বাংলাদেশ রেলওয়ে: সবুজের হাতছানি

জয়দীপ দে শাপলু

জয়দীপ দে শাপলু

২৬ জুন, বিকেল ৫ টা। বিদায়ের শাঁখ বাজিয়ে ঢাকাগামী সোনার বাংলা যখন দুলকিচালে প্লাটফর্ম ছাড়ছিল, লোকোমাস্টার মজুমদার কাকা তখন হাত নাড়িয়ে জানাচ্ছিলেন আমাদের বিদায় সম্ভাষণ, শেষ বেলার পড়ন্ত সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছিল তখন বগিগুলোর গায়ে, ক্ষণিকের তরে মনে হলো পুরো স্টেশনটা যেন বগিগুলোর গা ঠিকরে আসা সবুজ আলোয় প্লাবিত হয়ে যাচ্ছে। যেন আবার জেগে উঠেছে পুরনো স্টেশনের মৃতপ্রায় প্রাণটা। এক অপার্থিব আলোয় যেন যৌবন ‍ফিরে পেল সে। শুধু চট্টগ্রাম স্টেশন নয়, এ নবযাত্রার কল্যাণে পুরো বাংলাদেশ রেলওয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

কুড়ি বছর রেলপাড়ায় বসে রেলকে দেখেছি। তারপর দূর থেকে আরো দেড় দশক। সেই শৈশবের গমগমে কর্মমুখর রেল অঙ্গন দেখতে দেখতে ঝিমিয়ে গেলো। ওয়ার্কশপের সিটি পড়লে হাজারtrain_2142811 মানুষ একসময় কোলাহল করে কর্মস্থলে ছুটত। এখন যায় পোশাককর্মীরা। রেলপাড়া হয়ে গেছে বিরাট এক অখণ্ড বস্তি।

যুগের পর যুগ রাষ্ট্রযন্ত্রের লাগাতার অবহেলায় ক্ষয়েটে রোগীর মতো দিনে দিনে মিলিয়ে যাচ্ছিল প্রতিষ্ঠানটি। মৃত্যুই যেন ‍তার নির্ঘাত পরিণতি।  রেল-ইঞ্জিন চালান লোকো মাস্টাররা, যাকে সংক্ষেপে  এলএম বলে। ২১ বছর রেলে এলএম নিয়োগ বন্ধ ছিল। চিন্তা করা যায়, একুশ বছর! তার উপর ওই প্রতিষ্ঠান থেকে এক ঝটকায় ১৫-২০ হাজার লোক চাকরি ছেড়ে চলে যায়, প্রতিষ্ঠানটা চলে কি করে! একটা রেলওয়ের বহরে নিয়মিত নতুন ইঞ্জিন ও বগি যুক্ত হওয়া রুটিন ওয়ার্ক। এই লাল সবুজ বগিগুলোর আগে  মিটার গেজের শেষ কনসাইনমেন্ট এসেছিল ২০০৬ সালে। দশ বছর মিটার গেজে নতুন কোন বগি যুক্ত হয়নি! ২৮০০ কিমি বিস্তৃত একটি রেলওয়ের জন্য এটা একটা রেকর্ড বটে।

রেলকে যারা আমরা বুকে ধারণ করি, তারা একসময় হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। খেলায় যখন দলের আর ফেরার কোন সম্ভাবনা থাকে না, সমর্থকরা যেমন গ্যালারি ছেড়ে চলে যায় আরকি। কিন্তু সমর্থকদের মতো ত আর  খেলোয়াড়ের পালাবার সুযোগ নেই।  যেসব লোকগুলোকে আমরা ট্রেনে উঠলেই চোর ছ্যাচর বলে গালি দেই, তারাই পরম মমতায় এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আগলে রেখেছিল এতোদিন। ১৯৫৬ সালের ইঞ্জিন দিয়ে এখনো তারা ট্রেন চালায়। যেখানে একটা ইঞ্জিনের আয়ু ১৫ বছর। আজ যে মজুমদার কাকা সগর্বে নতুন ট্রেনের বগি নিয়ে ছুটছেন  ঢাকার দিকে, উনিই কতবার মাঝপথে থেমে যাওয়া ইঞ্জিনকে তালিজোড়া দিয়ে কোন প্রকারে গন্তব্যে নিয়ে ‍এসেছেন তার কি হিসেব জানি আমরা?

train_214281আমরা মানুষের দোষ ধরি, গুণের কথা বলি না। আমরা তুলনা করি পাশের দেশের ‍সাথে। আমি হলফ করে বলছি, বিশ্বের কোন দেশে রেল অপারেটিঙের (ড্রাইভার- স্টেশন মাস্টার ও অন্যান্যরা)সাথে জড়িতরা এতো নিচু বেতন ও পদমর্যাদা ভোগ করে না। আর রেল কেন লাভ করে না লাভ করে না বলে আমরা চিৎকার করি, কিন্তু কখনো কি আমরা মানবিক দৃষ্টিতে লাভ খরচের হিসেবটা একটু খতিয়ে দেখি? এ রেল আছে বলে লোকে ১২০ টাকায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসতে পারে। মঙ্গাপীড়িত এলাকার মানুষজন ঢাকায় এসে যাকাত ফিতরার টাকাগুলো তো তুলতে পারে। বড়ো প্রশ্ন, রেলকে লাভ করার স্বাধীনতা দিতে কি আমরা প্রস্তুত? তাহলে বিভিন্ন বাহিনীকে যে কম মূল্যে রেল পরিবহন করে তা বন্ধ করে দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে জমে থাকা রেলের বকেয়া এক অর্থ বছরে পরিশোধ করে দিতে হবে। রেলকে চলতে  দিতে হবে তার নিজেস্ব অর্থনৈতিক বিবেচনায়। বড়ো কথা, রেলের উন্নয়নের সিদ্ধান্ত রেলকেই দিতে হবে। হয়ত তর্কের খাতিরে বলবেন, দেয়া হউক। কিন্তু কোনভাবেই তা দেয়া সম্ভব নয়। যদি রেলকে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ভাবেন তবে সেভাবেই তাকে মূল্যায়ন করুন।

আমাদের মতো অর্থনীতির অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের রেলের যাত্রীসেবার মান ভালো। উপমহাদেশের ভারত আর পাকিস্তান বাদে অন্য কোন দেশের রেলের সেবার মান বাংলাদেশের ধারে কাছে নয়। এতে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার কিছু নেই। এই মান মোটেও সন্তোষজনক নয়। তবে আশার কথা হলো রেলের সুখ দু:খের সারথী হতে একটা প্রজন্ম দাঁড়িয়ে গেছে। এরা তরুণ এরা শিক্ষিত। এরা ভালোয় মন্দয় রেলকে দীর্ঘদিন ধরে সাপোর্ট দিতে পারবে। এদের কল্যাণে হউক বা অন্য কোনভাবে হউক জনগণ এখন রেলের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারছে। একটা সময় রেলের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ ছিল না। আরো বড়ো ব্যাপার, বর্তমান সরকার প্রধান পুরোপুরি রেলবান্ধব একজন নেতা। বাংলাদেশ রেলওয়ের ৪৪ বছর জীবনে এতো সুন্দর সময় আর কখনো আসে নি। প্রৌঢ়ের খাতায় নাম লেখাবার আগে আগে হঠাৎ যেন কোন বিশল্যকরণ লতার যাদুতে যেন যৌবন পেলো রেলওয়ে। আর এ যৌবনের প্রতীকী রূপ হয়ে যেন ধরা দিল লাল সবুজ বগিগুলো। রেল চিরযৌবনা হউক। পরিবহন খাত মাফিয়াদের হাত থেকে মুক্ত হউক।