মায়ের চিঠি, তোমাকে….

ভালবাসার কোন ব্যাকরণ নাই। ভালবাসার নিয়মনীতি আইনকানুন শিষ্ঠাচার কিচ্ছু নাই। আমিও ভালবাসার মত ব্যকরণহীন, শিষ্ঠাচারবর্জিত, এলোমেলো, মেঘে মেঘে ঢাকা। শীত বিকেলে আমার মন কেমন করে, তাই কোন এক শীতার্ত সন্ধ্যায় কি রাতে কোচরজুড়ে এক মুঠো জ্যোৎস্না নিয়ে আমি বসে রইলুম এক অন্ধকারের গভীরে। কোন কোন অন্ধকারও আলো বুকে ধরে!

তারপর চলতে চলতে চলতে সেই অপার্থিব আলোর সঙ্গে দেখা। দেখা মানে অনুভব করা। একটা তিরতিরে আপন আপন ঢেউ আমার সর্বাঙ্গ জুড়ে উঠছে আর নামছে, আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে কোথায় কদ্দুর, সে আমার জানা নাই। শুধু জানি, বুকের ভিতরে প্রবেশ করে সেই আলো আমার শরীরের ভিতরে জাকিয়ে বসেছে। আমি তার নাম দিলুম একখানা। আমি তাকে আমূলে স্পর্শ করতেও চাইলুম। কিন্তু আমার অস্তিত্বের ভিতরে, আরো ভিতরে, গভীরে গোপনে তার কেবল জেগে ওঠা, আমি শুধু এক কাঁপা কাঁপা জ্যোৎস্নাআলোর ভিতরে ডুবসাঁতার কাটি।

শারমিন শামস্

শারমিন শামস্

আমি একজোড়া লাল জুতো কিনলাম নেপালী বাজারে। ইয়াক উলে বোনা, উষ্ণ আর মায়াময়। তারপর সেই জুতোজোড়া বুকে ধরে আমি বারবার কান পেতে রই- যেন একখানা খিলখিলে হাসিওয়ালা ধন্যবাদ শুনতেও পাই। আর আমার শরীরজুড়ে সেই হাসি রিনরিনে যাদুবাস্তবতার মত ওঠে আর নামে। নিজের শরীরে হাত রেখে আমি তার চলাচল ধরে ফেলতে চাই। আমি চাই বরফপানি খেলি, আমি চাই তাকে ছুঁয়ে দিতে, আমি চাই ছুঁয়ে দিয়ে বারবার জিতে যেতে!

সেইসব দিনে ছায়াশীতলতা হয়, মর্মর পাতাঝরা ঘটে, নিঃশব্দ বৃষ্টিপতন আসে আর যায়। বিষণ্নতার বাজিকর জিতে যায় বরাবর, আর আমি হলুদ জানালার গ্রিলে প্যাচাই অপেক্ষার নীল সুতো। চতুর্দিকে যুদ্ধের দামামা হৈ হৈ রৈ রৈ করে। আগুন ধরে যায়, পোড়া কাঠ আর দুঃখবতী ছাইগুলো ওড়ে। আমার অপেক্ষারা কেন্দ্রীভূত হয়ে আসে একটি প্রশ্নে। একটি নির্দিষ্ট প্রতীক্ষার মুখোমুখি বসিয়ে নিজেকে, আমিও প্রবোধ দিই, আমিও আশায় জাগি। একটা হৃদপিন্ডধ্বণি কত জরুরি হয়ে ওঠে, কত কত দিনের হিসাব নিকাশে কত আবেগের শিশিরকণা ঝ’রে গলে পড়ে। আর সব কিছু ফেলে রেখে আমি সেই হৃদপিন্ডধ্বণির অপেক্ষায় আর প্রতীক্ষায় সারারাত জাগি।

মাঝে মাঝে খুব ধুসর আলো হয় চারপাশ। সেইমত হতক্লান্ত দিনের কোন একটিতে আমিও খুঁজতে যাই তাকে- তুলতুলে আলোর নরম গোলক হয়ে যে ঢুকে পড়েছে সর্বাঙ্গে। অথচ একটা হৃদধ্বণির প্রতীক্ষায় থামিয়ে দিয়েছে খলবলে হাসি, আলোর ঢেউয়ে দিনরাত ছুটে ফুটে ওঠা!

ধূসর শুষ্ক দিনগুলো অবিশ্রান্ত নিষ্ঠুরতা জানে। জানে বলেই আমি হেরে যাই। খেলার সঙ্গী স্তব্ধ তাই থেমে গেছে বরফপানির ঘর। একটা নীলাভ আলোর যান্ত্রিক ঘুমের ভিতরে কেউ ঠেলে ধরে পাঠিয়ে দেয় আমাকে। আমি চলে যাই। আর সেই দশদিক অন্ধ করে রাখা এক ঘুমের গভীরে আমাকে ঠেলে গুঁজে দিয়ে, ধারালো ফনা তুলে সেই আলোটুকু টেনে ছিঁড়ে নিয়ে কেউ আমাকে ছুঁড়ে দেয় চিরঅন্ধকারে। তারপর খুব মৃদুস্বরে ডাকে, “ওঠো, ওঠো, এইবার উঠে পড়ো, সে চলে গেছে”।

ভালবাসা অর্থহীন, ভালবাসা অপচয়। তবু পৃথিবীতে এখনও খুব আলো জ্বলে, আনন্দ আর বসন্তের গানে ভরে দিন, টুপটাপ ঝরে পড়ে জ্যোৎস্নার ফুল, দূর থেকে ভেসে আসে পাহাড়ের গান। এখখানা লাল জুতো, ইয়াক উলে বোনা, গাঢ় আর উষ্ণতায় ভরা, ছোট্ট- এরপরে আর ‘ছো্ট্ট’ বলে কিছু নেই- সেই জুতোখানা তুলে রাখা আলমিরার কোনে, শাড়ির ভাজের গভীরে, পাল্লায় ঢাকা। কেউ তার খোঁজ রাখে না তো। মাঝে মাঝে একলা যখন, খুলে মেলে ধরি, কেউ নেই, তাই তাকে ছুঁয়ে দেখি। বুকের খুব কাছে, যতটা কাছের পর আর বাকি সব মিথ্যে, অর্থহীন- ততটুকু কাছে এনে বুকে চেপে ধরি। তার কোন নাম ছিল বটে, যে নামে ডাকা হয়নি কোনদিন, যে নামটা জানে নাই কেউ, তার একটা মুখশ্রীও ছিল, আমার চেতনায়, আমার চোখের তারায়, সেই মুখ কেউ দেখে নাই। তার হাত, ছোট ছোট হাতের আঙ্গুল, বোঁচা নাক, চোখের পল্লব- সব কিছু ভেসে উঠে মিলিয়ে গিয়েছে আমারই ভিতরে। আমি তাকে কোনদিন দেখি নাই। যদি কোনদিন দেখা হয়ে যায়, যদি কোনদিন আমি তাকে ছুঁতে পারি এই দুই হাতে, যদি কোনদিন আমি ধরে ফেলি তার নরম আঙ্গুলগুলো, ফুলো ফুলো পেট বুক নাক মুখ চোখ, যদি আমি কোনদিন তার শরীরের গন্ধ পেয়ে যাই, যদি আমি কোনদিন তাকে বুকের ভিতরে পাই……!