আমার এ পথ চলাতেই আনন্দ!

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

হামিদ কায়সার

হামিদ কায়সার

ঠিক আধাঘণ্টা আগে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখি বেশ ডাগরডোগর চাঁদ উঠেছে। চোখাচুখি হতেই বললো, ‘কী মামা! ঘরের ভেতর কী করো! বাইরে আসো না! দেখে যাও কী সুন্দর হাওয়া!’
চাঁদের এই ব্যাপারটা খুব ভালো লাগে, এতো বিনয়ী, বললো না যে, আমার জোছনা দেখে যাও, নিজের কথা ও বলতেই চায় না। হাওয়ার ওপর দিয়ে চালিয়ে দিল।
সদর গেট খুলে বাইরে এসেই দেখি, ফুটফুটে জোছনায় একটা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। একটা ঘোড়া শাদা, শাদা মানে কী- যাকে বলে বরফশাদা আর একটা ঘোড়া কালো, একেবারে কুচকুচে কালো। আমাকে দেখেই যেন দুটো ঘোড়াই পর পর পা আছড়ালো, হ্রেষাধ্বনি করে উঠলো।
খুব ইচ্ছে করল ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে। যেই না পাদানিতে পা ফেলতে যাবো, অমনি গাড়ির গেটটা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়, বেশ কঠিন একটা নারীকন্ঠের আওয়াজ আসে, ‘এটা পঞ্চাশের গাড়ি। পঞ্চাশ বছর না হলে কেউ উঠতে পারে না।’
‘আমি তো পঞ্চাশে পৌঁছেই গেছি।’ আকুতির সুরে জানালাম।
‘দেখেতো মনে হচ্ছে না!’ আরো কঠিন গলা।
‘কী মুশকিল! সত্যিই আমি পঞ্চাশে পৌঁছেছি।’
ওপাশের কন্ঠ রুক্ষ, ‘পক্ককেশ কোথায়?’
‘আমি কী জানি!’ আমারও অভিমান!
‘চোখের নিচেও তো ভাঁজ নেই?’
‘আরে বাবা! পঞ্চাশ হলে কি চোখের নিচে একটা ট্রেডমার্ক থাকতেই হবে? এ কেমন কথা?’
আমার কথা ওপাশের নারীকন্ঠকে যেন আরো একটু তাতিয়ে তুললো, ‘নাহ। পঞ্চাশের গাড়িতে তোমাকে কিছুতেই তোলা যাবে না, তোমাকে আর একটু ভারভাত্বিক হতে হবে! এখনও তোমার মধ্যে বেশ চঞ্চল ভাব!’
আমি রেগেমেগে বললাম, ‘ঠিক আছে কালই একটা ভারোত্তলনের যন্ত্র কিনব। ভার উত্তোলন করে ভারবাহী হবো। এখন আমাকে উঠতে দিন গাড়িতে!’ fb_n0ve3
‘নাহ!’ ওপাশে বজ্রকন্ঠ, ‘তুমি এতো বছর ধরে লেখালেখি করছো, একটা পুরস্কার পাওনি, কোনো অর্জন নেই তোমার- পঞ্চাশের গাড়িতে চড়তে ঠিকই অস্থির হয়ে গেছো!’
আমার সমস্ত উৎসাহ দপ করে নিভে যায়। মাথা নিচু হয়ে আসে। আমি টের পাই শরীর কাঁপছে। সত্যিই তো, পঞ্চাশের গাড়িতে চড়তে চাচ্ছি, আমার অর্জন কি আছে? কি আছে প্রাপ্তি?
তারপর নিজের অজান্তেই যেন, আমি টের পাই ঠিক সিনেমার দৃশ্যের মতো, নায়ক মার খেতে খেতে যখন মৃতবৎ হয়ে উঠে, তারপর কোন দৈবের ইশারাতেই যেন অথবা প্রিয় কারোর মন্ত্রণাতেই ধীরে ধীরে জেগে উঠে, উদ্যত হয়, শেষে অগ্রাসী, আমিও অবিকল যেন সেই মতো শির উঁচু করে বলি, ‘আমি যে-পুরস্কার পেয়েছি, সে পুরস্কার লেখালেখি করে আর কেউ পায় নি, কেউ পায়নি, কেউ না!’
‘আমার জানা নেই।’ ওপাশের কন্ঠ খানিকটা নমনীয়।
‘শুনো তাহলে, মফঃস্বল থেকে এসেছিলাম ঢাকা শহরে, কাফকা চিনি না লিটল ম্যাগ চিনি না, দল চিনি না সংঘ জানি না, একা একা নিজের প্রেরণায় লিখি, ঘরে-বাইরে কেউ উৎসাহ দেয় না, উলটো, এ মারতে চায় ও গালি দেয়, প্রথম বই কলকব্জার মানুষ বেরুবার কথা ছিল ১৯৯২ সালে, কয়েকজন মানুষের ষড়যন্ত্রে বইমেলার ঠিক একদিন আগে চরম অপমানের সঙ্গে জানানো হলো, তোমার বই বের হবে না। দিনের পর দিন পড়ে থাকে পাণ্ডুলিপি, হ্যা শুভানুধ্যায়ী বাড়ে, প্রিয়জন কাছে এসে দাঁড়ায় (যথাস্থানে নাম নেওয়া যাবে), তাদেরই চেষ্টায় ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হলো প্রথম বই কলকব্জার মানুষ। সে বইটা নিয়ে রশীদ করীম লিখলেন তার জীবনের শেষ লেখা, যখন উনার চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে এসেছে, যখন তিনি হারিয়েছেন লেখার ক্ষমতা, লিখতে গেলে হাত বিদ্রোহ করে- মস্তিষ্কও, সেই সময়ে তিনি আমার প্রথম বইয়ের প্রশংসা করে দৈনিক সংবাদে লিখলেন, এক নতুন লেখকের কথা! বলো এরচেযে বড় কোন পুরস্কার হয়? বলো এরপর কি আর কোনো পুরস্কারের প্রয়োজন আছে? বলো আছে প্রয়োজন?’
ও পাশের কন্ঠ কোমল আর্দ্র, ‘নাহ! নেই। তুমি উঠে আসো পঞ্চাশের গাড়িতে।’
‘উঠবো?’
‘অবশ্যই। তুমি যে পুরস্কার পেয়েছো, বাকি পঞ্চাশ বছরের জন্যও তোমার কোনো পুরস্কারের দরকার হবে না। তাছাড়া ওসব পুরস্কারের দিকে তাকানোরও প্রয়োজন নেই। যদি পারো ওসব অর্জন ছাড়াই বিদায় নিয়ো এই পৃথিবী থেকে।’
‘নিশ্চয়ই। তুমি আমার মনের কথাই বলেছো।’
’এসো তুমি, চড়ো তোমার পঞ্চাশের গাড়িতে।’
পঞ্চাশের গাড়িতে উঠে চন্দন কাঠের চেয়ারে উপবেশন করলাম। অজানা ফুলের ঘ্রাণে যখন বিমোহিত তখন সেই নারীকন্ঠ রিনরিন করে বেজে উঠল, ‘এই গাড়ি কখনো টানবে শাদা ঘোড়া, আবার কখনো টানবে কালো ঘোড়া আবার কখনো টানবে দুটো ঘোড়া একসঙ্গে আর চালাবে কে জানো?’
‘কে?’
‘তোমার মন তোমার সত্তা।’
আমি ভয় পেয়ে গেলাম! ‘কী বলছেো! আমি পারবো?’
কিন্নরী কন্ঠ অভয় দিল, ‘পারবে না কেনো? আমি আছি না?’
আমি ওর হাতটা ধরতে যাই। খুঁজে পাই না।
পঞ্চাশের গাড়ি চলতে শুরু করেছে। কো্ন্ ঘোড়া ছুটছে জানি না আমি। শাদা না কালো? নাকি দুটো ঘোড়াই? এসব ভাবতে চাই না। কী দরকার ভাবার! আমার যে পথ চলাতেই আনন্দ!