যানজট এবং ব্রেইন জট

istiak

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

ঢাকা শহরের যানজট এখন বিশ্বব্যাপীই পরিচিত বলা যায়। দেশের বাইরে আমার যারা বন্ধু বান্ধব আছে, ঢাকার প্রসংগ এলেই তারা কমন একটা প্রশ্ন করে, তোমাদের ঢাকার যানজট কি একটু কমেছে? আমি গর্বভরে উত্তর দেই, ‘না, একটুও কমেনি বরং বেড়েছে।গোটা বাংলাদেশটাই বাড়ছে সব দিক থেকে, যানজট কমবে কোন দুখে? যানজট বাড়তে বাড়তে এখন ঢাকার বাইরে মানে গাজীপুর, সাভার এসব এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এখন কথা হচ্ছে এত যানজট কেন? এর উত্তর আমার আগেই অনেক বড় বড় বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন, রাস্তা দিয়ে যারা রেগুলার চলাচল করেন তারাও জানেন। আমি আর নতুন করে তাদের মাথার যন্ত্রণা না বাড়াই। বরং খুশীর খবর এই যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার এখন ৬% এর উপরে, যা এই মুহূর্তে পৃথিবীর খুব কম দেশেরই আছে। তো এর সঙ্গে যানজটের কি সম্পর্ক? আছে, খুব ভালোভাবেই আছে। চিন্তা করে দেখলাম, এত যানজট আসলে অভিশাপ না, বরং আশীর্বাদ! কত লোকের কর্মসংস্থান হয় এতে একবার ভেবে দেখুন। নানা প্রজাতির ভিক্ষুক, সাহায্যপ্রার্থী, নানা রকমের খাবার বিক্রেতা, হকার, পত্রিকাওয়ালা, এরকম আরো কত লোক! জ্ঞানী লোকেরা বলেন রাস্তার দুপাশ থেকে ভ্রাম্যমাণ দোকান উঠিয়ে দিলে যানজট কমবে। হ্যা ঠিক আছে, কিন্তু কি দরকার যানজট কমানোর? এই অস্থায়ী বাজারের কারনে কত ব্যবসা বাণিজ্য হচ্ছে সেটা একবার চিন্তা করবেন না? বলা হয়, ফুটপাথ থেকে হকার উঠিয়ে দিলে জনসাধারণ ভালোভাবে হাঁটতে পারবে। কি দরকার মানুষের ভালোভাবে হাঁটার? উল্টো এই ফুটপাথে হকার আছে বলেই তো এডিডাস, নাইকি এসব নামী দামী ব্র্যান্ডের ক্যাপ পরে আমার টাক মাথাটা ঢাকতে পারি। এই সেদিনও Calvin Klein এর আন্ডারওয়্যার কিনলাম। কিন্তু ভূড়ির কারনে আমার জিন্সের প্যান্ট নিচেও নামেনা, আমিও কাউকে অত দামী ব্র্যান্ডের আন্ডারওয়্যারের নামটা দেখাতে পারিনা। কিন্তু মনের শান্তি তো পাই। আরো যেমন মনের শান্তি পাই রাস্তার পাশে ডাবওয়ালার কাছে থেকে ডাব খেয়ে জমিদারের মত সেটা রাস্dhaka_zeam-3তায় ছুড়ে ফেলে। তো রাস্তার পাশে এইসব হাবিজাবি দোকান না থাকলে কি এই শান্তি পেতাম নাকি? শুধু শুধু আপনারা যানজটের কথা ভেবে মাথা গরম করেন। কি হবে এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে? ভুলে গেছেন বাংগালীর ঐতিহ্য সেই আড্ডার কথা? যানজটে আটকা পড়ে আছেন ঘন্টার পর ঘন্টা, শুধু শুধু সরকারের গুষ্ঠী উদ্ধার না করে সবাই মিলে আড্ডা দিন। চা, বাদাম, চানাচুর, ঝালমুড়ি সবই তো আছে আশেপাশে। আর কি চাই বলুন? দরকার হয় ব্যাগে একটা এক্সট্রা চাদর রাখুন, যখনই মনে হবে গাড়ী আগামী কয়েক ঘন্টা সামনে এগুবেনা ব্যাস, চাদরটা রাস্তায় বিছিয়ে তাস খেলা শুরু করতে পারেন। সকালে অফিস যাওয়ার সময় আর বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় এই যে জীবন থেকে এতগুলো ঘন্টা নষ্ট হয়, এই সময়টাকে নষ্ট করা যাবেনা। তাছাড়া জীবনে উন্নতি লাভ করতে হলে সবার আগে নিজেকে উন্নত করতে হবে। এই যানজটের কল্যাণে সেটাও সবার মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে প্রচন্ড গরমে লোকাল বাসের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে, পাশের লোকের বগলের তলা থেকে বিশ্রী রকমের ঘামের গন্ধ পেতাম। এখন মানুষের রুচি উন্নত হচ্ছে, তারা নানা রকমের বডি স্প্রে, আতর, পারফিউম এসব ব্যবহার করে। ফলে, আগে যেখানে ঘামের গন্ধে মুখ ফিরিয়ে নিতাম, এখন ঘাম আর উগ্র পারফিউমের গন্ধ মিলেমিশে এমন অবস্থা হয় যে নাকে গেলেই গন্ধ নামক অনুভূতিটাই হারিয়ে যায়। ব্যস, বাকী রাস্তাটা নিশ্চিন্ত! গাড়ি ডাস্টবিনের সামনে দাঁড়ানো নাকি গোলাপ বাগানের সামনে সেটা নিয়ে না ভাবলেও চলে। অবশ্য কোন কিছু নিয়ে না ভাবলেও তো চলে। এত যানজট কেন, কিভাবে এবং আর কতদিন এই ভোগান্তি আমাদের কপালে আছে এসব নিয়েও ভেবে কোন লাভ নেই। গাড়ীর পাশাপাশি আমাদের ব্রেইনেও জট পাকিয়ে আছে মনে হয়। আপাতত গান শুনতে থাকি, গাড়ি চলেনা…. চলেনা, চলেনা রে…. গাড়ী চলেনা!