আমার শহর বগুড়াঃ সেকাল- একাল

muzahidul-islam-shibbir

মুজাহিদুল ইসলাম শিব্বির

পরজন্মে যদি বলা হয়, তুমি কি হয়ে আসতে চাও আর কোথায় যেতে চাও, বিনা বাক্যে আমার উত্তর হবে……” হামি পাখি হয়া আসপের, চাই আর তাল গাছত ঘর বাইন্ধ্যা জনম জনম বগ্রাত থাকপের চাই”।

নিজের জন্ম শহর নিয়ে এই আমার আজন্ম অভিব্যাক্তি। হ্যা, বলছিলাম উত্তরবঙ্গের প্রবেশ মুখ বগুড়া শহরের কথা। যে শহরের প্রতিটি ধুলিকনা আমার চেনা, যেই শহরের বাতাসের গন্ধ আমার মুখস্ত, যেই শহরের প্রতিটা গলিপথ আমার শৈশব থেকে কৈশোরের প্রতিটি স্মৃতির সাক্ষী।

উত্তরবঙ্গের প্রাণ বগুড়া, আর বগুড়ার প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা। একেবারে শহরের মধ্যভাগ এই সাতমাথা। একেবারে অদ্ভুত এক জনারণ্য এই সাতমাথা। পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ার জন্য সাতটি আলাদা মাথায় বিভক্ত এই প্রাণকেন্দ্র। আমার মনে হয় বাংলাদেশের হাতে গোনা একটা বা দুটি শহরে আপনি শহর বিভক্তির এমন অদ্ভুত সম্মিলন দেখতে পাবেন। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর নামে এই সাতমাথার নামকরণ করা হয়েছে “বীরশ্রেষ্ঠ স্কয়ার”।

যারা আমরা বগুড়া শহরে জন্ম, সেখানে শৈশব কাটানো তারা বলতে পারবেন, এখনকার শহর আর সেই নব্বই দশকের আমার বগুড়ার মধ্যে পার্থক্য অনেক অনেক গুন। তবে একটা বিষয় অনেক আনন্দের যে মুল শহর এর আসল রূপ টা নষ্ট করা হয়নি। বরং একই কাঠামোকে ঘষে মেজে এখন আরও পরিপূর্ণ করা হয়েছে। আমি আধুনিক হয়েছি, আমার শহর আরও তিলোত্তমা হয়েছে। এই বদলে যাওয়া যেন আমারই শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পণ। আমরা যখন খুব ছোট ছিলাম, স্কুল এ পড়তাম, তখন ও এই শহরে ২০ টাকায় এক ঘণ্টা রিকশা ভাড়া করে পুরো শহর ঘুরে বেড়ানো যেতো। তাহলে বুঝুন, কোন স্বর্গে বিচরন ছিল আমাদের। শহরের এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ার দূরত্ব হয়ত ২ থেকে আড়াই কিলো। কিন্তু আপনি অনায়াসে সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে পারতেন মাত্র ৫/৬ টাকায়। এখন সেই টাকার অঙ্কে পরিবর্তন এসে তা দাঁড়িয়েছে ২০/২৫ টাকায় । টাকার অঙ্কে জীবন যাত্রা টা এজন্যই উল্লেখ করলাম যে তাতে আপনি বুঝতে পারবেন কত সাধারণ সহজ জীবন সেখানে মানুষের।কিন্তু তার মানে কিন্তু এই নয় যে অনেকটাই পিছিয়ে পড়া জীবন আমাদের। বরং আপনি অবাক হবেন যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে লাইফ স্টাইল এই ঢাকা শহরের জীবন যাত্রা কে ছাপিয়ে যায় মাঝে মাঝেই।bogra-8

যেই শহরে আমরা ডালপুরি, লবঙ্গ, শিঙারা, গুড়ে মাখা জিলাপি খেয়ে বড় হয়েছি, সেই শহরে সেই নব্বই দশক থেকেই ছিল চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবাব মুহাম্মদ আলির বাসভবন এর শহর বগুড়ায়। যার জন্য সেই জন্ম প্রাচীন থেকেই এতে রয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। বগুড়ার নবাব বাড়ি বলে পরিচিত যে জায়গা, সেখানে নব্বই দশকের প্রথম দিকে গড়ে উঠে শিশু পার্ক আর চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। “চম্পক” নামে সেই পার্ক টাই ছিল সপ্তাহের বিশেষ দিন গুলো তে বাবা মার হাত ধরে ঘুরতে যাওয়ার একমাত্র জায়গা। মাটির বাঘ, হরিণ বানানো আর তার মধ্যে মরিচ বাতি জ্বালানো বাগানে খেলাধুলা দৌড়াদৌড়ির স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় আমার পুরো ছেলেবেলা। এটা ক্লাস টু কি থ্রির কথা বলছি। সাল টা ১৯৯২ কি ১৯৯৩। এরপর একটু বড় হলে ১৯৯৪ সালের দিকে আমাদের শহরে গড়ে উঠলো “কারুপল্লি”। আমার মনে হয়না, ওই সময় এমন কোন মানুষ ছিল না  যারা, একবার হলেও কারুপল্লি ঘুরতে যায়নি বগুড়ায়। আদিম মানুষের আজব গুহা ছিল আমাদের কাছে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার এক অন্য নাম। বিশাল বিশাল হাতি, জিরাফ, ঘোড়া, হা করা বাঘ, বক পাখি, শাপলা পুকুর,চিড়িয়াখানা পুকুর ভরে মাছ… এ যেন এক জীবন্ত চিড়িয়াখানা। শিল্পী আমিনুল ইসলাম এর কারুশিল্পের ছোঁয়ায় এটা ছিল এক অন্য রকম ভিন্ন স্বাদের ভুবন। আমাদের ওই বয়সে ঢাকা শহর টা ছিল পুরোই এক স্বপ্নের ভুবন। বছরে একবার কি দুবার আসা হত এই ঢাকায়। আর ঢাকায় আসলেই ছোটবেলার মুল আকর্ষণ ছিল শিশু পার্ক আর চিড়িয়াখানা। বগুড়া কারুপল্লি ছিল আমাদের কাছে সেই শিশু পার্ক আর চিড়িয়াখানার অন্য নাম।

bogra-2আস্তে আস্তে বড় হতে থাকলাম। আমাদের বিনোদন আর আড্ডার জায়গা গুলোও বদলাতে শুরু হল। করতোয়া নদীর পাড় আর তার পাশেই এস পি ব্রিজ এর ঘাট বা বগুড়া আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ ই হয়ে গেল বিকেল হলেই আড্ডা দিতে যাওয়ার প্রিয় জায়গা। নিজেদের পাড়ার মাঠে খেলার বাইরে এই আলতাফুন্নেছা মাঠ ই হয়ে গেল নিজেকে বড় প্রমাণ করার একমাত্র জায়গা। বেপরোয়া সাইকেল চালিয়ে বাসা থেকে স্যার এর বাড়ির নাম করে কত বিকেল যে খেলে কেটেছে…… হায়রে শৈশব আমার।

আর এই সময়টায় ১৯৯৭ কি ৯৮ সালের দিকে আমাদের শহরে প্রথম এলো ফাস্ট ফুড “ পদ্মা ফুডস” আর “পিজা ইন”। ওরে ৪০ টাকায় একটা বার্গার খাব, এর জন্য ১সপ্তাহ টাকা জমাতাম আমরা। বিশেষ কোন দিন মানেই আমাদের টার্গেট এই ফাস্ট ফুডের দোকান। শহরের টার্গেট লেডিস স্কুল মানেই ছিল “ভি এম” স্কুল। আর পদ্মা ফুডস টা ঠিক এর পাশেই। আর সে জন্যই উঠতি বয়সের শো অফ মানেই “পদ্মা ফুডস” এ একবার হলেও শো ডাউন। হায়রে দুর্দান্ত কৈশোর আমার!!!!!!

এরপর যখন আরও একটু বড় হলাম, স্কুল শেষ করে কলেজে, ২০০২ কি ০৩ এর দিকে। তখন শুরু হল বাইক এ শহর দাপিয়ে বেড়ানো। জলেশ্বরীতলা, মালতিনগর, শিল্পকলার মাঠ, কলনিবাজার, বনানী, ঝাউতলা, আজিজুল হক কলেজ মাঠ, উপশহর, নিশিন্দারা, বাদুরতলা, জহুরুল নগর, পুরান বগুড়া… প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে দল বেঁধে বাইক নিয়ে ঘুরা আর প্রমাণ করা, এই শহরের সবথেকে মাথা চারা দেয়া দুর্দান্ত আমরা।

খুব ছোট বেলা থেকেই সাংস্কৃতিকমনা ছিলাম। শিশু একাডেমী, উচ্চারন একাডেমী, শিল্পকলার সব প্রোগ্রামে অংশ নেয়া টা ছিল একটা নিয়মিত ব্যাপার। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি এসব উদযাপন খুব বড় ভাবেই উদযাপিত হত আমাদের এই শহরে। পহেলা বৈশাখে বগুড়া থিয়েটার এর ৫দিন ব্যাপী বৈশাখী মেলা ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক পাড়ার মুল আকর্ষণ। যেকোনো উৎসব মানেই সংগঠনের ভিন্ন আয়োজন, প্রতিযোগিতা।আর তাতে অংশ নিয়ে পুরস্কার জেতা, আর ওই টুকু শহরে অল্প বয়সেই নিজের পরিচিতি বাড়ানোর এটা ছিল এক দুর্দান্ত মাধ্যম। বড় হয়ে মিডিয়া তে কাজ করার স্বপ্ন টা মুলত এখান থেকেই।

bogra-7কলেজ শেষের পর ২০০৪ থেকে বগুড়া ছাড়া। আর তখন থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলাম প্রাণের শহর কাকে বলে, মাটির টান কি? ধীরে ধীরেই চোখের সামনেই বদলে যেতে লাগলো, আমার নিজের শহর টা। সেই কারুপল্লির জায়গায় এখন ফোর স্টার হোটেল নাজ গার্ডেন হয়েছে, এখন উঠতি বয়সে আর কেউ পাড়ার পুকুরে সাঁতার কাটে না। হোটেল সিয়েস্তার সুইমিং পুল এ যায় সাঁতরাতে। এখন আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ ছেঁড়ে সবাই দৌড়ায় শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম এ। এখন আকবরিয়া হোটেল এর বিরানি ছেঁড়ে সবাই দৌড়ায় জলেশ্বরীতলার বারবিকিউ আর চাইনিজ রেস্টুরেন্ট গুলোতে।এখন দৈনন্দিন বাজার করতে অভিজাত শ্রেণী ফতেহ আলি বাজার ছেড়ে টাচ এন্ড টেক এ ভিড় জমায়। আধুনিকতার পুরো আয়োজন এ স্বয়ংসম্পূর্ণ এখন আমার শহর।

অতীতে মানুষ বলত মোহাম্মাদ আলীর বগুড়া। আর এখন বিশ্ব চিনে মুশফিকুর রহিমের বগুড়া। সময়ের পরিবর্তনে আমার শহর পিছিয়ে পড়েনি। বরং আগের মতই গৌরবোজ্জ্বল, এটা দেখতেই ভালো লাগে।

বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরির পর এখন ঢাকা থেকে বগুড়া মাত্র ৪/৫ ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। এক দিনের প্ল্যানিং এ ঢাকা থেকে একটু দূরে ঘুরে আসার এক চমৎকার জায়গা আমার শহর। আর বগুড়া গেলে অবশ্যই দই আর কাঁচা মরিচের ঝাল খেয়ে আসতে ভুলবেন না কেউ। আর সময় পেলে মহাস্থান, প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন, বেহুলা লখিন্দর এর বাসর ঘর, গোবিন্দ মন্দির আর মশলা গবেষণা কেন্দ্র ঘুরে আসতে পারেন। সেই সঙ্গে বগুড়া নওয়াব প্যালেস ঘুরলে এক নিমিষেই জেনে নিতে পারেন অতীত গৌরব এর এক অপূর্ব আয়োজন।

সেই সঙ্গে ঢাকার বাইরেও আরেক ঢাকা শহরের পুরো আমেজ টাই পাবেন আপনি এই শহরে। শুধু এই শহরে খরচ এখন ও হাতের নাগালে, আর এখানে এত জ্যাম নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় আটকে থাকার বিড়ম্বনা নেই।

এক টুকরো সবুজে বেঁচে থাকার সব টুকু আয়োজন আমার প্রাণের শহর, নিজের শহর বগুড়া।