সময় এসেছে মানব ধর্মে দীক্ষা নেয়ার…

সাবরীনা শারমীন বাঁধন

সাবরীনা শারমীন বাঁধন

একটা সময় ছিল, যখন হিন্দু – মুসলিম মুখ দেখত না। মুখ দেখলেই নাকি জাত যেত। এমনকি বাড়ির সামনে দিয়ে হেটে গেলেও জাত যেত। সেই সময় বন্ধুত্ব হল একজন ব্রাম্মন এবং একজন মুসলিম পুরুষের।যারা একি আত্মার দুই বন্ধু।তারা এক পাতে বসে খেত। সময়টা কমপক্ষে একশতবছর আগের বা তারও আগের… তারা দুজনেই ছিলেন খুবই মেধাবী এবং শিক্ষিত।সার্টিফিকেটে তো বটেই কিন্তু তারা সেই সার্টিফিকেট, পেশাগত দিকের বাইরেও তৎকালীন হিন্দু – মুসলিম বিদ্বেষ বাদ দিয়ে তাদের উদার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় রেখে গেছেন। ফলে, তাদের তৎকালীন সমাজ তাদের আঙ্গুল তুলে প্রশ্ন করেছিল কিনা তা আমার জানা নেই কিন্তু সেই সমাজের মানুষ তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায় নি, তা আমি জানি। সেই মুসলিম বন্ধুর ঘরে জন্ম নেন এক কন্যা। মাত্র ৬/৭ বছরের কন্যা এবং ছোট এক পুত্র রেখে খুব কম বয়সেই দুরারোগ্য অসুখে মারা যান লোকটি।মৃত্যুর সময় তাঁর হিন্দু বন্ধুর হাতে তুলে দিয়ে যান তাঁর অবুঝ দুই শিশুকে, বলে যান আমার ছেলেমেয়ের দায়িত্ব আজ থেকে তোর। সেই কথা হিন্দু বন্ধুটি রাখেন। এবং সেই শিশু কন্যা এবং পুত্র তাঁকে নিজেদের বাবার মতন সম্মান দিতেন। সেই কন্যা আমার দাদী। তিনি কঠিন সংগ্রাম করেছেন সারাজীবন। তিনি সংসার, সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি নিয়ে ভেবেছেন। তাঁর লেখা গল্প কবিতা দুই বাংলার পত্রিকায় জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তিনি রাজনীতিও করেছেন। তাঁর প্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন সর্বক্ষেত্রে। তিনি নিজের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করেছেন এবং প্রকৃত মানুষ করে গেছেন।নিজের ছেলেমেয়ের বাইরেও অনেক ছেলেমেয়েদের নিজের সন্তানের মত ভালোবেসেছেন,লেখাপড়া শিখিয়েছেন এবং তাদেরও প্রকৃত মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। আমি দেখেছি, পিতামাতা হারানো এক হিন্দু পরিবারের ছেলেমেয়ে তাঁকে আম্মা ডাকতেন। আমিও তাদের চাচা,পিসি ডাকতাম। চাচার সাইকেলে পুরো শহর ঘুড়েছি ছোটবেলায়। লক্ষ্মী পুজোয় তাদের বাড়ী গিয়ে আলপনা দিয়েছি, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ এঁকেছি,কলা বউ সাঁজিয়েছি,ছোট ডাবে সিঁদূর দিয়ে স্বস্তিকা এঁকেছি। বাড়ি ফেরার সময় নাড়ু,মোয়া নিয়ে এসেছি.. দেখেছি এক খ্রীষ্টান পরিবার আমাদের পরিবার হয়ে গিয়েছিল ।তারা আমাদের বাড়িকে নিজেদের দাদুবাড়ী মনে করেন। আমরা না গেলে তাদের বড়দিনের কেকই কাটা হত না.. ওই বাড়িতে আমি নিজ হাতে ক্রিসমাস ট্রি সাজিয়েছি… সেই বাড়ীতে আমার তিন দিদি আছেন। তারা বলতে গেলে আমার মায়ের বয়সী।আমি জানি তাদের যদি কেউ প্রশ্ন করে আমি তাদের সম্পর্কে কে হই ? তারা এক বাক্যে বলবেন আমি তাদের কাকাতো বোন। আমার দাদীকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেই ডাক্তার চেকআপ করতেন নিয়মিত, তিনিও হিন্দু ধর্মের ছিলেন। উপরের কথাগুলো দেখলে আজকালকার অনেকেই এক ঝটকায় বলে বসবেন, আমার দাদী নাস্তিক ছিলেন। কিন্তু আমি আমার দাদীকে নামাজ পড়তে দেখেছি। কিন্তু কোনদিন তাঁকে দশহাত চওড়া ঘোমটা দিতে দেখি নি শাড়ির আঁচল দিয়ে। এমন পরিবারেই আমার বেড়ে ওঠা।শুধু আমি নই এমন পরিবার আরও আছে আমি জানি। আমার ছোটবেলাকার পরিবেশ এমনি ছিল। উৎসব মানে আনন্দ.. ( সেখানে ধর্ম মূল বিষয় ছিল না) কিন্তু pic-2হিসাব করে দেখলাম গত বছর সাতেক ধরে, ধর্ম নিয়ে কাটাকাটি,খুন.. এও দেখি ফ্রক পরা মেয়েগুলো মাথায় হেজাব পরে। আমি অবাক হই…! অথচ এমন সংকটাপন্ন দেশ দেখার আশা, কোনদিন আমার পুর্বপুরুষেরা দেখেন নি। কথায় কথায় ধর্ষণ, লাঞ্চিত মেয়েরা, এমন দিনও আসবে তা হয়তো ভুলেও ভাবেন নি তারা। আমাদের পোড়া কপাল আমরা চেয়ে চেয়ে দেখি। আমি জানতাম সংস্কৃতিমনা মানুষেরা উদারমনা হন। কিন্তু কিছুদিন আগে দেখলাম এক সংস্কৃতি জগতের মানুষ বললেন ধর্ম যার যার উৎসব সবার নয়, উৎসব তার তার … তিনি এও বলেছেন হিন্দুরা কি মুসলমানের উৎসব পালন করেন? আমি বিস্মিত হলাম… ভাবলাম, তিনি মানুষ সম্পর্কে তেমন বিষদ আকারে কিছুই জানেন না.. তাহলে নিশ্চয়ই জানতেন বর্তমান সমাজে এখনও অনেক মানুষই আছে যারা সব ধর্মের উৎসবে বেড়ান, ঈদ মোবারক, শুভ বিজয়া,হ্যাপি ক্রিসমাস, বৌদ্ধ পুর্নিমায় শুভেচ্ছা জানান। আসলে মানুষের মনের পরীধি সীমিত হলেই শুধু ধর্ম নিয়ে মানুষ কাঁদা ছেটায়। তারা জানেন না সকল ধর্মের উপরে প্রকৃতি, মানুষ, জীবজন্তু। ধর্ম তো মানুষই পালন করে। মানুষ খুন করলে ধর্ম পালন করবেন কে? জন্মগতভাবে মানুষ যে ঘরে জন্মায় সে ঘরের ধর্মই পালন করে। একটা সদ্যজাত শিশুকে কেউ যদি রাস্তায় ফেলে দেয়, সেই শিশু কিন্তু জানে না সে কোন ধর্মের.. বা কোন শিশুকে যদি কোন পরিবার দত্তক নেয় সেই শিশুও কিন্তু দত্তক নেয়া পরিবারের ধর্ম পালন করবে।কারণ সে তো জানে না তার ধর্ম কি..? অন্য ধর্মের মানুষেরা নিজেদের ধর্ম নিয়ে কিছু বললে, মানুষ বলে, তারা উদারমনা… কিন্তু ইসলাম নিয়ে কোন কথা বললেই, বলে নাস্তিক..! সেই মানুষগুলো জানে না যে নাস্তিক হওয়া এত সোজা না..! বললেই নাস্তিক হওয়া যায় না বা বললেই নাস্তিক হয় না। নাস্তিক হতে যুক্তি লাগে,মনে বিশ্বাস লাগে..! আস্তিক হওয়া তো সোজা… এই যে প্রতিদিন শুনি সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষণ হচ্ছে, সারাদেশে হিন্দুদের সংখ্যালঘু বলে অত্যাচার করছে,ঘর-বাড়ি তছনছ করে দিচ্ছে…! কি লাভ হচ্ছে তাদের…? তারা যদি নিজেদের আস্তিক বলে দাবী করেন, তাহলে আমি তা বিশ্বাস করি না.. তারা কেউ মানুষই না। মানুষের চেহারার হিংস্র পশু এক একটা.. তাদের কোন জাত,ধর্ম,গোত্র নেই । থাকতে পারে না। থাকলে এমন বর্বরতা করতে পারত না। শুরুতে আমি কমপক্ষে একশ বছরের পুরানো ঘটনা দিয়ে শুরু করেছিলাম। তারপর সমাজ বেশ ক্ষানিকটা পরিবর্তন হয়েছে।অনেক মানবিক হয়েছে আবার বেশ কিছু বছর আগে থেকে সমাজ আবারও স্রোত হারিয়েছে সঙ্গে হারিয়েছে মানবিকতা.. এখন সময় এসেছে মানবিকতা শেখার। সময় এসেছে বক ধার্মিকতা বাদ দিয়ে সমাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। সময় এসেছে মানুষ খুন, ধর্ষন বাদ দিয়ে মানবিকতা শেখার। সময় এসেছে মানব ধর্মে দীক্ষা নেয়ার…