পৃথিবী তার পুরনো প্রেমিক

ইরাজ আহমেদ

পৃথিবী তো তার পুরনো প্রেমিক। কতকাল ধরে তাকিয়ে আছে তারই দিকে। তার ঘর অনেক দূরের পথ। ঘাস নেই, হাওয়া নেই। উষর জমিনে ধূলো ওড়ে দিনমান। তবু পৃথিবীর প্রেমের টান বেঁধে রাখে তাকে। গত রাতে হয়তো সেই ভালোবাসার টানে ৭০ বছর পর পৃথিবীর কাছে চলে এসেছিল চাঁদ। আর তাতেই তো এই মরতের চাঁদে পাওয়া মানুষেরা সেই প্রেমের আলোর উৎসব দেখতে অস্থির হয়েছিলেন।

অনেক উজ্জ্বল আর অনেক বড় চন্দ্র দর্শনে ভালোবাসার উৎসব হয়েছিল কি না, পুরনো প্রেম নতুন করে কেউ খুঁজে পেয়েছিল কি না এই নগরীতে সে খবর আমার জানা নেই। হয়তো কাজও নেই। কিন্তু কাল রাতে চাঁদ দেখার দলে আমিও যুক্ত হয়েছিলাম। হয়তো পৃথিবীর প্রাচীন প্রেমকে সম্মান জানাতেই।supar_moon

হেমন্তের রাতে হালকা কুয়াশার মসলিনে জড়ানো আকাশের ঘর আলো করে ছিল চাঁদ। খানিকটা রহস্যময়ও বটে। এই নগরীর মানুষের ক্রমাগত ছুটে চলা, ক্রমাগত জীবনের অর্থময়তা আর অরথহীনতা খুঁজে ফেরা সময়ের ফাঁক গলে রূপসী চাঁদ অল্প সময়ের জন্য হলেও স্থান পেয়েছিল আলোচনার টেবিলে। চনমনে আলোচনায় ভরে উঠেছিল অন্তরজালের জগৎ। সেই বা চাঁদের জন্য কম কিসে?

গতকাল পৃথিবীর অক্ষে চাঁদের অবস্থান ছিল গত ৭০ বছরের মধ্যে সবচাইতে কাছে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারী মাসে একবার সে পৃথিবীর এতো কাছে চলে এসেছিল। আবার চাঁদ এই কক্ষপথে ফিরবে ২০৩৪ সালে। কথাটা জেনে দীর্শ্বাস ফেলে ভেবেছি পৃথিবীর এই প্রেমিকাকে আর এতো কাছ থেকে হয়তো দেখাই হবে না।

বিজ্ঞান বলছে পৃথিবী থেকে চাঁদের এমনিতে দূরত্ব ২৩৮,৯০০ মাইল। গতকাল সে চলে এসেছিল ২২১,৫২৪ মাইলের মধ্যে। যে কোন সময়ের তুলনায় গতকাল চাঁদ ছিল পনেরো শতাংশ বড়। হয়তো সেই প্রেমের টানেই তার এই কাছে আসা।

বিজ্ঞান আবার সারা জীবন এই চাঁদে-পাওয়া মানসিকতার শত্রু। আমেরিকার হুইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মহাকাশ বিজ্ঘান গবেষক সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, সুপার মুন বলে কোন কিছুর অস্বিত্ব তাদের বিজ্ঞান বইয়ের পাতায় নেই। এই অসাধারণ রূপসী আর উজ্জ্বল চাঁদের কোন সংজ্ঞাও তাদের বইতে অনুপস্থিত। আবেগের মাথায় জল ঢালার মতোই অবস্থা। কিন্তু না মেনে উপায় কী? বিজ্ঞান বলে কথা।

কিন্তু আমরা তবুও পৃথিবী আর চাঁদের প্রণয় উপাখ্যানের গল্পটাই শুনতে চাই। হয়তো জানতে চাই ভালোবেসে এই গ্রহ আর এক উপগ্রহ কী কোন অসীমের টানে এভাবে কাছে চলে এসেছিল? পড়ে থাক বিজ্ঞান। জিতে যাক চাঁদ আর পৃথিবীর অসমাপ্ত প্রেমের বেদনা।