জীবনের সুদকষা

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

কনকচাঁপা

দাদার বাড়ি ছিল সিরাজগঞ্জ এর কাজিপুর থানার মাইজবাড়ি গ্রামে।মোটামুটি সম্বৃদ্ধ গ্রাম ছিল তা।কারন পোষ্ট অফিস মক্তব প্রাইমারী স্কুল হাই স্কুল রেশনশপ গ্রাম্য দাওয়াখানা কয়েকটা হাট এবং রোজকার বাজার ছিল গ্রামে।আমার দাদার ছোট ভাই জগৎগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর ছেলেমেয়েরাও সেখানে পড়তেন।সেই দাদার খুব প্রতাপ ছিল।কারন তিনি একাধারে রেশনশপের ডিলার,হোমিওপ্যাথ ডঃ এবং শিক্ষক ছিলেন।বিনা পয়সায় দরিদ্র রোগী দের konokchapa111_nov3চিকিৎসা করে তাদের পথ্যের অভাব শুনে নিজের ভাড়ার ঘর থেকে চাল ডাল ও দিয়ে দিতেন।তাঁর বৈঠকখানা একাজেই ব্যস্ত থাকতো। তাঁর সবচেয়ে ছোট কন্যার গল্প বলি।পৃথিবী তে আজ অবধি ওনার মত মনভুলো এবং একই সঙ্গে অধ্যাবসায়ী ছাত্রী আর দেখিনি উনি আমার শেফালি ফুপু,অসম্ভব মন ভোলা সাদামাটা ভালো একজন মানুষ। ইস্কুলের পড়া তার মাথায়ই ঢোকেনা।অংক তো আরো না।আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। ফুপুমা অষ্টম শ্রেণীতে পড়েন।ওনার বার্ষিক পরীক্ষা। বড় ফুপু আমাকে সঙ্গে দিলেন।গ্রামের ঢিলেঢালা নিয়মের ইস্কুল পরীক্ষার হলে আমি তার পাশে বসলাম।পরীক্ষক যেন কিছুই দেখছেন না।আমি তাকে অংকের যোগ বিয়োগ গুনন ভাগ সব দেখিয়ে দিতে থাকলাম।ঠেকে গেলাম সুদকষাতে! বাড়ি ফিরলে সেই ঘটনা ধরা পড়ে গেলো।দাদাভাই ডেকে পাঠালেন।এবং তাঁর মেয়ের সঙ্গে আমাকে, আম্মাকে বকলেন। এবং ফুপুর পরীক্ষার খাতা বাতিল করলেন।আমি কতটা লজ্জা পেলাম জানিনা কিন্তু আম্মা শুধু শুধুই বিব্রত হলেন।মা তো আর এই ফুপু ভাতিজির হাতে কলমে নকলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।তবুও, তিনি একজনের শিক্ষকের কন্যা,দাদাভাইয়ের এই খোঁটাটি আম্মার মনে খুব আঘাত করলো।সেবারের গ্রামে বেড়ানো টা অযথাই নষ্ট হয়ে গেলো। আমি মন খারাপ করে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াই।ফুপু ঘরে স্ব-ইচ্ছায় বন্দী।কয়দিন পরে অবশ্য ঢাকা ফেরার পথে সব অস্বস্তিকর ব্যাপার শেষ হল এবং বিদায় বেলায় হৃদয় বিদারক কান্নাকাটি হল।দাদাভাই তার একাধারে আপন ভাগ্নি ও ভাতিজা বধুকে মাফ করে দিলেন এবং আম্মা বললেন ‘কাক্কা,শেফালী কে নাইনে উঠায় দেন।এইবার ফুপু বললেন,না— আমি নিজে নিজে অংক কষে নাইনে উঠবো। যতদূর মনে পড়ে ফুপু ছয়বার পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। জীবন খুব ছোট এবং খুবই সুন্দর। তারচেয়ে ও সুন্দর এই স্মৃতিচারণ। এই স্মৃতিচারণ ব্যপারটা আছে বলেই ঘুমের আগের সময়গুলো এতো মধুর এবং রোমান্টিক ও বটে। সেই রোমান্টিসিজম প্রিয়তমের সঙ্গে সময় কাটানোর চাইতেও রোমান্টিক।