বাঙালী খানাপিনা

istiak

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

ইদানীং খুব কষ্টে আছি। খাওয়ার কষ্ট এবং না খাওয়ার কষ্ট। খেলে কষ্ট লাগে কারন ভূড়ি বেড়ে যাচ্ছে আবার না খেলে মনে কষ্ট লাগে। ইস! এত সুন্দর একটা খাবার চোখের সামনে থেকে এমনি এমনি চলে যাবে, একবার চেখেও দেখবো না? বাঙালী হয়ে যখন জন্মেছি, তখন খাওয়া ছাড়া বাঁচি কি করে? আমাদের জন্মের পরে খাওয়ার আয়োজন করা হয়, মৃত্যুর পরেও খাওয়ার আয়োজন করা হয়। অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত খাওয়াই আমাদের জীবন। প্রথমবার মুখে অন্নপ্রাশন থেকে শুরু করে বছর বছর জন্মদিন, স্কুলের পরীক্ষায় পাস করলে খাওয়া (বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে মাঝে মাঝে ফেল করলেও খাওয়াতে হয়), বিয়ের সময় খাওয়ার, বিয়ের পরেও শ্বশুরবাড়িতে খাওয়া, ম্যারিজ অ্যানিভার্সারিতে খাওয়া( কেউ কেউ আজকাল ডিভোর্স হলেও পার্টি দেয়), নতুন চাকরী পেলে খাওয়া। মানে জীবনভর শুধু খাওয়া আর খাওয়া। এর মধ্যে আমি না খেয়ে ভূড়ি কমাই কি করে? এদিকে না খেলে আবার মায়ের কথা শুনতে হয়, না খেতে পারলে নাকি শ্বশুরগৃহে দাম পাওয়া যায়না। যে জামাই যত খেতে পারবে, সে ততো খানদানী বংশের ছেলে। নতুন জামাইদের পাতে বড় রুই মাছে মাথা দেয়া হয়। এখন ব্যাপার হচ্ছে আমি তো মাছই খাইনা (ইলিশ ছাড়া) তাহলে আমাকে কি এই সমাজ মেনে নেবে? আমাকে কি কোন মেয়ে বিয়ে করবে? এদিকে এখন আবার শীতকাল। খাওয়ার লোভ আর কত সামলে রাখা যায়? বাজারের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এত সব রঙিন তরিতরকারি চোখে পড়ে, মনে হয় কাঁচা খেয়ে ফেলি। সন্ধ্যায় রাস্তার পাশে যখন ভাপা পিঠার গন্ধ এসে নাকে লাগে, তখন মনে হয় রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে বসে পড়ি গরমাগরম পিঠা খাওয়ার জন্য। যেদিন দুপুরে চিন্তা করি আজ ভাত একটু কম করে খাব সেদিনই দেখি বাসায় মেহমান এসেছে। অতএব ভালোমন্দের আয়োজন। আবার আমার ডায়েট কন্ট্রোলের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বাড়িতে যেদিন সাদামাটা রান্না হয়, সেদিনই পাশের কোন বাড়ি থেকে ভেসে আসে পোলাও এর সুগন্ধ! নিজের মনকে কত বোঝাই যে চুরি করা মহাপাপ, তারপরেও ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে প্রতিদিনই ফ্রিজে পায়েস বা মিষ্টি জাতীয় কিছু রেখে দেয়া হয়। রাতের বেলা এত নীতিবাক্য কে মেনে চলবে? কথায়ই তো আছে, চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী!food0 সন্ধ্যার পর এখন এমনিতেই অল্প অল্প শীত লাগে, এর মধ্যেই সেদিন দেখি কালি মন্দিরের গেটের সামনে গরম গরম গুড়ের জিলাপি ভাজছে। ঐদিক দিয়েই রোজ সন্ধ্যায় আড্ডা দিতে যাই। মাথা ঠিক থাকে? আর যদি কারো বাসায় বেড়াতে যাওয়া হয়, তাহলে তো কথাই নেই। বাংলাদেশের মানুষ মেহমানকে খাওয়াতে খুব পছন্দ করে, কিন্তু আরো বেশি পছন্দ করে গলা পর্যন্ত খাওয়ানোর পর অতিথির শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে দিতে। আমি গ্রামের বিয়েতে কনে পক্ষকে এমনও বলতে শুনেছি, ‘ঐ গফুর, বেশি কইরা ভাত দিবি সবাইরে। এত বেশি দিবি যাতে পুরা ভাত শেষ কইরা কেউ উঠতে না পারে….পরে কইবো খাওয়ায় নাই’! কথা সত্য। “ঠিক মত খাওয়াইলোনা ক্যান? আমগো বাড়িতে এত আইটেম ছিল, এইখানে কম আইটেম ক্যান….করমু না বিয়া এইখানে” এই সব কথা বলে গ্রামদেশে বিয়েবাড়িতে গোলমাল করার দৃশ্য অহরহ চোখে পড়বে। যাই হোক, ডায়েটিং করা কিন্তু সহজ কোন ব্যাপার না। রীতিমত মনের সঙ্গে এবং শরীরের সঙ্গে যুদ্ধ করা লাগে। এই সংযম ধরে রাখা চারিত্রিক সংযমের চাইতেও কঠিন। চারিত্রিক সংযম ধরে রাখতে না পারলে লোকলজ্জার ভয় আর খাবারের ব্যাপারে সংযম ধরে রাখলেই বরং লোকলজ্জার ভয়! এর বাড়িতে বোধহয় খাওয়া দাওয়ার রীতিনীতি নাই!! খাওইন্না বংশের পোলা না!! এই অপবাদ যাতে গায়ে না লাগে তার জন্য আমি এখন বগলে নিউজ পেপার নিয়ে ঘুরি। পত্রিকা খুললেই দেখা যায় ফলমূল, সবজি,মাছ সব কিছুতে ফরমালিন দেয়া, আবার ডাক্তাররা না করে এটা খাবেন না এই হবে, সেটা খাবেন না সেই হবে। খাবার নিয়ে কেউ খোঁটা দেয়ার চেষ্টা করলেই মুখের সামনে পত্রিকা মেলে ধরি। নিজেও একটু কন্ট্রোল করার চেষ্টা করি। কিন্তু কতক্ষন? আজকে এই লেখা লিখছি, কাল সন্ধ্যায় তো আবার সেই কালি মন্দিরের সামনের রাস্তায় হাঁটতে হবে। আবারো সেই গুড়ের গরম জিলাপি। যে লোকটা জিলাপি ভাজে তার চোখেমুখে অবশ্য কোন কথা নেই। নির্বিকার জিলাপি ভেজেই চলেছে, ভেজেই চলেছে। নাহ, এরপর দেখা হলে একবার জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘আপনি ভালো আছেন তো?’