আমার বন্ধু বিশ্ব

রাজা ভট্টাচার্য

রাজা ভট্টাচার্য

তখন খুব গানের অনুষ্ঠান করতাম। শ্যামল মিত্রের গান গাইতাম পাড়া-বেপাড়ার স্টেজে। তা অমনই একটা অনুষ্ঠান করতে গিয়ে দেখি – সারথিটি আমার অপরিচিত। সৌম্যদর্শন যুবক ; সুন্দর জামা-কাপড়ে আমার চেয়ে ঢের সপ্রতিভ আর ধোপদুরস্ত। হাতে হাতে নামিয়ে ফেলছে হারমোনিয়াম-তবলা। আলাপ হল। নাম বলল ‘বিশ্ব’, আগে সুরাটে কী-সব কাজ করত; এখন গাড়ি চালাচ্ছে।
অতি দ্রুত খাসা বন্ধুত্ব হয়ে গেল আমাদের। তার মূল কারণ অবিশ্যি গান – বিশ্বও আমার মতোই গানপাগল, অনুষ্ঠানে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার কারণও প্রধানত ওটাই। ক্রমে আমাদের সম্পর্কটা পারিবারিক হয়ে উঠল। মাকে নিয়ে সারদা মিশনে যাওয়াই হোক, আর আমার বিয়ে করতে যাওয়া – সবকিছুর জন্যই বিশ্বকেই গাড়ি নিয়ে আসতে হত। সম্বোধনটাও নেমে এল তুই-তোকারিতে – সামান্য বড় বলে ও ‘রাজাদা, তুই’ বলে শুরু করত কথা।
তখন সদ্য মধ্যমগ্রামে উঠে এসেছি ফ্ল্যাট কিনে। ছেলের বয়েস সাড়ে তিন, পড়ার চাপ নেই। শনিবার ফিরে যাই বাড়িতে, রোববার রাত্তিরে ফিরে আসি ফ্ল্যাটে। তো তেমনই এক রবিবার। এমনই নিম্নচাপের দিন। সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি। সন্ধ্যে থেকে শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। আমি বাইরের ঘরে বসে পড়াচ্ছি – বাংলা অনার্সের প্রথম ক্লাস। ছেলে খেলছিল খাটের উপর, আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। হঠাৎ, ঈশ্বর জানেন কী করে – সে ছিটকে পড়ল খাট থেকে মেঝেতে। ছুটে গিয়ে তুললাম। যা না লেগেছে, ভয় পেয়েছে তার দ্বিগুণ। ওর মা, আমার মা – দুজনে মিলে মাথায় জল দিয়ে শুইয়ে দিল ওকে।
rain1এর মিনিট পনের পরে প্রথমবার বমি হল ওর। তার দশ মিনিটের মধ্যে আবার। এই লক্ষণ কারোর অচেনা নয়। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল আমার। বাড়িতে কান্নাকাটি। ফোন করলাম বারাসাতে, জন্মাবধি যে ভদ্রলোক ছেলের চিকিৎসা করছেন – সেই ডাক্তারকে। বন্ধু মানুষ তিনি। কম্পিত গলায় বললেন -“এক্ষুনি নিয়ে এস। দেরী ক’র না।”
নিয়ে যাব! কি ভাবে? তীব্র রিরংসায় বৃষ্টি হচ্ছে তখন বাইরে, ভিতরে ছেলে ক্রমশঃ নেতিয়ে পড়ছে। প্রায় স্বয়ংক্রিয় ভাবে মনে পড়ল বিশ্বর কথা। ফোন করলাম। ধরেই সেই হাসি-ভরা গলা -“দু’রাত জাগা কিন্তু, সমানে গাড়ি চালাচ্ছি। কোথাও যেতে বলবি না তো?” বললাম অবস্থা। কাঠ হয়ে যাওয়া গলায় বলল, দশ মিনিটের মধ্যে আসছে।
তাই-ই এল। অঝোর বৃষ্টির মধ্যে রওনা দিলাম। সমস্ত যশোর রোড জ্যামে বন্ধ। কোন্ অলিগলি দিয়ে পৌঁছলাম বারাসাতে, জানি না। স্ক্যান হল। ছেলের মাথার পিছনে জমাট রক্তের চিহ্ন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মনে পড়ল – প্রায় ছ’বছর চাকরি করেও আমাদের মোট সঞ্চয় – চোদ্দ হাজার টাকা। ব্যাস। সব টাকা উড়িয়ে দিয়েছি বেড়িয়ে। আর হ্যাঁ, আমার এ.টি.এম. কার্ডটা নষ্ট। টাকা তুলতে পারছি না। মা কিছু দিল, শ্বশুরমশাই আলমারি ঝেড়ে বের করে দিলেন টাকা। সব মিলিয়ে বড়জোর দশ হাজার। স্ক্যান করতে চলে গেল অধিকাংশ। যখন এ.এম.আর.আই.-তে গিয়ে পৌঁছলাম – তখন পকেটে তিন-চার হাজার। ছেলেকে আর তার মা-কে নিয়ে গেল উপরে। আমি আর বিশ্ব গেলাম রিসেপশনে। সুন্দরী রিসেপশনিস্ট মিষ্টি হেসে জানালেন – ভর্তি করতে লাগবে দশ হাজার টাকা।
rain2বের করে দেবে না কি আমার ছেলেকে! এই অবস্থায়! এই বৃষ্টির মধ্যে !!
এতক্ষণ একটাও কথা না-বলা বিশ্ব এইবার এগিয়ে এল। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করল দু’দিন দু’রাত জেগে রোজগার করা প্রত্যেকটা পয়সা। না-গুনেই গুঁজে দিল আমার হাতে। ঠাণ্ডা গলায় বলল -“দ্যাখ তো রাজাদা, হয়ে যাওয়া উচিত।” ভর্তি করলাম ছেলেকে। সারারাত আমার পাশে, সল্টলেকের ফুটপাথে, অবিশ্রাম বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল বিশ্ব। ভিতরের সোফাগুলোয় ঘুমোচ্ছেন রোগিদের আত্মীয়রা।

তিনদিন পর, দুপুরবেলায় জানা গেল – ছেলেকে ছেড়ে দেবে এবার। ফোন করে জানাতে বলল-“কাছেই আছি। আসছি, দাঁড়া।” যে এনেছিল, সেই চলল হাসিমুখে ফিরিয়ে নিয়ে।
বাড়ির সামনে নামিয়ে, ছেলেকে বিস্তর বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে গাড়ি ঘোরালো বিশ্ব। আমি মানিব্যাগে হাত দিচ্ছি দেখে হাসল একগাল। তারপর ছেলেকে দেখিয়ে বলল -“আরে ও-ই দেবে বড় হয়ে।”
কাঁপা গলায় বললাম -“থ্যাংকস বিশ্ব, তুই না থাকলে যে কী হত…”
বিশ্ব অবাক হয়ে বলল-“তুই তো পুরো সাহেব হয়ে গেছিস রে রাজাদা! এরপর তো জেঠিমাকেও বলবি থ্যাংক ইউ ; আর বউদিকে ‘আই লাভ ইউ হানি’!!”