এগারটি আফগান লান্দে

এই এগারটি আফগান লান্দে অনুবাদ করেছেন রায়হান শরীফ। ইংরেজী সাহিত্য ও কালচারাল স্টাডিজ এর অধ্যাপনা করেছেন টানা সাত বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গবেষণারত।

 

 

 

 

১.

অন্তহীন এই নির্বাসন  হৃদয়কে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে

হে খোদা ফিরিয়ে নিয়ে চল  উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে।

বসন্ত এলো।  এখানে গাছে গাছে গজাচ্ছে কচি পাতা।pranerbangla

কিন্তু হায় আমার দেশের পত্র-পল্লব শত্রুর বুলেটে ক্ষতবিক্ষত।

বন্ধুরা, বলতে পারো কোনটা বেছে নেব আমি?

বিলাপ আর নির্বাসন উভয়েই আজ আমার দুয়ারে।

হে বোনেরা! নেকাব কোমরে

রাইফেল তোল, যুদ্ধে চল।

বুকের ঠিক মাঝ বরাবর যদি কোন ক্ষত না দেখি তোমার

পিঠ ছাকনির মত ঝাঝরা হলেও  কিছু যায় আসে না আমার।

যদি আমায় সত্যিই ভালবাসো, আমাদের দেশটাকে মুক্ত কর

বিনিময়ে আমার অনিন্দ্য সুন্দর মুখ পেয়ে যাবে তুমি চিরতরে।

যদি না-ই জানো কি করে ভালবাসতে হয়pranerbangla

তবে কেন জাগালে এ সুপ্ত হৃদয়?

মধ্যরাত হয়ে এলো, তবু তুমি এখনো এলে না।

আমার কম্বল, সারা দেহ  দুটিই জ্বলছে আগুনে।

এসো আমার, প্রিয়তম, জড়াও তোমার আলিঙ্গনে

আইভি ফুলের মতই ঠুনকো আমি, আমার শরত এলো বলে।

১০

যুদ্ধবিমুখ ছোট বিভীষিকা আমার পাশে পড়ে থাকে গুটিশুটি মেরে।

আমার বিছানায় শোবার অধিকার তার-ই যে দেশের জন্য মরতে প্রস্তুত।

১১

ছোট বিভীষিকা কিসসু জানে না- না জানে প্রেম, না জানে যুদ্ধ

রাতের বেলা পেট ভরে গেলেই নাক ডেকে ঘুম!

 

কৈফিয়তঃ 

এই লান্দেগুলোর প্রথম তিনটি ১-৩ নির্বাসন, ৪-৬ যুদ্ধ, ৭-৯ প্রেম এবং ১০-১১ ছোট বিভীষিকা নিয়ে। এই চার বিষয় মূলত আফগান লান্দের উপজীব্য।

লান্দে পশতু ভাষায় রচিত দু’ লাইনের আফগান কবিতা। “লান্দে”র আক্ষরিক অর্থ “ছোট, বিষধর সাপ”; কবিতাগুলো পড়লে মনে হয় এই নাম যথার্থ।

লান্দে  মৌখিক সাহিত্য ধারায় রচিত এবং এদের রচয়িতা সুনির্দিষ্ট নয়। তবে আফগান সাধারণ নারীরা তাদের প্রতিদিনের জীবনের চালচিত্রঃ তাদের সুখ, দুঃখ, হাসি, বেদনা, মনের গভীরে জমা বিষণ্ণতা, হতাশাবোধ এসবই মুখে মুখে বেঁধে ফেলেন লান্দের নিপাট গাঁথুনিতেঃ প্রথম লাইনে নয় মাত্রা, দ্বিতীয় বা শেষ লাইনে তের মাত্রা –এই হল কাঠামো। জাপানী হাইকুর মত নিপাট। তবে আমি অনুবাদ করতে গিয়ে এই কাঠামো রক্ষা করিনি । খেয়াল করেছি কিভাবে এগুলোর ভেতরকার প্রাণরস টুকু তুলে ধরা যায়।

আফগান নারীরা খুবই কর্মঠ। ছেলেরা মূলত থাকে মসজিদে, গ্রাম্য জমায়েত খানায়, না হলে যুদ্ধে আর মেয়েরা ফসল ফলানো থেকে খাবার পরিবেশন, দূরের ঝর্ণা থেকে পানি আনাসহ ঘর- গৃহস্থালীর সব কাজে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খেটে মরে।

কট্টর আফগান সমাজে প্রেম মানেই মৃত্যু। নারীদের বিয়ের নামে কেনাবেচা হয়। তাদের বর হয়তো শিশু না হলে কোন বয়োবৃদ্ধ- এই হল সাধারণ চল। এই শিশু বা বৃদ্ধ স্বামীকেই তারা বলে ছোট বিভীষিকা।