অন্য এক উর্বর আগুনের নাম ঋত্বিক ঘটক

তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমৃত্যু আমার জীবনে কম্প্রোমাইজ করা সম্ভব নয়। সম্ভব হলে তা অনেক আগেই করতাম এবং ভালো ছেলের মতো বেশ গুছিয়ে বসতাম কেতা নিয়ে। কিন্তু তা হয়ে উঠলো না, সম্ভবত হবেও না। তাতে বাঁচতে হয় বাঁচব, না হলে বাঁচব না। তবে এই ভাবে শিল্পকে কোলবালিশ করে বাঁচতে চাই না।’

এই মানুষটি আর কেউ নন, তিনি ঋত্বিককুমার ঘটক। চলচ্চিত্র পরিচালক, বাংলা সিনেমার এক তীব্র প্রাণপুরুষ। আজ এই অসাধারণ মাপের এই মানুষটির জন্মদিনে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। ঋত্বিক ঘটক ১৯২৫ সালের এই দিনে ঢাকার জিন্দাবাজারে জন্মগ্রহণ করেন।বাবার নাম সুরেশচন্দ্র ঘটক, মা ইন্দুবালা দেবী।

ঋত্বিক ঘটক একবার অনেক রাতে কলকাতার ফুটপাতে হাঁটছিলেন। যথারীতি মদের নেসশায় মাতাল। হেঁটে বাড়িতে ফেরার অবস্থা ছিল না তাই ট্যাক্সি। ট্যাক্সির চালক তাকে গন্তব্যে নামিয়ে ভাড়া চাইতেই বলেছিলেন, আমার কাছে টাকা নেই, তুমি এক কাজ করো…সোজা চলে যাও ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডে। সেখানে গিয়ে দেখবে একটা ঢ্যাঙা লোক দরজা খুলবে। ওকে বলবে ঋত্বিক ঘটক ট্যাক্সি করে ফিরেছে, সঙ্গে টাকা নেই। ও টাকা দিয়ে দেবে।

এই ঢ্যাঙ্গা লোকটি আর কেউ নন বাঙলা সিনেমার আরেক প্রবাদ পুরুষ সত্যজিৎ রায়।সেদিন এবং তার পর আরও বহুদিন ঋত্বিক ঘটকের এসব দাবি পূরণ করতেন অম্লান বদনে। ঋত্বিক ঘটকও তার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, ভারতবর্ষে সবথেকে ঠিকঠাক ক্যামেরা বসাতে জানে ওই ঢ্যাঙ্গা লোকটাই। আর হ্যাঁ, আমি খানিকটা জানি।

ঋত্বিক ঘটক তৈরী করেছিলেন মোট আটটি সিনেমা। প্রথম ছবি ‘নাগরিক’। সিনেমা কেন করেন এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের জন্য ছবি করি। মানুষ ছাড়া আর কিছু নেই। সর্বশিল্পের শেষ কথা হচ্ছে মানুষ। আমি আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় সেই মানুষকেই তুলে ধরার চেষ্টা করি।’

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) এবং সুবর্ণরেখা (১৯৬২) অন্যতম; এই তি1423318508নটি চলচ্চিত্রকে ট্রিলজি বা ত্রয়ী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, যার মাধ্যমে কলকাতার তৎকালীন অবস্থা এবং উদ্বাস্তু জীবনের রুঢ় বাস্তবতা চিত্রিত হয়েছে। সমালোচনা এবং বিশেষ করে কোমল গান্ধার এবং সুবর্ণরেখা’র ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে এই দশকে আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাণ তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।সুবর্ণরেখা চলচ্চিত্র নির্মাণের পর প্রায় এক যুগ বিরতি নিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম শীর্ষক উপন্যাসের কাহিনীকে উপজীব্য করে ঋত্বিক ঘটক ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে আগমন করে তিতাস একটি নদীর নাম শিরোনামে চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। মাঝখানে কোন পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র তৈরী করেননি তিনি। এ চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহের কারণ হিসেবে তিনি বলেন,

দু আঙুলের ফাঁকে জ্বলছে পাতার বিড়ি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কাঁধে একটা বিবর্ণ ঝোলা। গালে না-কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পরনের কাপড় ধূলি ধুসর। কিন্তু চোখে জ্বলছে আগুনের আশ্চর্য দিপ্তী। এই হচ্ছে ঋত্বিক কুমার ঘটকের ছায়া অথবা কায়ার বিবরণ।

শিল্প চর্চার শুরুটা হয়েছিল সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে। তখন দেশভাগের আগুন জ্বলে উঠেছে। কলকাতায় সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন থিওেয়টার আন্দোলনের সঙ্গে। জড়িয়ে পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। মঞ্চে অসংখ্য নাটকের রচয়িতা তিনি সেইসময়। অভিনয়ও করেছেন। তার লেখা প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’। প্রথম অভিনয় করেন ১৯৪৪ সালে বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবাবন্ন’ নাটকে।

সিনেমারে ব্যাপারে তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন নাটকের সমসাময়িক কাল থেকেই। তিনি সিনেমাকে কখনোই কেবলমাত্র বিনোদনের উৎসে পরিণত করতে চাননি। চলচ্চিত্র তাঁর কাছে ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার। ১৯৫২ সালে তার তৈরী প্রথম সিনেমা ‘নাগরিক’।

তাঁর দ্বিতীয় ছবি ‘অযান্ত্রিক’ মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে। তার আগেই অবশ্য তিনিমেুম্বাইয়ের ফিল্মিস্তান স্টুডিওতে কাজ শুরু করেন। একই বছর তিনি সির্মাণ করেন ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’। পরের বছর ‘মেঘে ঢাকা তারা। এরপর ১৯৬১ ও ১৯৬৫ সালে তাঁর দুটি সিনেমা ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’  মুক্তি পায়।

কোমল গান্ধার ছবিটি বাণিজ্যিক ভাবে অসফল হওয়াটা ছিল তাঁর কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার মতো। এমনিতেই জীবনে সীমাহীন দারিদ্র, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে গভীর বিশ্বাস আর সমাজের প্রচলিত ধারার কাছে মাথা নত না-করা ঋত্বিক ঘটকের জীবনকে একেবারে খাদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল। তখনই তিনি খেতে শুরু করলেন বাংলা মদ। এই মদ তাকে শারীরীক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল।

১৯৬৪ সালে তিনি পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউটে ভিচিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু সেখানেও তিনি বেশীদিন কাজ করতে পারেননি তার খ্যাপামির জন্য। তারপর আসে ১৯৬৯ সাল। তাঁর শারীরীক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। তাকে ভর্তি করা হয় মানসিক হাসপাতালে।

ছবি তৈরীর কাছে আবার তিনি ফিরে আসেন ১৯৭১ সালে। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস থেকে তৈরী করেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। তারপর ১৯৭৪ সালে শেষ ছবি ‘যুক্ত তক্কো আর গপ্পো’।

তিতাস একটি নদীর নাম ছবির শ্যুটিয়য়ের সময় তিনি যক্ষায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই রোগের সঙ্গে যুক্ত হয় অতিরিরিক্ত মদ্যপান। জীবনী শক্তি ফুরিয়ে আসে এই মাহান শিল্পীর। ১৯৭৬ সালের ৬ ফ্রেব্রুয়ারী তিনি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

প্রাণের বাংলা প্রতিবেদক