৃথিবীর জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে রেখে গেছেন বর্নাঢ্য সংগ্রামী জীবন, জীবনদর্শন, আর একটি সম্পূর্ন উপন্যাস ইস্পাত (How The Steel Was Tempered)। সারা পৃথিবীব্যাপী সাড়া জাগানো এ উপন্যাসের লক্ষ লক্ষ কপি মুদ্রিত হয়েছে, বিভিন্ন ভাষায়।
তৎকালীন রুশ দেশে ভলেনিয়ার ভিলিয়া গ্রামে ভীষন দারিদ্র্যের মাঝে বেড়ে উঠা ছোট্ট নিকোলাইকে স্কুল ছাড়তে হয় নয় বছর বয়সে। নেমে পড়েন কঠিন জীবন সংগ্রামে। প্রথমে কাজ নেন রেলওয়ে রেস্তোরায়। সেখানে তাকে কাজ করতে হতো !০ থেকে ১২ ঘন্টা। ভারি ভারি সামোভার(রাশিয়ায় ব্যবহৃত বিশেষ ধরণের চুলা) সরু আঁকাবাঁকা সিড়ি বেয়ে উঠানামা করতে হতো। চুল্লিতে জ্বালানীর যোগান দিতে হতো। বিনিময়ে মাস শেষে জুটতো ১০ রুবল।

নিকোলাই আস্ত্রভস্কি

নিকোলাই আস্ত্রভস্কি

প্রচণ্ড মার খেয়ে একদিন এই চাকরী থেকে বিতাড়িত হতে হয় নিকোলাইকে। এরপর তিনি কাজ নেন বিদ্যুৎ স্টেশনে। ১৯১৪ , মানবতার ইতিহাসের এক অন্ধকার সময়। শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ততদিনে নিকোলাইয়ের জানা হয়ে গেছে সংগ্রাম আর দারিদ্র্যের অর্থ। ১৩/১৪ বছর বয়সে যোগ দিলেন বলশেভিক পার্টিতে একজন কর্মী হিসেবে। এরপর যুদ্ধের ময়দানে, যখন তাঁর বয়স ১৫।
জন্মের পর থেকে যুদ্ধ করছেন ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর শ্রমের সাথে। অপুষ্টির শরীর এত ধকল সইতে পারলো না, মেরুদন্ড ক্ষয় হয়ে গেলো। কিছুটা সুস্থ হয়ে আবার ফিরে গেলেন যুদ্ধের ময়দানে। মৃত্যু যেন পেছন ছাড়তে চায় না। আবারও মারাত্মক ভাবে আহত হলেন নিকোলাই। এবার গুলি লেগে মাথার খুলি ফেটে গেলো, আর একটা চোখ প্রচন্ড ভাবে যখম হলো। যেসব রোগীদের নিয়ে আর কোন আশা নেই, তাকে রাখা হয়েছিল সেই ওয়ার্ডে। কিভাবে বেঁচে গেলেন তা এক রহস্য! হয়তো তাঁর অসম্ভব জোরালো জীবনীশক্তি তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এভাবে কাজ করে গেলেন আরও দু’বছর।
১৯২৫ সালে পুরোপুরি শয্যাশয়ী হয়ে পড়লেন। এখানেই শেষ নয় এর ক’বছর পর দৃষ্টি শক্তিও পুরোপুরি হারিয়ে ফেললেন। জীবনের শেষ আট বছর তাকে অন্ধ হয়েই বাঁচতে হয়।
নিকোলাই বলতেন,“শয্যাশয়ী হলেও আমি অসুস্থ নই। ওসব ভুল। এক গাদা বাজে কথা। আমি একদম সুস্থ। আমার পা চলে না, দেখতে পাইনে ছাই কিছুই- সবই একটা নিদারুন ভুল…”
অন্ধত্ব, পঙ্গুত্ব সংগ্রামী এই মহামানবকে দমাতে পারেনি। লিখতে শুরু করলেন জীবন সংগ্রামের ইতিহাস ইস্পাত( How The Steel Was Tempered) অনেকাংশেই তাঁর আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ।
অসাড় আঙুল সাড়া দিতে চায় না। পেন্সিল চেপে ধরে অতিকষ্টে একটা একটা করে অক্ষর ফুটিয়ে তুলতেন, কিন্তু আগের লাইন পরের লাইন একসাথে হয়ে যেত দৃষ্টিহীনতার কারণে।
এরপর তাকে একটা খাঁজকাটা বোর্ড বানিয়ে দেয়া হয়। ফালি ফালি, লাইনের পর ফাঁকা জায়গা রেখে একটা করে ফাতলি। এর মাঝে কাগজ ঢুকিয়ে দেয়া হতো।
“এই বইয়ের কাজই হয়ে উঠেছে আমার সমগ্র জীবন; …কাজ ধরেছি রাতের শিফটে, ভোরে ঘুমিয়ে পড়ি। রাত্রে সব খুব শান্ত, কোথাও টুঁ – শব্দটি নেই। আমার সামনে ঘটনার পর ঘটনা উঠে আসে, যেন ফিল্মের মতো, মনশ্চক্ষে আবার ফুটে ওঠে কত যে ছবি আর গোটা দৃশ্য…”
এই বই তাঁর সংগ্রামময় বর্নাঢ্য জীবনের প্রতিচ্ছবি।
আরও একটি বইয়ের কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি। ১৯৩৬ সালে এই মহান লেখক পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। আসলেই কি তিনি বিদায় নিয়েছেন? রেখে গেছেন স্বপ্ন, জীবন, ইতিহাস আর মানুষের ইস্পাত হয়ে ওঠার কাহিনি।

লেখকঃ  রাজনীতিবিদ ও সাবেক ছাত্রনেতা