মনেপড়ে প্রথম লন্ডন

শামীম আজাদ

শামীম আজাদ

(ইংল্যান্ড থেকে) মনেপড়ে প্রথম লন্ডন আসার দিন ঢাকা এয়ারপোর্টের দিকে যাবার কথা। আজাদ বিটিসির টিয়েরঙা ডাটসন গাড়ী চালাচ্ছে। আমি যে লন্ডন বেড়াতে চলে যাচ্ছি প্রায় ছ’মাসের জন্য সেটা তার ভাল লাগছেনা। মুখটা গম্ভীর করে গাড়ি চালাচ্ছে। শিশু ঈশিতা বুঝতেই পারছে না প্লেনে উঠার পর সে একটা লম্বা সময় ধরে বাবাকে দেখতে পারবেনা। এটা ভেবে আমার ও কষ্ট হচ্ছে। তার চেয়ে নার্ভাস লাগছে বেশী। একটি ছোট বাচ্চা নিয়ে একা একা এতটা পথ যাবো। কিছুদিন আগেই আম্মা – আব্বা ঘুরে এসেছেন। আমার তিন মামার পরিবার ও আমার ভাইয়া, বুজান, শোয়েবও এখন লন্ডনে। চাচাতো বোন বড় বুজান, সাল্মা আপা, রোখাসানাও সেখানে। যা অবস্থা মনে হয় যেনো সিলেটের চেয়ে বেশী আত্মীয় লন্ডনেই।
ভাইরা দিনে কলেজ করে আর রাতে ভগ্নীপতির পাল্মার্সগ্রীন এনফিল্ডের রেস্তোঁরায় কাজ করে। ওরা কি কি যে করে, আর সেখানে কি কি সব মজার মজার কান্ড হয় সেসব এখন নিজের চোখেই দেখবো। বিলেতে এই বানিজ্য এক পারিবারিক ব্যাপার। ওদের কথা শুনে মনে হয় মহা মজায় আছে। পাপাডাম আর বোম্বেডাক আসলে পাপড় আর লইট্টা সুটকী। সেগুলোই নাকি স্টার্টার। শুক্রবারে অনেকেইশামীম আজাদ333 পাব থেকে বেড়িয়ে ঝাল কারী, চিকেন তন্দুরী খেতে আসে আর মাতলামো করে। আমার খুব মাতাল দেখার ইচ্ছা। আমার খুব ট্রাফেল্গার স্কোয়ারে চুল ছেড়ে দৌড়ে দৌড়ে কবুতরের সঙ্গে ছবি উঠতে ইচ্ছে করে। টার্ণপাইক লেনের আন্ডার গ্রাউন্ড ষ্টেশনের অটোমেটিক ফটোতোলার বুথে এক পাউন্ড দিয়ে একসঙ্গে চার ভঙ্গি করে ছবি তুলতে ইচ্ছে করে। এবার সব হবে। আমি বিবিসি বাংলা বিভাগেও শ্যামল লোদ আর সিরাজুর রহমানের সঙ্গে কাজও করবো। মাই ড্রিমস আর কামিং ট্রু।
কাল রাতে সোবানবাগে আম্মা আব্বার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসেছি। আমমা তার ভাইদের ও নিজের ছেলেমেয়েদের জন্য পনীর, পুইশাক, পটল, লত্তি, ফজলী আম, ঈলিশ মাছ ভাজা ও গরুর মাংস ভূণা দিয়েছেন। সবই পলিথিনের পর পলিথিনে পেঁচিয়ে নিউমার্কেট থেকে কেনা বেতের খাঁচিতে ভরে উপরে চটকেটে ভম্বল মার্কা সূঁচে সেলাই করে দিয়েছেন। আমি সিল্ক শাড়ি আর ব্লক প্রিন্ট সূতি শাড়ি নিয়েছি। ঈশিতার জন্য তেমন কিছু না। গিয়েই বিলেতি জামা কাপড় কিনে নেবো। ইতোমধ্যে বুজান দু’একটা কিনেও রেখেছেন। ওর যমজ দুই ছেলে। ওদের ছোট হয়ে যাওয়া জামাও পরতে পারবে।
গুলশান দু’নম্বরের রাউন্ড এবাউট টা পেরুতেই দেখি আজাদ ডান হাতে স্টিয়ারিং ধরে রেখে বাঁহাত দিয়ে কোঙ্নক্রমে পেছনের দু’সিটের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশিতাকে আদর করছে। জানালা দিয়ে আসা বাতাসে ঈশিতার কপালের সিল্কি ফ্রিঞ্জ সরে গেছে। আজাদ ওভাবেই সেগুলো টেনে সামনে আনার চেষ্টা করছে। বুঝলাম তার অনেক কষ্ট হচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে আমার আগের সব স্বার্থপর চিন্তা চলে গিয়ে ওর জন্য কষ্ট হতে লাগলো।
আমরা দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। আমার খুব ইচ্ছা ও আমার গালেও একটু স্পর্শ করুক। সে করলো না। আমি একটু রেগেই ফিসফিসিয়ে বললাম। তুমি লক্ষ্য করেছো, আমরা বাঙালিরা সন্তানের সামনে ঝগড়াটা ঠিকই করি কিন্তু ভালবাসাটা দেখাই না। সে আবার হাসলো। আমি আরো রাগতে থাকলাম।
কি? কি আবার বিদায়ের সময় আমাকে যদি তুমি অনাত্মীয় মহিলার মত টা টা করো তাইলে দেখো…
মানে? ঠিক চেকিং এ ঢোকার সময় চুমু দবে।
মাথা খারাপ! আজাদ আঁৎকে উঠলো। এয়ার পোর্টে এত লোকের সামনে কি করে এটা সম্ভব?
কেন সম্ভব না? নিজের বৌ’র সঙ্গে অনেক দিন দেখা হবে না।
না না ছি! এবার আমি হাসতে হাসতে বলি, আরে ভাই ঠোঁটে না গালে চুমু… গালে…। নিষ্পাপ, নিখাঁদ!!
বেচারা সেবার সত্যি গেট দিয়ে যখন আমি ঈশিতাকে কোলে করে ঢুকতে যাবো সে মেয়েকে চুমু দিয়ে চোরের মত আমার গালে ওর মুখটা ছুঁয়েই উঠিয়ে নিয়েছিলো। তারপর আমি হেসে প্লেনের দিকে এগুতে থাকি। কিন্তু মেয়ে যখন দেখলো সে আর আসছে না। তখন বাবা বাবা করে কান্না শুরু করেদিলো। এবং সেভাবেই আমরা প্লেনে প্রবেশ করলাম।
( ক’দিন হল শুধু ফেলে আসা মিষ্টি দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে)।