স্মৃতির শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া

আব্দুল বাছির দুলাল

আব্দুল বাছির দুলাল

কোন সবুজঘেরা পাহাড় বেষ্টিত ঝর্ণা ধারার মধ্য দিয়ে আমার শহরের জন্ম নয়। কোন সাগরের কোলাহল নেই এই শহরের আদ্য অথবা প্রান্তরে। তিতাস বিধৌত শান্ত, স্নিগ্ধভরা, সেতারের সুর ধারার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি আমার শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ছিমছাম এই ছোট্ট শহরেই আমার জন্ম। এখানে এক সময় ভোর হতো উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সেতারের সুর মূর্ছনায়। সংস্কৃতির পাদপিঠ এই শহরেই জন্ম গ্রহণ করেছলিনে তিতাস একটি নদীর নামের রচয়িতা অদ্বৈত মল্ল বর্মণ। এই শহরের পাশেই জন্ম শহীদ ধীরেন্দ্রনাথের। পুরোটা শহর বেষ্টিত তিতাস নদীর আবেগ আর ভালবাসায়। সে নদীর পাশে মন খারাপ নিয়ে বসে থাকলে নিমিষেই ভাল হয়ে যায় মন। কতদিন কতবার যে এই নদীর পাশে বসে সময় কাটিয়েছি তা হয়তো আজ হিসেব করে বলা যাবে না। মোটকথা তিতাসই আমার প্রথম প্রেম।

এই শহরের পরম মমতায় আমার বেড়ে ওঠা, আমার প্রথম কথা বলা এই শহরেই। বাবা চাকুরিসূত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাদুঘরে মাইক্রোওয়েভ স্টেশন এসেছেন সেই কবে। দিন ক্ষণ তারিখ আমার জানা নইে। শুনেছি আমার জন্মেরও অনেক আগে এখানে । আমার জন্ম ১৯৮৪ সালের আগস্ট মাস।সেই থেকে আজ অবদি এই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই। এই শহরের টানেই আমার পরিবারের আর যা107236993ওয়া হয়নি পৈতৃক ভিটা নারায়ণগঞ্জে। যেহেতু জন্ম আমার এখানে তাই আমার জন্মভিটাও এই শহরে। একটি কোলাহল মুক্ত পরিবেশ নিয়ে আমার এই শহর দেখা ও চিনতে শেখা। কাউতলিতে শহীদ লুৎফুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ইে আমার লেখাপড়ার শুরু আর শেষটা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে। নানা স্মৃতি আর ভালবাসায় ভরপুর আমার এই শহর । শৈশবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঢোকার পথে বরকত মিয়ার আইসক্রিমের লোভ এখনও তাড়া করে বেড়ায়। আর কুরুলিয়া ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে খালে গোসল করা, বন্ধুদের সঙ্গে ভাদুঘরের ঐতিহ্যবাহী বান্নীতে ঘুরাঘুরি আর দেবদেবী কেনা সইে সঙ্গে তুকমাইয়ের সরবত খাওয়া, যা আজ অব্দি চলে আসছে এই বান্নিতে। সময় গড়ায় আর শহরের চাকচিক্য বাড়তে থাকে। ভাদুঘরের বাতাস আর ভালবাসায় যখন শৈশব পেরিয়ে কৈশোর তখন এই শহরের সম্পর্কে জানতে পারি নানা বিষয়। এই শহরের এক সময় ছিল সংস্কৃতির রাজধানী। ফজরের নামাজের পর বিভিন্ন বাড়ি থেকে ভেসে আসত সেতার, হারমোনিয়াম আর সুরেলা কন্ঠের রেয়াজ। মুসলিম-হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় এখানের সম্প্রীতি আর ভালবাসা অন্য রকম। এখানে ঈদ ও পূজায় উৎসবের আনন্দ সব সময়ই অন্য রকম। কারণ একে অপরের উৎসবে আমরা যোগ দেই।

মনে পড়ে এই শহরে এক সময় পুতুল নাচ, যাত্রা ও সার্কাসের নানা শো হত। কতবার বকুনি ও মার খেয়েছি এই শো দেখতে যাওয়ার জন্য। যদিও এখন পুতুল নাচ, যাত্রা ও র্সাকাস বিলুপ্তপ্রায়।brahmanbaria-govt-college-32

সংস্কৃতির রাজধানী হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সংস্কৃতির প্রতি একটা টান উপলব্ধি করতে পারি তাই সাংবাদিক মনির হোসেনের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় তিতাস সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিষদের এক আড্ডায় ২০০১ সালে সেই সময় থেকে আজ অব্দি আছি একসঙ্গ। কাজ করে যাচ্ছি সাংস্কৃতিক নানা কর্মকান্ডে। এই সংগঠনের হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি দেশের নানা শহরসহ ভারতের আগরতলা, কলকাতা, গুজরাটের আহমোদাবাদ। ব্রাহ্মণাবাড়িয়া আরেকটি প্রাচীন সংগঠন কবি জয়দুল হোসেনে সাহিত্য একাডেমি। পুরো বাংলাদেশের মফস্বল শহরগুলোতে যে রকম সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড হয় আমার মনে হয় এই শহরে তার চেয়েও বেশি এগিয়ি।এই সংগঠন ছাড়াও রয়েছে বেশ কিছু সংগঠন। রয়েছে তিতাস আবৃত্তি সংগঠন, সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন, জেলা শিল্পকলা একাডেমি। সংগঠনগুলোতে র্চচা হয় আবৃত্তি, সঙ্গীত, নৃত্য ও নাটকের।
শিল্পসংস্কৃতির পাশাপাশি এই শহরে রয়েছে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সাবেরা সোবহান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গভঃ মডেল গালর্স হাই স্কুল, নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ। এসব প্রতিষ্টান থেকেই শিক্ষা লাভ করে দেশের নানা প্রান্তরে কাজ করছেন অনেকেইে।74132492
আবার দেশের প্রখ্যাত ইসলামীচিন্তবিদের জন্মও এই শহরে তার মধ্যে অন্যতম ফখরে বাঙ্গাল হযরত তাজুল ইসলামের। যার সমাধি রয়েছে ভারত উপমহাদেশের অন্যতম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইউনুছিয়ায়।

ছোট ছোট বিল্ডিং আর টিনের ঘরে মোড়া ছিল এক সময় এই শহর আর আজ সখোনে গড়ে উঠছে সুবিশাল উচ্চ বিল্ডিং আর মার্কেট। আর তাই আমি হারিয়েছি আমার শহরের সুন্দর মুখচ্ছবটিা। যেখানে ভালবাসার চেয়ে ব্যবসায়ই বেশি। তিতাসেরও আজ আর নেই সেই রূপ, সেই আবেগ নেই বর্ষার তীব্র স্রোত। এই নদীর পরিচিত কাজলি, ট্যাংরা, পুটি, চিংড়ি, বাইম, ঘাউরা, কালি বাউস, বৈচা, আইড়, বোয়াল মাছ এখন আর জেলেদের জালে ধরা পরে না। অথচ একটা সময় তিতাস পাড়ের আনন্দ বাজারে গিয়ে দেখা মিলত এই মাছগুলোর।

এখনও এই শহরের কয়েকটি মোড়, বাজার, স্থাপনা ও কয়েকটি দোকান রয়েছে যা অনেকে পুরানো ও পরিচিত তার মধ্যে ভাদুঘরের দুধ বাজার ও রেইলগেইট, কাউতলি মোড়, নিয়াজ মুহাম্মদ স্টেডিয়াম, অবকাশ যেখানে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সুন্দর স্মৃতিসৌধ, টি এ রোড, কালিবাড়ি মোড়, ফারুকি বাজার, ফকিরাপুল, মঠের গোড়া, জগতবাজার, খালপাড়, আনন্দবাজার, কুমারশীলমোড়, কালভৈরব মন্দির, আনন্দময়ী কালীবাড়ি। এই জায়গাগুলো সবসময় জমজমাট থাকে লোকসমাগমে। আর এই জায়গাগুলো নিয়েই এখন আমার শহর। দক্ষিণে ভাদুঘর, উত্তরে মেড্ডা, পশ্চিমে গোর্কণঘাট আর পূর্বে কান্দিপাড়া এই ছোট শহর আমার প্রথম ভালবাসা আমার প্রথম কথা বলা।