অতঃপর লাংট্যাং ভ্যালি

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

( কলকাতা থেকে):তার পর…….সবাইকে এনজেপি স্টেশনে টা টা করে, আমি চলে এলাম শিলিগুড়িতে…। প্রিয় ঠেক ন্যাফের (Himalayan Nature and Adventure Foundation) দফতরে…। অনিমেষদার কাছে ঘ্যানঘ্যান শুরু করলাম, বলো না কোথায় যাওয়া যায়, ক’দিন ছুটি আছে, পাহাড়ে না গেলে তো আমি মরে যাব বলো….ইত্যাদি ইত্যাদি।

অনিমেষদা অনেক ক্ষণ ধরে ঘ্যানঘ্যান শুনে, নানা রকম ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে আমার মাথার অসুখটা বেড়েছে…। নইলে কেউ এ রকম একা একা পাহাড় যাব বলে লাফায় না নাকি…।

কাঁকরভিটা

কাঁকরভিটা

এখানে অনিমেষদার কথা দু’লাইন লেখা যায়…। যদিও দু’লাইনে আসলে কিছুই লেখা যায় না…। ন্যাফের কো-অর্ডিনেটর বলে পরিচিত এই মানুষটার সঙ্গে আমার বছর আড়াই আগে পরিচয়…। পরিচয়ের হেতুটা খুব একটা আনন্দের ছিল না। একটা চরম ক্রাইসিসের মুখে পরস্পরের সাহায্যপ্রার্থী হয়েছিলাম আমরা…। তার পর থেকেই কোনও এক অজানা কারণে এই বুড়ো লোকটার প্রতি অগাধ ভরসা করা শুরু, আর উল্টো দিক থেকে অকারণ স্নেহ…। সমস্ত রকম বাঁদরামি, অসভ্যতা, অবাধ্যতা, পাকামি ক্ষমা করে দিয়ে আরও শক্ত হয়েছে মাথার ওপর রাখা হাতটা…। আমি সাধারণত কারও কোনও কথা না-শোনায় বিশ্বাস করি। যে যা বলছে, তার ঠিক উল্টোটা করাই অভ্যাস। তার পরেও যে ক’জন মানুষের কথা হুবহু মেনে চলে নিজেই অবাক হয়ে যাই, অনিমেষদা তাঁদের মধ্যে এক জন…। ন্যাফের মতোই, আমারও কো-অর্ডিনেটর…।

যাই হোক, শেষে আমার ঘ্যানঘ্যানের কাছে হার মেনে, বেশ খানিক ক্ষণ ভেবে, দাড়ি-টাড়ি চুলকে অনিমেষদা চোখ সরু করে বললেন—, “লাংট্যাং ভ্যালি যাবি? নেপালে? গত বছর ভূমিকম্পের জ়িরো পয়েন্ট…। স্ম্যাশড্ হয়ে গিয়েছিল উপত্যকাটা, এ বছর থেকে মনে হয় ফের রুট খুলছে। যাবি?” বললাম, যাব। আরও খানিক দাড়ি চুলকে, একটা হলুদ রঙের ছোট্ট চিরকুটে খসখস করে ক’লাইন ব্রিফ করে দিলেন অনিমেষদা…। বললেন, ‘‘যা দেখে আয় কেমন আছে ভ্যালিটা…।’’

তখনও নিশ্চিত জানি না, লাংট্যাঙের ট্রেকরুট কতটা খোলা, ট্রেক করার উপযুক্ত পরিকাঠামো আছে কি না, থাকা-খাওয়ার জায়গা কোথায় কেমন বা আদৌ আছে কি না, গাইড পাব কি না…।জানি না, একা একা গোটা ট্রেকটা আদৌ করে ওঠা হবে কি না…। ঠিক হল পরের দিন, মানে চার তারিখ সকালে বেরিয়ে পড়ব কাঠমান্ডু…। ইন্টারনেটে এক বার দেখলাম, কাঠমাণ্ডুর ফ্লাইটের টিকিট নেই…। কাঁকরভিটা থেকে বাসেই যেতে হবে…। গত বছর ভূমিকম্পের সময় নেপাল গিয়েছিলাম বাসে, এই একই রুটে…। ১৮-২০ ঘণ্টার সেই ভয়ঙ্কর বাসজার্নির কথা মনে পড়ে গেল…।
রাতে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে ফিরে রুকস্যাক গুছিয়ে নিলাম…। ঘুম হল না ভাল…। লাংট্যাঙের ম্যাপ দেখে আর ভূমিকম্পের খবরগুলো পড়েই পার হয়ে গেল রাতটা…।

পরের দিন সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়া। শিলিগুড়ি থেকে বাসে করে পানিট্যাঙ্কি, সেখান থেকে রিক্সা করে মেচি নদী পেরিয়ে কাঁকরভিটা বর্ডার…। কাঠমাণ্ডুর বাস মেলে সেখান থেকেই…।

সাত সকালে মাছাপোখরি বাস স্ট্যান্ড

সাত সকালে মাছাপোখরি বাস স্ট্যান্ড

পানিট্যাঙ্কির বাসে উঠে থেকেই গল্প শুরু হল…। কিছু ক্ষণের মধ্যেই আমার মনে পড়ল, যে হলুদ চিরকুটটায় অনিমেষদা ট্রেকরুটটা ব্রিফ করে দিয়েছিলেন, সেটা আমি হারিয়ে ফেলছি…। যে কয়েক বার চোখ বুলিয়েছিলাম, সেই স্মৃতিটুকুই আগামী দিনগুলোর ভরসা…। নিজের ওপর রাগ হচ্ছে, আর এ কথা-সে কথা ভাবছি…। ঝকঝকে নীল-সাদা আকাশ দেখছি, মাঝে মাঝে কাশফুলও দেখছি… আর বাস ছুটে চলেছে শহর ছাড়িয়ে অন্য দেশের সীমান্তের দিকে…।
কন্ডাকটর দাদার ‘পানিট্যাঙ্কি পানিট্যাঙ্কি’ চিৎকার শুনে, গোদা রুকস্যাক সামলে হুড়মুড়িয়ে নামতে যাব বাস থেকে, রুখে দিল সুব্রতদা অর্থাৎ কনডাকটর দাদা নিজেই। “তুমি তো ও-পারে যাবে, নেপালে?” বললাম হ্যাঁ তো। “বোসো, লাইন পেরিয়ে গিয়ে স্ট্যান্ডে নেমো।” বসলাম, বাসে কেবল দু’তিন জন তখন। দুয়েকটা কথাতেই জানলাম সুব্রতদার নাম…। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, সে সবও বললাম। এক ভদ্রলোককে ডেকে সুব্রতদা বলল, “ইরশাদ, দিদিকে একটু নিয়ে যাও তো সঙ্গে, একা আছেন। কাঠমাণ্ডুর বাসে তুলে দিও…।”
ইরশাদ দাদার সঙ্গে নামলাম কাঁকরভিটা…।

তার পর সব কিছু ম্যাজিকের মতো হল। বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটার ঠিক আগে, ইরশাদ দাদার একটা ফোন কলে কী করে যেন ভদ্রপুর থেকে কাঠমান্ডু ফ্লাইটের টিকিট হয়ে গেল একখান। অথচ আগের দিন ইন্টারনেটে পাইনি আমি…। খুব ভাল হল, অনেকটা সময় বাঁচল…।
কাঁকরভিটায় কিছু ভারতীয় টাকা বদলে নিলাম নেপালি টাকায়। হাজার দিলে ষোলো’শ ফেরত পাওয়া যায়, ভারী মজা…। কাঁকরভিটা থেকে ভদ্রপুর এয়ারপোর্ট ঘণ্টা দেড়েকের পথ, কীসে যাব? ইরশাদ দাদা বলল ‘‘আমার বড় গাড়ি আছে, পৌঁছে দেব।’’ তখনও বুঝিনি, বড় গাড়ি মানে তেলের ট্যাঙ্কার! নেপাল অয়েল নিগম লিমিটেডে কাজ করে ইরশাদ দাদা। ট্যাঙ্কার চালিয়ে তেল পারাপার করাই কাজ…। এক্কেবারে ফিলিং হাইওয়ে মোডে পৌঁছে গেলাম চারালি। সেখান থেকে অটোয় ভদ্রপুর।
এয়ারপোর্টে ঢোকার মুখে নীল ইউনিফর্ম পরা এক অফিসার, মিস্টার দীক্ষিত, হাতে টিকিট নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আমার জন্য। সিনেমার টিকিট কাটার মতোই ওঁর হাতে টাকা দিয়ে, টিকিটটা নিয়ে ঢুকে পড়লাম এয়ারপোর্টে। একটা ছোট হলঘরের মতো এয়ারপোর্ট…। প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। লবি ঘেঁষে রানওয়ে। খেলনা প্লেনের মতো ছোট ছোট প্লেনের ওঠা-নামা চলছে সমানে…।

এক ঘণ্টার জার্নিতে কানে গোঁজার তুলো ছাড়াও মিলল বাদামভাজার প্যাকেট, লেবু-লজেন্স, কোল্ডড্রিঙ্কস। ফূর্তিতেই ছিলাম, যত ক্ষণ না ডান দিকের জানলা দিয়ে এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, মাকালুর সাদা সাদা মাথাগুলো দেখা যেতে শুরু করল। এ দিকে আমি বসেছি বাঁ দিকে। আর প্লেনভর্তি নিত্যযাত্রীর কারও কোনও হেলদোলই নেই…। একা আমিই সিট থেকে উঠে ডান দিকের জানলায় উঁকিঝুঁকি করে অস্থির হলাম।
জানলা দিয়ে নীচে চায়লে মনে হয়, নীল কার্পেের ওপর রাশি রাশি মেঘের গোল গোল স্কুপ সাজানো…। ওপর দিয়ে ডানার প্রপেলার ঘুরিয়ে গোঁ গোঁ করে উড়ে চলেছে ইয়েতি এয়ারলাইন্সের ছোট্ট প্লেনটা…। নামার আগে দেখলাম, ছবির মতো সাজানো কাঠমাণ্ডু শহরে বিকেল নামছে ধীর পায়ে…।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে মাছাপোখরি…। ওখানকার বাসস্ট্যান্ড থেকেই ছাড়বে বাস…। সেই বাসে করে স্যাফ্রু বসি পৌঁছে শুরু হবে ট্রেকিং…।

ল্যাদ এবং পোজ

ল্যাদ এবং পোজ

মাছাপোখরি পৌঁছেই মনটা খারাপ হয়ে গেল…। ভীষণ ঘিঞ্জি একটা শহর..। এর আগে যে দু’বার কাঠমান্ডু এসে থেকেছি, তার সঙ্গে একেবারে মিলল না…। এ সময় আবার নেপালে দশাই উৎসবের ধুম…। আমাদের দশেরার মতোই হই চই কাণ্ড…। দোকানে, বাজারে, ভিড়ে, ব্যস্ততায় থিকথিক করছে গোটা শহরটা…। লোকজন গাঁক গাঁক করে ছুটছে…। গায়ে-গা ঠেকে যাওয়া ভিড়। কী রকম যেন একটা বোঁটকা গন্ধ ছেয়ে আছে হাওয়ায় হাওয়ায়…। বাসডিপো খুঁজে বার করে টিকিট কেটে ফেললাম পরের দিন সকালের বাসের। বাস স্ট্যান্ডের কাছে সস্তায় একটা চরম বিরক্তিকর হোটেল পাওয়া গেল। নোংরা, হইহই, ঘুপচি।
ফাটা জিন্স, সোনালি গেঞ্জি আর কাঁটা কাঁটা হেয়ারব্যান্ড চড়ানো হোটেলের ছেলেটাকে একটু বিরক্তি নিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, রাতবিরেতে কোনও ঝামেলা করবে না তো কেউ…? এত ক্ষণ ধরে নেপালি ছাড়া একটাও অন্য শব্দ না-বলা ছেলেটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে, চোখ নাচিয়ে বলল, “ম্যায় হুঁ না!” এর পরে আর কিছু বলতে যাওয়াটাই অন্যায়।
সন্ধেয় অনেক খুঁজে খাবার জায়গা জুটল একটা। সেখানে প্রবীণ দাদার সঙ্গে আলাপ হল। একা আছি শুনে কার্ড দিয়ে বললেন, “নেপালে বিদেশিদের সঙ্গে কেউ কিছু করে না কখনও…। আমরা বিদেশিদের সম্মান করি। তবু যদি তোমার কোনও অসুবিধা হয় রাতে, যখন খুশি ফোন কোরো আমায়।”

পরের দিন, পাঁচ তারিখ…। সকাল সাতটায় বাস ছাড়বে হোটেলের পাশ থেকেই। পৌনে সাতটা নাগাদ স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখি, শহরের সমস্ত মানুষ যেন সকাল সকাল ওই স্ট্যান্ডেই জড়ো হয়েছে। একগাদা বাস এ দিক ও দিক দাঁড়িয়ে…। সবেতেই নেপালিতে নম্বর লেখা। আমার টিকিটেও নেপালিতেই লেখা নম্বর। ভাবছি কাউকে জিজ্ঞেস করব, এমন সময় একটা বাচ্চা ছেলে নিজে থেকেই এগিয়ে এসে দেখতে চাইল টিকিট। চিপস বিক্রি করছিল ছেলেটা…। টিকিট দেখেই বলে, আরে ওই তো ওই বাসটা, ছেড়ে দিচ্ছে…!! দৌড়ে গিয়ে চড়ে বসলাম! তার মধ্যেও এক প্যাকেট চিপস কিনিয়ে দিল বাচ্চাটা…। কিন্তু বাজে তো পৌনে সাতটা, সাতটার বাস ছাড়বে কেন…!? আবিষ্কার করলাম, নেপালের সময় পনেরো মিনিট এগিয়ে, আর আমার ঘড়ি ভারতের সময়েই পড়ে আছে। সুতরাং….

বাসের শেষ সিট। পাহাড়ি রাস্তায় যাঁরা বাসে চড়ে লংজার্নি করেছেন, তাঁরা এই শেষতম সিটের মাহাত্ম্য বুঝতে পারবেন নিশ্চয়…। ভাইব্রেশন নয়, জার্কিং মোডে শুরু হল যাত্রা…। যাত্রার প্রথম অংশটা পাশের সিটে ছিলেন এক জন তরুণ এবং উত্তেজিত লামা…। যিনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন বলে উসখুস করছিলেন…। কিন্তু আমি শুরু করার পর মৌনব্রত প্র্যাকটিস করতে শুরু করলেন…। আর দ্বিতীয়াংশে সোনি আর দীনেশ নামের এক বাচ্চা দম্পতি…। যাঁরা দু’জনেই পুরো রাস্তাটা আমার কাঁধের ওপর ঘুমিয়ে কাটালেন (আমার ডান দিকটা অবশ হয়ে গিয়েছিল)।

হিসেব ছিল, দু’টো-তিনটের মধ্যে স্যাফ্রু পৌঁছে যাব…। কিন্তু বাস্তবে যা হল, সাড়ে পাঁচটায় ধুঞ্চে অবধি পৌঁছনোর পর বাস বলল আর যাবে না…। নির্বিকার ভাবে বলল, আর সব যাত্রীরা নির্বিকার ভাবে নামতে শুরুও করে দিল…। ভারী মজা তো…!! বুঝলাম, এই রুটের বাসগুলোর এ রকম ভাবে যতটা খুশি চলে না-যেতে চাওয়ার মধ্যে অবাক হওয়ার কোনও ব্যাপারই নেই…। ধুঞ্চেতে লাংট্যাং ন্যাশনাল পার্কে ঢোকার পারমিশন করাতে হল ১৬৯৫ টাকা দিয়ে…।

 মেলিসা-আর-কেলি

মেলিসা আর কেলি

ধুঞ্চে থেকে স্যাফ্রুর দূরত্ব বারো-তেরো কিলোমিটার। তত ক্ষণে আলাপ হয়েছে Liran আর Sam-এ্রর সঙ্গে…। ইজ়রায়েল আর ইংল্যান্ড থেকে এসেছে ওরা লাংট্যাং ট্রেক করতে…। ওদের গাইড, Shivaraj আর Suneel বলল, বাকি রাস্তা হেঁটেই যেতে হবে…। তবে মেন রোড নয়, পাহাড় বেয়ে জঙ্গল দিয়ে নেমে গেলে কম সময় লাগবে অনেক…।

অন্ধকার হয়ে গিয়েছে তত ক্ষণে…। বুঝতে পারছি না, রাস্তার পাশের ঢালাও খাদ বেয়ে জঙ্গলে নেমে গিয়ে হেঁটে হেঁটে এতটা পথ পেরোনো আদৌ কতটা সম্ভব…! অথচ উপায়ও তো নেই…! নামা শুরু হল…। ওদের সঙ্গেই…। কযেক পা নেমেই টের পেলাম, পথ বলে কিছু নেই, শুধু জানি এই দিকে যেতে হবে…। শিবরাজ আর সুনীলও আগে কখনও নামেনি এই পথে, কিন্তু ওরা জানে যে পৌঁছে যাওয়া যাবে…।
গাছ সরিয়ে, ঝোপে পা ডুবিয়ে, কাদায় প্যাচপেচিয়ে চলছি আমরা…। কখনও নামছি, কখনও উঠছি…। কখনও অনেকটা এগিয়ে গিয়ে দেখছি এগোনোর পথ নেই, আবার ফিরে এসে অন্য পথ খোঁজা…। ঘণ্টা দেড়েক পর দূঊঊঊঊঊঊরে এক চিলতে আলো দেখিয়ে শিবরাজ বলল, ওই দেখা যায় স্যাফ্রু…! আমার তো মাথায় হাত, আজ রাতে পৌঁছব তো…?! আরও ঘণ্টা দেড়েক পর মেন রোডে ওঠা গেল…। স্যাফ্রু পৌঁছে গিয়েছি আমরা…।
যে কোনও ট্রেকিং শুরু হওয়ার পয়েন্টগুলো যেমন হয়, না-শহর-না-গ্রাম, স্যাফ্রুও তাই…। তার উপর বিদেশি ট্রেকারের নিয়মিত আসা যাওয়া এই রুটে…। ভূমিকম্পের জন্য গত বছর থেকে বন্ধ থাকলেও, এ বার থেকে চালু হয়েছে…। মুখের সামনেই প্রথম যে হোটেলটা পাওয়া গেল, দেবেন্দ্র থাপার ইয়ালা পিক গেস্টহাউস— শিবরাজরা ঢুকে পড়ল ওটাতেই। অগত্যা আমিও…

অনিমেষদার কথামতো আমার প্ল্যান ছিল, দুপুর দুপুর পৌঁছে স্যাফ্রু থেকেই স্থানীয় কোনও ছেলে/মেয়েকে সঙ্গে নেব গাইড হিসেবে…। সম্ভব হলে ট্রেক শুরু করে একটু এগিয়েও থাকব পরের জনপদ পর্যন্ত…। রাত ন’টায় স্যাফ্রুর হোটেলে পৌঁছে, সারা দিনের প্রথম খাবার হিসেবে নুডুলস স্যুপে চুমুক দিয়ে, (সকালের কেনা চিপসের প্যাকেটটাকে খাবারের মধ্যে না-ধরে প্রথম খাবার বললাম) সেই প্ল্যানের কথা মনে পড়ে হাসিই পেল জব্বর…। হোটেলের রুমের দরজাখানা বিস্তর উঁচু…। ছিটকিনি লাগাব যে, হাতই পাই না…! দু’দিনে এই প্রথম বার মনে হল, সঙ্গে কেউ থাকলে, মানে আমার চেয়ে লম্বা কেউ থাকলে ভাল হতো…। কিন্তু সঙ্গে রুকস্যাক ছাড়া কেউ ছিল না, তাই সেটাকেই ভেজানো পাল্লায় হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে বিছানায় ফ্ল্যাট…

পরের দিন সাতটা নাগাদ স্যাক গুছিয়ে, জুতো পরে রেডি…। পাঁউরুটি আর চা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়া গেল…বড্ড দাম সব খাবারের… মানে এই যেমন ২০০ টাকায় দু’টো পাঁউরুটি আর ৫০ টাকায় লাল চা…!

স্যাফ্রু সকাল...

স্যাফ্রু সকাল…

হাঁটা শুরু হল…। শিবরাজ, সুনীলরা বেরোবে বলল একটু পরে…। মেন রোড দিয়ে মিনিট কুড়ি হেঁটে গিয়ে, ডান দিকে একটা ব্রিজ বরাবর নেমে যেতে হয়…। ত্রিশুলি নদীকে ডান হাতে রেখে উঁচু-নিচু জঙ্গল-পাহাড় পথে হাঁটা…। মাঝে মাঝেই ঝুলন্ত ব্রিজ পেরোতে হচ্ছিল, নদী কখনও ডান দিকে, কখনও বা বাঁ দিকে…। খানিক এগোতেই দেখা মেলিসা আর কেলির সঙ্গে…। কলোরাডো থেকে এসেছে, দুই বোন…। মানে কোনও একটা ব্যাপার নেই, দুই বোন মিলে কলোরাডো থেকে নেপাল চলে এসেছে ট্রেক করতে…!! ওরা বলছিল, দু’জনেই ঘুরতে খুব ভালবাসে…। কেলি পিএইচডি করছে, আর মেলিসা কীসের যেন কনসালট্যান্ট…। সময়-সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়া…। আর এই নেশার জন্য মেলিসার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে, আর কেলির ব্রেক আপ…। মেলিসাকে বললাম, ওদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরলেই তো হতো…! বলল, ‘‘ধুর ধুর, ওরা হাঁটতে পারত না…। সব জায়গায় গিয়ে বলত তোমরা ঘুরে এসো, আমরা হোটেলে আছি…। ও রকম বর থাকার চেয়ে না থাকা ভাল…।’’
আমি ভাবছিলাম, আমার এমনি বোন নেই…। আমার এত বোন আছে, তারা কেউ এমনি নয়…। আমার কেন এমনি বোন নেই…!?

হাঁটছি টুকটুক করে…। সামান্য চড়াই উতরাই রাস্তা…। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে…। এই জঙ্গল দেখে বারবার জোংরি ট্রেকের কথা মনে পড়ছিল আমার…। বিশেষ করে সোখা থেকে ফেদাংয়ের পথটা…। তবে এই জঙ্গল অতটা ঘন নয়, নয় অত স্যাঁতস্যাঁতেও…। গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো দিব্য ঢোকে ঝিলমিলিয়ে…।
তবে মাঝে মাঝেই এমন এক একটা জায়গা আসছে, গাছ ঘেরা… আলো-ছায়া… নিস্তব্ধ… মনে হয় যেন সময় থেমে গিয়েছে এখানেই…। ফুরিয়ে গিয়েছে রাস্তা…। মুখের ওপর ঝুঁকে পড়া গাছের ডালগুলো ছাড়া আর কাউকে ছুঁয়ে দেখা সম্ভব হবে না বুঝি এই জীবনে… অস্থির লাগে কিছু ক্ষণ পর…। তাড়াতাড়ি হাঁটা লাগাই…

রাস্তায় যত জনের সঙ্গে দেখা, প্রথমেই বিস্ময়ে প্রশ্ন করে ‘‘আকেলো ছ?’’ আমি সম্মতি জানাতেই আবার কনফার্ম করে, ‘‘সাথী ছাই না? গাইড ছাই না?’’ অর্থাৎ ‘‘একাই আছো? সাথী নেই? গাইড নেই?’’ এ বারও ঘাড় নেড়ে বলি আমার কেউ নেই, একাই চলেছি…। তখন হেসে বলে, ‘‘নেপালি ছোড়ি ছ।’’ নেপালি মেয়ে…। আমি দাঁত বার করে ফের জবাব দিই, কলকাতা থেকে আসছি…। নেপালি নই…। ‘‘একা একা, ইন্ডিয়ান মেয়ে, লাংট্যাং চলল…’’ জাতীয় বিস্ময়-মুখগুলোকে পার করে হাঁটতে থাকি আমি…। কিছু পরে পেরোয় ডোমেন, তার পর পাইরো…। মাঝে মাঝেই আগু-পিছু হচ্ছে লিরান, স্যাম, মেলিসা, কেলিরা…। সব ক’টা স্টপেই চা-স্যুপ খাচ্ছে ওরা…। আমাকেও খেতে বলছে, কিন্তু আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে খুব কায়দা করে বলছি, ‘‘ট্রেকের সময় কিছু খাই না আমি…।’’ (মনে মনে ভাবছি, পঞ্চাশ টাকা দিয়ে চা খেতে খেতে ট্রেক করলে কাঠমাণ্ডুতে ফিরে মেস্টিন পেতে ভিক্ষে করতে হবে..।)

হাঁটছি, থামছি, বসছি, ছবি তুলছি, যাকে পাচ্ছি তার সঙ্গে গল্পও করে নিচ্ছি খানিক ভাঙা ভাঙা নেপালিতে…। আর আমার গল্প করা মানে সেটা তো দুয়েক কথায় শেষ হয় না, ‘তপাইকো নাম কী ছ’ (তোমার নাম কী) থেকে শুরু করে ‘রাতে ক’টা রুটি খাও’ পর্যন্ত গড়ায় কথা…।

পাইরো

পাইরো

একটাই রাস্তা, তাই হারিয়ে ফেলার খুব সুযোগ ছিল না…। এতটুকুও যদি থাকত, তবে নিশ্চিত ভাবে সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতাম আমি…। পাইরোর পর থেকে গোটা রাস্তাটাই চড়াই…। কোনও কোনও জায়গা প্রাণান্তকর…। পিঠে ভারী রুকস্যাক আর গলায় ক্যামেরা নিয়ে হ্যা হ্যা করে হাঁফাতে হাঁফাতে চলেছি…। আর কিছু পরেই আসবে ব্যাম্বু…। ওখানেই থাকার কথা প্রথম দিন…। কিন্তু তখন বারোটাও বাজেনি, আমি ঠিক করে নিলাম আরও একটু এগিয়ে লামা হোটেল চলে যাব…। ব্যাম্বুর পরের জনপদ লামা হোটেল…। এগোচ্ছি, আর ভাবছি বেশ মজাই লাগছে তো একা একা ট্রেক করতে…। বেশি বেশি করে ভাল লাগছে পাহাড়…। এত দিন যেন দলবেঁধে ঠাকুর দেখতে বেরোতাম, এ বার যেন প্রথম বার একা বেরিয়েছি প্রেমিকের সঙ্গে…। যতটা বুক ছমছম, ততটাই ভাল লাগা…।

তবে ব্যাম্বু পৌঁছনোর কিছু আগে থেকে এই একা-চলা বেশ অন্য রকম হয়ে গেল…। হেব্বি খিদে পেয়েছে, ভাবছি ব্যাম্বু পৌঁছে কিছু খাওয়া যায় কি না…। তাড়াতাড়িই হাঁটছি…। হঠাৎ শুনি খিলখিল-কলকল-গুনগুন করে কথা বলছে কারা যেন…। একটু এগোতেই একটা বাঁক পেরিয়ে চোখে পড়ল ওদের…। এক দল কচিকাঁচা, দশাইয়ের ছুটিতে পিঠে বইয়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে কাঠমাণ্ডুর রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে..। সবাই পরস্পরের তুতো ভাইবোন, লাংট্যাং ভ্যালি আর সংলগ্ন এলাকায় থাকে ওরা…। বয়স ৬ থেকে ১৫-র মধ্যে। আমি তো দেখেই ছবি টবি তুললাম, হা হা হি হি করলাম, কথা বললাম— যেমনটা করে থাকি আর কী…। ওরাও ভারী মজা পেয়েছে…! বেশ ‘নতুন বন্ধু’ টাইপের খাতির করে বলছে, ‘‘দিদি আমাদের সঙ্গেই চলো, আমাদের সঙ্গেই খাবে, আমাদের সঙ্গেই থাকবে…।’’ আমার তো মজাই হল, যাকে বলে দে-রামরো…। নানাবিধ গল্প করতে করতে এগোচ্ছি সবাই মিলে…। নরচুম, সোপেমা, শিরিং, সোনাম বুট্টি, রিশে, পানজোর, পেম্বা…..আর আমি…। পেম্বার ভাল নাম Sandup…। বয়স পনেরো…।

 ট্রেক-শুরু

ট্রেক শুরু

ব্যাম্বু পৌঁছে ওদের সঙ্গেই লাঞ্চ করা হল… ভাত, কলাই ডাল, কী একটা তরকারি…। তার পর ফের হাঁটা, এ বার রাস্তা ভাল চড়াই…। নরচুমের জ্বর, হাঁটতে পারছে না…। ওর বইয়ের ব্যাগ আমার কাছে…। আমি নিজে স্যাক আর ক্যামেরা নিয়ে নড়তে না-পারলেও আমার কাছে…। কারণ ওর মনে হয়েছে, দিদিকে ব্যাগটা দেওয়া যায়…। আর আমার মনে হয়েছে, পাহাড়ে এলে পাহাড়ি মানুষগুলোকে দিয়েই তো নিজেদের মাল বওয়াই আমরা…। উল্টোটার সুযোগ পেয়েছি, মন্দ কী…! পুরো সময়টাই কাটছে খিলখিল করে…। পড়াশোনা, ফুটবল, এনরিক, শাহরুখ খান— কিছু বাকি নেই…। এদের সঙ্গে নাকি ঘণ্টা খানেক আগে পরিচয় হয়েছে আমার…! এরা নাকি আমার দেশের মানুষ নয়…! এরা নাকি আমার ভাষায় কথা বলে না…!

পেম্বা বলল, ওরা লামা হোটেলে থাকবে না, থ্যাংশ্যাপ অবধি এগিয়ে যাবে…। পরের দিন লাংট্যাং…। লামা হোটেল থেকে থ্যাংশ্যাপের দূরত্ব ঘণ্টা দুয়েক…। প্রথমে ওদের সঙ্গেই যাব বললেও, লামা হোটেল পৌঁছে ঠিক করলাম আজ আর এগোতে পারব না…। তিনটে বেজেছে তখন, সূর্য মুখ লুকিয়েছে…। মেঘের দল নেমে নেমে আসছে পাহাড়ের গা বেয়ে…। কনকনে হাওয়া প্রিপারেশন নিচ্ছে মাঠ কাঁপাবে বলে…। সব মিলিয়ে ওয়েদার খারাপ হচ্ছে একটু…। ক্লান্তও লাগছিল…। ওদের বললাম থ্যাংশ্যাপ চলে যেতে, পরের দিন সকাল সকাল বেরিয়ে পৌঁছে যাব…। তার পর একসঙ্গে লাংট্যাং…।

আধ শতক আগে শিরিং লামা বলে এক ভদ্রলোক ছোট্ট একটা হোটেল খুলেছিলেন এখানে, নাম দিয়েছিলেন লামা হোটেল…। তার পর আরও অনেক হোটেল-গেস্ট হাউস হয়েছে এখন…। কিন্তু গোটা জায়গাটার নাম থেকে গিয়েছে লামা হোটেল…। ৭৫ বছরের বৃদ্ধ শিরিং লামার ‘অরিজিনাল লামা হোটেল’-এ উঠলাম নিজের অজান্তেই…। সন্ধেয় একটা রুটি (চাপাটি বলা ভাল) আর অমলেট খেয়ে ঘুমোলাম…। স্বপ্ন দেখলাম ভূমিকম্প হচ্ছে…। কাঠের মেঝে দুলছে, টিনের চাল কাঁপছে…।

তার পর…….