আমরা করবো জয়…

রুকসানা আক্তার

রুকসানা আক্তার

( ইংল্যান্ড থেকে):আমাদের অর্জন গুলো কম নয় কিন্তু অবক্ষয় এত বেশী যে অর্জনগুলো ম্লান হয়ে যায়। ধারাবাহিকভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনার ভয়াবহতা ,পৈশাচিকতা এতবেশি যে নিজেদের শুধু দু হাত পা বিশিষ্ট প্রাণী ছাড়া মানুষ ভাবতে পারছি না । মনুষ্যত্ব একটা শব্দ কিন্তু অনেক কিছুর সমষ্টি । মায়া মমতা , ভালোবাসা ,বুদ্ধি, বিবেক ,বিবেচনা ,সহানুভূতি, ত্যাগ ইত্যাদির সমষ্টির নাম মনুষ্যত্ব। তা আমাদের কী আছে? এখন আমাদের অনেক কিছুই আছে আবার অনেক কিছুই নেই । আমাদের পুঁথিগত শিক্ষা আছে ,প্রায় সর্বস্তরে ডিজিটাল সেবা প্রদানের চেষ্টা চলছে ,মাথা পিছু আয় বেড়েছে এবং অদূর ভবিষতে আমরা মালয়েশিয়ার কাছাকাছি হয়তো পৌঁছে যাব। কিন্তু আমাদের মনুষত্বের দম ফুরিয়ে আসছে। আর তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বেশিদূর যেতে পারিনা । তনু হত্যার প্রতিবাদে সভা , মিছিল এবং মিডিয়ায় ফেটে পড়েছিল দেশ । মনে আশা জেগেছিল । এখন মাঝে মাঝে ফেইসবুকে দু একজন স্ট্যাটাস লিখে হঠাৎ মনে করিয়ে দেন অথবা কোথাও তনু হত্যার প্রতিবাদে কোনো মানব বন্ধন এর ছবি দেখে তনু নামের মেয়েটির কথা মনে পড়ে যায়।

আর আমাদের বিকৃত মানসিকতার কথা যদি বলি। একটা বালক কে চুরির অপবাদ দিয়ে বেঁধে পিটিয়ে মেরে ফেলা অথবা পায়ু পথে বাতাস ঢুকিয়ে মেরে ফেলা । কারো ভালোবাসার প্রস্তাবে রাজি না হলে চাপাতির candel_light__suraকোপে বা ছুরিকাঘাতে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া ।একটা ছোট্ট পাঁচ বছরের শিশু কারো বিকৃত লালসার ভয়াবহ শিকার হওয়া ।
পূর্ণিমা সেই বালিকা বেলায় একরাতে একদল হায়েনার হাতে নির্যাতিত হয়েছিল। সেই পূর্ণিমা হারেনি বরং উঠে দাঁড়িয়েছে । পড়াশুনা করছে ।অথচ কোনো অপরাধ না করেও সহপাঠীদের অপমাজনক অমানবিক মন্তব্যর শিকার হচ্ছে । রাস্তায় ধর্ষিত হওয়ার অপরাধে পূর্ণিমাকে রাস্তায় চুলের মুঠি ধরে প্রহার করা হয়েছে । স্কুলে যাওয়া কিশোরী মেয়েটি আরেক কিশোরের হাতে বেধড়ক মার খাচ্ছে তার প্রেমের প্রস্তাব রাজি না হওয়ার অপরাধে। আমরা মুক্তচিন্তার কথা বললে , লিখলে ঘরে ,বাইরে চাপাতির কোপ খেতে খেতে মরে যাব আর না হয় প্রাণ বাঁচাতে পরবাসী হবো।

আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । ধর্মান্ধতা বাড়ছে । বাড়ছে পরস্পরের প্রতি হিংসা ঘৃণা এবং লক্ষী হাতানোর লোভ। তাই অন্য সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ভাঙ্গি ,রাতের আধারে পুরো পরিবারের গলা কেটে ফেলার হুমকি দিয়ে দেশ ছাড়া করে তাদের ভিটামাটি দখল করি ।

এখন প্রশ্ন জাগে আর কি কি বাকি আছে আমাদের ?
আমরা যে মানুষ নামধারী মনুষ্যত্বহীন প্রাণীতে পরিণত হচ্ছি এ নিয়ে কোনও সন্দেহ আছে? নাকি বলবো এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা । ঘটনার সংখ্যা আর কত বাড়লে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হবে না? ।  এসবের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে , লেখালেখি হচ্ছে । কোনো কোনো জায়গায় আসামিও ধরা পড়ছে ।কিন্তু সেই সঙ্গে অপরাধ বাড়ছে বই কমছে না। কেন? কারণ কিছুদিন পর আমরা ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভুলে যাই । আমরা মনে রাখিনা ।দু একটা ছাড়া বেশির ভাগই আইনের ফাঁক ফোকর গলিয়ে বেরিয়ে যায়। তাছাড়া যে কয়টা মিডিয়াতে আসে আমরা শুধু সেগুলোই জানতে পারি। আরো বেশি ঘটছে যা গ্রাম্য মাতাব্বর বা প্রভাবশালীদের প্রভাবে সেই জায়গায়ই কবরস্থ হয়ে যাচ্ছে।
shhhবর্তমানে আমরা যে নৈতিক অবক্ষয়ের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি এই ঘটনা গুলো কী তার সাক্ষী না ? আমরা সব কিছুতেই তাড়াতাড়ি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। সব কিছুতে যেমন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাই ঠিক তেমনি মেনেও নেই খুব দ্রুত। কোনো কিছুতেই ধারাবাহিকভাবে টিকে থাকতে পারি না ।

আমরা আসলে অস্থির। নিজেই জানি না নিজেকে। আমাদের চিন্তা ভাবনার সঙ্গে কর্মের কোনো মিল নেই। আমাদের চিন্তা আর কর্মের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। যদি না থাকতো তবে নিজেকে জানার চেষ্টা আগে হতো ।নিজের ভুল ক্রটিগুলো আগে শুধরানোর চেষ্টা করতাম । করি না বলেই নিজের কাছে নিজেই অজ্ঞ। তো অন্যকে জ্ঞান দান করবো কিভাবে? মানুষ শুধু হাওয়ার মধ্যে শিশুকাল থেকে বেড়ে ওঠে না। বেড়ে ওঠে পারিবারিক পরিমণ্ডল এবং আশপাশের পরিবেশ এবং সমাজের মধ্যে । মানুষের সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখন মানুষের সচেতনতাও বাড়ছে । তবে সব কিছুর এবং সর্বস্তরে একটা সুস্থ ধারাবাহিক চিন্তা ভাবনা ,কর্মকান্ডের এবং স্বল্প সময়ে আইনের সঠিক প্রয়োগ , এই সব কিছুরই বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা আছে । না হলে আমরা এক ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং পরিবেশ রেখে যাবো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। অথচ আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা অনেক প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন । আমরা আমাদের জীবদ্দশায় রাজাকারদের বিচার দেখে যাচ্ছি আমাদের এই পবিত্র মাটিতে । এখন আমাদেরই দায়িত্ব এর পবিত্রতা এবং পরিচ্ছন্নতা এবং সুস্থ পরিবেশ রক্ষা করা । কারণ আমার দেশের মাটি যে কোনো তীর্থ স্থানের মাটির চেয়ে পবিত্র আমার কাছে। এ আমার মা ,আমার শিকড় ,আমার জন্মস্থান। আর এই দেশের মানুষ আমাদের গুরুজন , ভাইবোন আর আমার ছেলে মেয়ে। আমরা করবো জয় অবশ্যই ।