কলকাতার কাছেই

সাগর চৌধুরী

কলকাতা থেকে : রেলপথে বা সড়কপথে ঘন্টা দুই-আড়াই দুরত্বে এমন বেশ কয়েকটা মাঝারি বা ছোটখাটো শহর-গ্রাম আছে যেগুলি এক দিনের বেড়ানোর জন্য আদর্শ। অর্থাৎ সকালে রওনা হয়ে সন্ধ্যার দিকে স্বচ্ছন্দে ফিরে আসা যায়, না চাইলে রাত কাটানোর প্রয়োজন হয় না। যেমন ডায়মন্ড হারবার, যেখান থেকে সমুদ্র খুব কাছে; অথবা পর্তুগীজদের পত্তন করা শহর ব্যান্ডেল, যেখানে গঙ্গার তীরে মনোরম পরিবেশে দাঁড়িয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে পুরানো রোমান ক্যাথলিক গির্জা; কিংবা প্রতিবেশী শহর হুগলি যেখানে আছে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী হাজি মহম্মদ মহ্সিনের প্রতিষ্ঠিত মহ্সিন কলেজ, যা বর্তমানেও ঐ অঞ্চলের একটি প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এবং ঐ সময়েই তৈরী ইমামবাড়া, গঙ্গার তীরেই; এককালের ফরাসী উপনিবেশ চন্দননগরও পাশেই, সেই সময় থেকেই ফরাসী নাগরিকত্বের অধিকারী একাধিক বাঙালি পরিবার আজও এই শহরের বাসিন্দা, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁরা ভোটও দেন। তবে ব্যান্ডেল-হুগলি-চন্দননগরের মতো অতটা প্রাচীন ইতিহাসসমৃদ্ধ না হলেও অন্যান্য কারণে গুরুত্বপূর্ণ আরো যে কয়েকটি নাতিবৃহৎ জনপদ আছে কলকাতার আশেপাশেই, তাদের মধ্যে একটির আকর্ষণ তো সাহিত্য অনুরাগী বাঙালিদের কাছে যথেষ্টই।

শরৎচন্দ্র

শরৎচন্দ্র কুঠির প্রাঙ্গনে তাঁর আবক্ষ মূর্তি

এ বছরের দুর্গাপূজার পর পরই আমাদের কাছে বেড়াতে এসেছিল বয়ঃকনিষ্ঠ ভ্রাতা-ভগ্নীপ্রতিম এক বিলেতপ্রবাসী দম্পতি ও তাদের সদ্য কৈশোরে পা রাখা পুত্র। তাদের নিয়ে ঘোরাঘুরির ফাঁকে প্রস্তাব দিলাম, ‘চলো, সারা দিনের জন্য দেউলটি থেকে ঘুরে আসি।’ দেউলটিতে দেখার মতো কী আছে, তাদের এই প্রশ্নের উত্তর শোনামাত্রই তারা সোৎসাহে রাজি হয়ে গেল। আর রাজি হবে নাই বা কেন, কলকাতা থেকে বাষট্টি-তেষট্টি কিলোমিটার দূরত্বে হাওড়া জেলার এই ছোট্ট শহরটির গা-ঘেঁষা ‘সামতা’ (বা ‘সামতাবেড়’) গ্রামেই রয়েছে বাংলা ভাষার অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বসতবাড়ি, রূপনারায়ণ নদের তীরে। স্থানীয় এলাকায় ‘শরৎচন্দ্র কুঠি’ নামে পরিচিত এই বাড়িতে তিনি আমৃত্যু, জীবনের শেষ এগারো বছর, বাস করেছিলেন, এবং এই বাড়িতে বসেই রচনা করেছিলেন অভাগীর স্বর্গ, কমল লতা, শেষ প্রশ্ন, রামের সুমতি, পথের দাবি, মহেশ, পল্লী সমাজ ইত্যাদি কালজয়ী গল্প-উপন্যাস। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে, পল্লী সমাজ উপন্যাসটিতে একটি পুষ্করিণীর উল্লেখ আছে, যেটাতে বাস করতো কার্তিক আর গণেশ নামে এক জোড়া বৃহদাকার রুই বা কাতলা মাছ। এই পুষ্করিণীটি সত্যিই ছিল এবং এখনও রয়েছে সামতা গ্রামে শরৎচন্দ্রের বাড়ির ঠিক সামনে।
আমরা জানি যে বেশ অল্প বয়সেই শরৎচন্দ্র ভাগ্যান্নেষণে পাড়ি দিয়েছিলেন বর্মায় (বর্তমানে ‘মায়ানমার’)। সেখানে বিশ বছরেরও বেশী সময় তিনি চাকরি করেছেন, প্রথমে বর্মা রেইলওয়েজ-এর অধীনে, তারপর অন্য একটা সরকারী দফ্তরে। রেঙ্গুন (বা ‘ইয়াঙ্গন’) শহরে বাস করার সময়ে তাঁর প্রথম পত্নী শান্তির এবং একমাত্র পুত্রসন্তানের প্লেগ রোগে মৃত্যুর পর শরৎচন্দ্র আবারও বিবাহ করেছিলেন মোক্ষদাকে, যাঁর নতুন নাম তিনি দিয়েছিলেন হিরন্ময়ী। হিরন্ময়ীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ভারতে ফিরে আসেন ১৯১৬ সালে এবং হাওড়ার ‘বাজে শিবপুর’ এলাকায় ভাড়া বাড়িতে সংসার পাতেন। এই বাড়িতে তাঁর অতি প্রিয় পোষ্য ছিল ভেলু নামে একটি কুকুর, যার কথা শরৎচন্দ্রের একাধিক লেখায় আছে।

fb_img_1478772250502

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সমাধি

বছর দশেক পরে তিনি সামতা গ্রামে রূপনারায়ণের তীরের দোতলা বাড়িটি নির্মাণ করেন রেঙ্গুনের শহরতলীর বসতবাড়ির নক্শার আদলে এবং স্থায়ীভাবে সেখানে বাস করতে শুরু করেন। এই বাড়িতেই ১৯৩৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয় কর্কট রোগে। হিরন্ময়ী এর পরেও আরো তেইশ বছর জীবিত ছিলেন। ১৯৭৮ সালে শরৎচন্দ্র কুঠি বন্যায় বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর হাওড়া জেলা পরিষদের উদ্যোগে তার মেরামত ও ব্যাপক সংস্কারসাধন করা হয়। বছর চোদ্দ-পনেরো আগে, সম্প্রতিই বলা চলে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাড়িটিকে ‘হেরিটেজ সাইট’ বা অবশ্য সংরক্ষণযোগ্য ঐতিহাসিক ভবনের মর্যাদা প্রদান করেছে। বাড়িটি এখন একটা ছোটখাটো মিউজিয়ামের মতো করে সাজানো, শরৎচন্দ্র জীবিত থাকাকালীন তার ঘরদোরের চেহারা যেমন ছিল এখনও তেমনই রাখা আছে।

শরৎচন্দ্র

সামতায় শরৎচন্দ্রের বাড়ির একতলায় তাঁর লেখাপড়ার ঘর

তাঁর ব্যবহৃত নানা রকম জিনিষপত্র, যেমন লেখার টেবিল-চেয়ার-কলমদানি, বইপত্রের আলমারি, স্থানীয় নিবিত্ত লোকজনের চিকিৎসার জন্য হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শিশিবোতল, তাঁর হাতের বাঁশের লাঠি, ধূমপানের গড়গড়া, শয়নকক্ষের আসবাব ইত্যাদি মোটামুটি যতেœর সঙ্গেই সংরক্ষিত। এখন বাড়ির পাঁচিলে প্রবেশপথের পাশে বসানো ফলকে লেখা ‘শরৎ-স্মৃতি-মন্দির’, যদিও ‘শরৎচন্দ্র কুঠি’ নামটাই গ্রামের লোকজনের বেশী পছন্দ মনে হয়। তবে ‘হেরিটেজ সাইট’ হওয়া সত্ত্বেও বাঙালির পরমপ্রিয় এই কথাশিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি উপযুক্তভাবে সংরক্ষণের ব্যয়নির্বাহে সরকারী অবদান কতটা তা বোঝা গেল না কারণ স্থানীয় যে ব্যক্তির হাতে এই বাড়ির দৈনন্দিন দেখাশোনার ভার, তাঁর কাছ থেকে শুনলাম যে বর্তমানে বাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের খরচ প্রধানত যোগান দেন শরৎচন্দ্রের কনিষ্ঠ ভ্রাতার প্রপৌত্র। প্রসঙ্গত, শরৎচন্দ্রের এই ভাই যিনি পেশায় চিকিৎসক ছিলেন পরিণত বয়সে স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত বেলুড় মঠে যোগ দিয়েছিলেন, তখন থেকে তাঁর নাম হয় স্বামী বেদানন্দ। শরৎচন্দ্র জাতপাত মানতেন না, হিন্দুধর্ম অনুসারে পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মে তাঁর তেমন বিশ্বাসও ছিল না। তাঁর ইচ্ছানুসারেই তাঁর মরদেহ বাড়ির প্রাঙ্গনের একটা অংশে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। ভাই বেদানন্দ তো সন্ন্যাসী ছিলেন, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দেহও সমাধিস্থ করা হয়, শরৎচন্দ্রের পাশেই।

‘শরৎ-স্মৃতি-মন্দির’ বা ‘শরৎচন্দ্র কুঠি’র প্রাঙ্গনে প্রবেশপথের পাশে বসানো ফলকের কথা বলছিলাম একটু আগে।

fb_img_1478772189533

বাড়ির পুকুরঘাট

একটি ফলকে বাড়ির নামের নিচে উৎকীর্ণ ‘মহেশ’ গল্পটির শেষ অনুচ্ছেদে গফুরের আকুল আর্তির কয়েকটি পংক্তি: ‘‘আল্লা, আমাকে যত খুশি সাজা দিয়ো, কিন্তু মহেশ আমার তেষ্টা নিয়ে মরেছে, তার চরে খাবার এতটুকু জমি কেউ রাখেনি। যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি, তার কসুর তুমি যেন কখনো মাপ করোনা।’’ অন্য পাশের ফলকটিতেও শরৎচন্দ্রের আরেকটি রচনা থেকে উদ্ধৃতি লেখা আছে।
খুবই উপভোগ করেছিলাম আমরা এক দিনের এই সংক্ষিপ্ত সফর। আরো যা ভালো লাগলো তা হলো যে দেউলটি বা সামতাকে শরৎচন্দ্র তাঁর জীবনসায়াহ্নের নিবাস নির্বাচন করায় এই অঞ্চলের সাধারণ বাসিন্দাদের মনে একটা প্রচ্ছন্ন গর্বের ভাব আছে, যেটা তাঁদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়।

লেখকঃ বিবিসি’র সাবেক বিশিষ্ট সাংবাদিক