এ যাত্রার শেষ কোথায়…

ধর্ম আসলে কী? ধর্ম তো আত্নার, ধর্ম তো ভালোবাসার, ধর্ম সত্যের, ধর্ম মানুষের মানবিকতার। কিন্তু সেই ধর্ম আমরা পালন করছি কি? মানবিকতার বদলে অনুশাসন, ভালোবাসার বদলে বুজরুকির আশ্রয় নিয়ে আজ আমরা নিজেদের মানবজন্মের পরিচয়কেই ভুলতে বসেছি। পাশবিকতা আর উন্মাদনার সামনে আজ মানবিকতাই সংখ্যালঘু। অাজ সময় এসেছে নিজেদের মুখোমুখি হওয়ার। সময় এসেছে নিজেদের আত্নাকে প্রশ্ন করার-কতটা বিক্রি হয়ে গেছি আমরা? আজ জানা প্রয়োজন, কতকাল ধরে আমরা ইতিহাসের হাত ধরে উল্টোদিকে হাঁটছি? এ যাত্রার শেষটা কি আমরা ভেবেছি?

জাকির হোসাইন উজ্জ্বল

জাকির হোসাইন উজ্জ্বল

কিছু লেখার আগে ভাবতে হয়…
যেহেতু আমার ফ্রেন্ডলিষ্টে সৃজনশীল মানুষের ছড়াছড়ি স্বাভাবিক ভাবেই তাদের কাছে এমন কিছু আশা করি না যা আমাদের দেশ এবং দেশের মানুষকে বিব্রত করে।আমাদের মধ্যে বিভেদ তৈরী করে।হয়তো অভিমান হয়তোবা ক্ষোভ সেটা যাই হোক ভুলে গেলে চলবে না আমাদের সম্পর্ক শুধু ধর্মের না- হৃদয়ের। আমরা একসঙ্গে কাজ করি বলেই আজ এতদূর এগিয়ে এসেছি।কিন্তু হঠাৎ আবির্ভাব হওয়া কিছু ঘটনায় আমরা আমাদের সেই একাত্বতা ভুলে যাব? মনে করিয়ে দিতে হবে আপনার ধর্ম আর আমার ধর্ম এক নয়।কই এতদিনতো কখনো বলেননি এভাবে।যে কোন অপরাধীকে আমরা অপরাধী হিসাবেই দেখি, কখনো কোন অপরাধীর পক্ষ নিয়ে দাঁড়াব না সে যে ধর্মেরই হোক।
আমরা এগিয়ে যাচ্ছি…কোন কিছুই আমাদের আটকাতে পারছে না।কিন্তু আমাদের সেই এগিয়ে যাওয়া রোধ করতে পারে একমাত্র সাম্প্রদায়িকতাই।আমরা কখনো এমন জাতিতে পরিনত হতে চাই না।এক গভীর চক্রান্ত পিছু নিয়েছে অনেক আগে, এখন যা ঘটছে সেটা তারই অংশ হতে পারে না? আমরা কি সেই ফাঁদে পা দিব?
তাই কিছু লেখার আগে ভাবতে হবে, নিজের পরিচয় তুলে ধরার আগে ভাবতে হবে।

fire_png

অরণ্য পাশা

অরণ্য পাশা

ফিচির দিঘী পার হলে জলঙ্গী । হিন্দুপাড়া।ওখানে যে অষ্টপ্রহর কীর্তন হত শুনতে যেতাম।ভাঙ্গা আইল। ইরি ক্ষেত পাড়ি দিয়ে। মধ্য রাত অবধি কীর্তনের সুর।হিন্দু-মুসলমান শুনছে। মোহাবিস্ট হয়ে। কোনও সনাতন ধর্মী হরিনাম করে কেঁদে লুটিয়ে পড়ছে।বোঝার চেষ্টা করি।ঘনডাল- বিভিন্ন ধরনের সবজিঘন্ট। পদ্ম পাতায় খাই। দলবেঁধে। আবার কীর্তনের সুর।গরম জিলাপি।হিন্দুপাড়া।জলঙ্গী।শৈশব।মুসলমান আর হিন্দু।বাড়ি ঘেঁষে।
বেড়ঞ্জু কুঁড়ি পাড়া এক হাঁটু কাঁদা ভেঙ্গে যার কাছে অংক কষেছি।গৌরাঙ্গ স্যার।তার বাড়ির মোয়া- নাড়ু।তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছি।অকৃত্রিম স্নেহ।বাচ্চুশীল, অসীম, সেগুনদা, অরবিন্দদা। বিয়ের বরযাত্রী হয়েছি।ঢাকা পড়বো বলে এডমিশন নেয়ার জন্য রাতদিন যার বাসায় পড়ে থেকেছি তিনি প্রিয়রঞ্জন স্যার।
মসজিদের ইমাম ইব্রাহিম ও গগনের একসঙ্গে কতশত গল্প করার দৃশ্য দেখিছি।রমজানের সময় ইফতারের আগে মুড়ি নিয়ে আসত জলঙ্গী থেকে অশোক কাকা।ধান বিনিময়ে দিত।
সেবার আকলিমার বাচ্চা হলো হাসপাতালে। বাচ্চা মায়ের দুধ পায়না।নিজের ১মাসের বাচ্চা রেখে হাসপাতালে গিয়ে নিজের বুকের দুধ অন্যের বাচ্চাকে দিয়ে এসেছে রায়কালীর হরিনাথ কাকার মেয়ে দেবযানী দিদি।
মুসলমান পরিচয়ের সবাইকে বলি  আগে ধর্ম কে  জানো। যারা নিজের র্ধমকে মানে না, র্ধম সর্ম্পকে জানে না, তারাই অন্য ধর্মের মানুষকে গাল দেয় এবং দিতে পারে।

fire_png

আজম খান

আজম খান

বাংলাদেশে আসলে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কেউ সংখ্যালঘু না। সংখ্যালঘু হচ্ছে বিবেকবান মানুষেরা। যারা ধর্মীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়, অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে। এই চিত্র খোদ আওয়ামি লীগের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। এই সরকারের আমলে প্রথমে শুরু হল রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা করার মধ্য দিয়ে। বিচার হয়নি। এরপরে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরে একের পর এক হামলা। একটা ঘটনারও বিচার হয়নি। এসবের বিরুদ্ধে যারা প্রতিনিয়ত লড়াই করেন ব্লগার, প্রকাশক, সাংস্কৃতিক কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষক, একে একে সব ঘরানার মানুষের উপরে হামলা হয়েছে।

সত্যিকার অর্থে সরকার কখনো এই ঘটনাপ্রবাহকে কোন সমস্যা মনে করেনি। গুলশানে আর্টিজান রেস্তোরাঁয় বিদেশিরা না মারা গেলে জঙ্গি সমস্যা নিয়েও সরকার তথা আওয়ামি লীগের কোন মাথাব্যাথা ছিল না। বর্তমানে এই দলটার ছাল হচ্ছে প্রগতিশীলতার কিন্তু অধিকাংশ নেতা কর্মী, এমনকি দলীয় আচার আচরনের নির্লিপ্ততা প্রমান করে তারা নিজেরাও এক ধরনের ইসলামি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পক্ষে দন্ডায়মান। নইলে অন্তত দলীয় নির্দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা আক্রান্ত জায়গাগুলোতে নেতা কর্মীরা পাশে দাড়াতো। সেটা হয়নি, আর হবে বলেও মনে হচ্ছে না।

স্থানীয় পর্যায়ে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের সমর্থন, সহযোগিতা ছাড়া দিনে দুপুরে নাসিরনগরে এত বড় সাম্প্রদায়িক হামলা হতে পারে আমি বিশ্বাস করি না। এই সরকারের আমলে যতগুলো সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে (২০১৩-২০১৪ সাল ছাড়া) তার শতকরা ৯০ ভাগ ঘটনায় সরকারি দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জড়িত ছিল। খোদ প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই খন্দকার মোশাররফ ফরিদপুরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভিটে বাড়ি দখল করে বসে আছেন যখন তখন কাকে আর কি বলবো। তার জন্য কত নাটকই না আবার উনি সাজালেন আমরা প্রত্যক্ষ্য করলাম। আওয়ামি লীগের অনেক বড় বড় হনু, নেতা কর্মীর মুখে “জয় বাংলা” থাকলেও মনে “নারায়ে তাকবির”।

গতকালকে আমার পোষ্টে সিলেটের মাধবপুরে সাম্প্রদায়িক হামলায় আক্রান্ত একজন কমেন্ট করেছিল। সে বলেছিল, তার বাড়ির সামনের মন্দির ভাঙ্গা হচ্ছে। মুল্যবান জিনিসপত্র ব্যাগে নিয়ে সে বাড়ির পাশে কোথাও পালিয়ে আছে। প্রানভয়ে শরীর কাঁপছে। জানে না কি করা উচিৎ।

একাত্তরে বাঙালি মুসলমানের এমন দিন এসেছিল। তার আগে এই বাঙালি মুসলমানই পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম হবার পরপর হিন্দুদের ঠিক গতকালকের সিলেটের মাধবপুরের কায়দায় নির্যাতিত, নিগৃহীত করেছিল। প্রকৃতি কাউকে ক্ষমা করে না। ঠিক তার দুই দশকের মাথায় ১৯৭১ সালে মুসলমান ভাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর রাজাকারদের ভয়ে তারা তাদের মেয়েদের ধর্ষনের শিকার হবার ভয়ে পুকুরে, ডোবায় লুকিয়েছিল। নিজেরাও মুল্যবান জিনিসপাতি নিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল।

এই তালে চলতে থাকলে বাঙালি মুসলমানের আবারো এমন একদিন আসবে। তারা তাদের মুসলমান ভাইদের দ্বারাই আক্রান্ত হবে। অধিক ধর্মান্ধরা অপেক্ষাকৃত কম ধর্মান্ধদের পরিবারের মেয়েদের ধর্মের দোহাই দিয়ে তুলে নিয়ে যাবে। সম্পদ লুট করবে এবং তারপর খুন করবে কিংবা ভিটেমাটি ছাড়া করবে। সাম্প্রদায়িকতার এই দানবকে এখনই রুখে দেয়া না গেলে আজকে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ প্রতিটা সাম্প্রদায়িক হামলায় নির্লিপ্ত থাকছে, কেউ বা আগ বাড়িয়ে উৎসাহ দিচ্ছে তারা প্রত্যেকে এর ফল ভোগ করবে। যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে না শোধরায়, ইতিহাসের চক্র সেখানে পুনরাবৃত্তি ঘটায়।

fire_png

মুনমুন শারমিন শামস্

মুনমুন শারমিন শামস্

রাতের খাবার খাচ্ছিলাম। হঠাৎ ফোন। ছোটবেলার বন্ধু। ভিকারুন্নিসা নূনে একসাথে পড়তাম। হ্যালো বলার পর শুধু বললো, মুনা ক্যামন আছিস? তারপর কোন সাড়া শব্দ নাই। হ্যালো হ্যালো করেই যাচ্ছি। হঠাৎ ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ। কী হয়েছে? কী হয়েছে তোর? বলল, ‘মুনা আমি কিছুতেই পূজার ঘটনাটা মেনে নিতে পারছি না। আমি কিছুতেই মানতে পারছি না।’ বলেই আবারো কান্না।
আমি কী বলবো বুঝতে পারিনি অনেক ক্ষন। চুপ হয়ে ছিলাম। আরো বলল, ‘আমার কষ্টটা কেউ বুঝতে পারছে না। পাশে শুয়ে থাকা হাসব্যান্ডও না। কেউ না। মেয়েদের কষ্ট কেউ বোঝে না রে!’
আমি শুধু বলেছি, আমি জানি। আমি জানি। আমি বুঝতে পারছি।