তর্ক বিতর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

এখন পৃথিবী জুড়ে চায়ের কাপে ঝড় বলে যদি কিছু থাকে তবে সেটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল। সব জায়গায় একই আলোচনা, চুলচেরা বিশ্লেষণ, টিভির পর্দায় আমেরিকার খবর ভেসে উঠলেই হুমড়ি খেয়ে দেখা।
মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আছে অনেক মতামত, অনেক কাটাছেঁড়া। কেউ বলছেন আমেরিকার জনগণ শেষ পর্যন্ত একজন কাউবয় ইমেজের মানুষকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চায়। আবার কেউ বলছেন, হিলারি পরাস্ত হয়েছেন নিজের কর্মের জন্য। আবার এরকম মতও উঠে এসেছে মার্কিন ভোটাররা শেষতক নারী নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ রচনায় সেই বিতর্ক আরেকটু উসকে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নারী নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল নানা পেশার নারীদের কাছে। তারা জানিয়েছেন তাদের মতামত।  

maxresdefaultশম্পা রেজা
সঙ্গীত শিল্পী, অভিনেত্রী

এবার আমেরিকার নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নারী অথবা পুরুষ, এক কথায় জেন্ডার বৈষম্য প্রভাব বিস্তার করেছে বলে আমি মনে করি না। নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি কিছুটা অনুসরণ করে আমার মনে হয়েছে এই জেন্ডার ইস্যুর চাইতে ‘ভুল প্রার্থী নির্বাচন’ অনেক বেশী জোরালো প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে এই নির্বাচনে। উল্টে বলা যায় এক ধরণের ‘অ্যান্টি স্ট্যাবলিশমেন্ট’ স্রোত এবার তাদের ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে। বিষয়টাকে কেবল নারী নেতৃত্বের ওপর আস্থাহীনতা বলে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।
আমেরিকার নির্বাচনে এবার অনেকগুলো কারণ কাজ করেছে ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পেছনে। আসলে সমাজের সাধারণ মানুষের মাঝে দুই প্রার্থীকে নিয়ে এক ধরণের হতাশা আগে থেকেই কাজ করছিল বলে আমার মনে হয়েছে। দুজনের থলেতে অনেক গোপনবিড়াল ছিল যা ভোটের হাওয়ায় বের হয়ে এসেছে। ফলে ভোটাররা খোলা মনে দুজনের কাউকেই গ্রহণ করতে পারেনি। ফলে তারা পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে দেখতে চেয়েছে কী ঘটে। আর একটা কথা তো আমাদের সবারই মনে রাখা উচিত, হিলারি তার স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন আর মনিকা লিউনেস্কির ঘটনাটাকেও বহন করতে হেয়েছে এখন পর্যন্ত। এই বিষয়টিও এই নির্বাচনে একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বলে আমার ধারণা।

12795363_491377184381386_6762570446108761980_nসাহানা হুদা
যোগাযোগ কর্মী

মার্কিন মুল্লুকের নির্বাচনে হিলারী ক্লিনটন যে এভাবে পরাজিত হবেন, একথা অনেকেই স্বপ্নে ভাবেনি। ভেবেছে আমেরিকার মত একটি উদার গণতান্ত্রিক দেশের জন্য অত্যন্ত যোগ্য প্রার্থী হবেন এই হিলারী । কিন্তু পুরো বিশ্বকে হতাশ করে দিয়ে মার্কিনীরা বুঝিয়ে দিয়েছে যে তারা এখনও নারী নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয় । নারী নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন্য যে উদার মানসিকতা প্রয়োজন, মার্কিন জনগণের সেই মানসিকতা নেই । অথচ রাজনৈতিক কারণেই হোক আর পারিবারিক উত্তরাধিকারের জন্যই হোক বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বে এসেছে, জয় করেছে । বাংলাদেশের নিরক্ষর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানুষও একবারের জন্যও নারী নেতৃত্বেও বিরোধিতা করেননি ।
তারা নারীকে ভোগ্য পণ্য বা ভোগ্য পণ্যের মডেল হিসেবে যতটা গ্রহণ করার পক্ষে, ঠিক ততটাই বিপক্ষে নারীকে ক্ষমতার শিখরে দাঁড় করানোর ব্যাপারে । বিশেষ করে মার্কিন সাদা চামড়ার বয়স্ক মানুষরা । তারা তাদের প্রথাগত চিন্তাকে আশ্রয় করেই ভোট দিয়েছেন ।
যদিও নারীবাদীরা মনে করে হিলারীর এই পরাজয় নারীবাদের জয় । হিলারী শুধু ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য তার স্বামী ক্লিনটনের ভয়াবহ অনৈতিক কাজকেও মেনে নিয়েছিলেন । এর কোন প্রতিবাদ করেননি, যা নারীর মর্যাদাকে অবমাননার সামিল । এখন এসে উনি সেটার ফল পেয়েছেন।

bangladeshi-actress-afsana-mimi-5আফসানা মিমি
অভিনয় শিল্পী, পরিচালক

আমেরিকার নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশ সদাই ব্যাকুল।
আর এই ব্যাকুলতা সর্বত্র…
এবারের নির্বাচন নিয়ে একটি প্রশ্ন এখন ঘুরে ফিরে আসছে যে –
তাহলে কি আমেরিকান মানুষ শেষতক নারী নেতৃত্ব চায়না?
হিলারিকে কথা দিয়ে তারা কথা রাখলো না!
এখানে আমেরিকার ইতিহাস, আমেরিকানদের ইতিহাস, আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাস,
ইত্যাদি নানাবিধ বিষয় খুঁড়ে দেখতে হবে।
সত্যি কথা বলতে ট্রাম্প বা হিলারি কে এলো গেলো, সেসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।
আমার মাথাব্যথা বিশ্বশান্তি নিয়ে…
আমার মাথাব্যথা আমার দেশ নিয়ে।
তবু একটা কথা না বলে পারছিনা –
আমেরিকার রাজনৈতিক সমীকরণ কি সত্যিই বিশ্ববাসী জানতো না?
তবে এবারের আমেরিকান নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশের নেতারা যখন রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি করেন বা একে অপরকে দোষারোপ করেন,
সেটা অনেক সভ্য।
তথাকথিত সভ্য দেশের নেতাদের অসভ্য আচরণ এবং তাদের মিডিয়ার অসভ্যতায় আমি হতবাক!
জয়তু বিশ্বশান্তি…

12495232_10153962756209660_1606583218617787833_nআন্জুমান রোজী
লেখক,প্রবাসী বাংলাদেশী

আমেরিকা নারী অধিকারের বিষয়ে সবচাইতে বেশী সোচ্চার একটি দেশ। বলতে গেলে সেখানে সকল অধিকারের দিক থেকে নারী পুরুষ সমান। তারপরেও রাষ্ট্র নেতৃত্বে এখনও নারীকে সে দেশের জনগণ মেনে নিতে পারছে না।  কারণ, আইন দিয়ে নারী পুরুষের সকল অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেও  জনগণের প্রকৃত মানসিকতা সেই পুরুষতান্ত্রিকতাতেই থেকে গেছে।  যার ফলে এখন পর্যন্ত কী নারী, কী পুরষ উভয়েই অনেকাংশে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ধারা  বহন করে চলছে।  এবারের ২০১৬ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তাও আবার একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতার শিখরে বসে এই দৃশ্য অবলোকন করছি,  যখন নারী পুরুষ সমানতালে যুদ্ধ করছে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্যে। সেখানে নারী নেতৃত্ব  জয়লাভ করতে পারে না কেন?  আমি মনে করি, আমাদের অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে ঐতিহ্য পরম্পরায় যে সংস্কৃতির চর্চা প্রবাহমান তারই প্রতিচ্ছবি নারী নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা । কারণ আমাদের সংস্কৃতিতে নারীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক পৃথিবীতে জ্ঞানের চর্চায়  আমেরিকা উন্নত বিশ্বে অগ্রগামী বটে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় সংস্কৃতি চর্চার কারণে নারী নেতৃত্ব যেভাবে গ্রহণযোগ্যতা রেখেছে তা আমেরিকানদের সেই মানসিকতা এখনো গড়ে ওঠেনি। একদিকে আইন দিয়ে সুশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থা গঠন করা যেমন প্রয়োজন আছে তেমনই অন্যদিকে  প্রয়োজন উদার শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা।

976530_10151666987540071_1451168684_oলীনা ফেরদৌস
ম্যানেজার- পি আর  এন্ড সি এস আর
পেন্ডেকার এনার্জী

যুক্তরাষ্ট্রের মত এত উন্নত আর ক্ষমতাধর দেশটিতে নারী নেতৃত্বের ধারণাটি সম্ভবত এখনো বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। যদিও অনেকে মনে করেন যে বিশ্বব্যাপী নারী নেতৃত্ব পাল্টে দিচ্ছে নারীর ক্ষমতায়নের ইতিহাস। কিন্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পদে এখন পর্যন্ত কোনও নারীকে দেখা যায়নি। অনেকেই ভেবেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবারের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন জয়ী হবেন এবং আমেরিকার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিশ্বে নারী ক্ষমতায়ন আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে, হিলারির হাত ধরেই হয়তো নতুন ইতিহাসের সূচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যতই উন্নত হোক না কেন আর যতই বোঝাতে চাক না কেন যে রাষ্ট্রের কাছে নারী-পুরুষ সবাই সমান,যুক্তরাষ্ট্রের এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রমাণিত হল যে তাদের সমাজেও নারী-পুরুষ বৈষম্য প্রকট। বিশ্বে আসলে নারী-পুরুষ বৈষম্য কখনোই ঘুচবে না যদিও সমতা অর্জনের এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ্বের নারীরা নিরন্তর আন্দোলন করেই যাচ্ছে । নারীর অসম সামাজিক অবস্থান নারীর ক্ষমতায়নের অন্তরায়। যুক্তরাষ্ট্র মত উন্নত দেশেও নারীর অসম সামাজিক অবস্থান প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হল এবারের নির্বাচনে।
যুক্তরাষ্ট্রের নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় নারীদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম কটূক্তি করেছেন এবং তার কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য যে কোন নারীর জন্য বড়ই অসম্মান জনক। একজন নারী হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচন আমার কাছে মোটেও যুক্তিযুক্ত আর স্বচ্ছ মনে হয়নি, বরঞ্চ মার্কিন সমাজে নারীদের অবস্থান কোথায় সেটা আরও একবার পরিষ্কার বুঝতে পেরেছি। আমার ধারণা যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর মার্কিন নারীরা যে প্রতিবাদ দেখিয়েছেন নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সেই প্রতিবাদ হয়ত বড় ধরণের ট্রাম্প-বিরোধী বিক্ষোভ বা আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।

11903825_1447542395576488_9033736898111266873_nতাসলিমা মিজি বহ্নি
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, সাংবাদিক

আমেরিকান সমাজ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জেন্ডার সাম্য নিয়ে অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম করে, আমাদের দেশেও তাদের দাতা সংস্থাগুলো নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে তহবিল খরচ করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু আমেরিকান সমাজ কাঠামোতে নারীরা আপাত দৃষ্টিতে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে মনে হলেও সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন আমাদের চোখ খুলে দেয়। আমরা বিষ্মিত হই, কি করে রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীকে পুরুষের তুলনায় অযোগ্য ভাবা হয়! এই নির্বাচনের অন্য ডায়নামিকস থাকতে পারে। কিন্তু হিলারী ক্লিনটন বিরোধী প্রচারনার সমাজতত্ব অত্যন্ত পরিস্কারভাবে নারী বিদ্বেষী। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে নারীর অগ্রগতি একটা সীমা পেরোনোর পর গ্লাস সিলিং দিয়ে আটকে রাখা হয়, নির্বাচনের মত অগ্নিপরীক্ষায় সেটা ধরা পড়ে।