ইয়ে.. মানে, এটাই আমার প্রথমবার!

istiak

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

আমার বছর পাঁচেকের ভাতিজা নামির (আমি মিরাক্কেলে যাওয়ার পর পরই ওর জন্ম।তাই মির এর সাথে মিল রেখে ওর নাম রাখা হয়েছিল নামির)। জীবনে প্রথম বারের মত চিড়িয়াখানা থেকে ঘুরে এসেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, চিড়িয়াখানায় তুমি কি কি দেখলে? ‘বাঘ দেখলাম, সিংহ দেখলাম….তারপর বানর, সাপ আরো অনেক কিছু! তাই নাকি? তা বাঘ কি করছিল তখন? ‘ঘুমাচ্ছিল’। আর সিংহ কি করছিল?’সিংহের তো মন খারাপ ছিল। সামনে খাবার দেয়া, কিন্তু খায় না। ওর আম্মু নুডুলস রান্না করে দেয়নি তো এই জন্য মন খারাপ। আবার বানর দেখলাম, খালি লাফ দিচ্ছে। ওদের বাসা থেকে বের হতে দেয় না তো, এই জন্য ওরা খালি কান্নাকাটি করছিল’। ছোট বাচ্চা ছেলের কথা শুনে হাসি পেলেও চিন্তা করে দেখলাম ও যা বলছে, সব আসলে সৎ চিন্তাভাবনা থেকেই বলা। খাঁচার পশুদের কার্যকলাপ ও নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে। জীবনে প্রথমবার যে অভিজ্ঞতার সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে, কোন না কোনভাবে তা সারা জীবনের এক অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই প্রথমবারের অভিজ্ঞতা মজারই হয়। যদি কোন কারনে কেউ তিক্ত কোন ঘটনার মুখোমুখি হয়ও, কিন্তু জীবনের একটা পর্যায়ে এসে সেই কথা মনে হলে হাসি পাবেই। ক্লাস টেন এ পড়ার সময় টেস্ট পরীক্ষা চলাকালীন আমি যbackfun4খন প্রথমবার সেলুনে যেয়ে বলেছিলাম শেভ করব, নাপিত আমার দিকে একটা মুচকি হাসি দিয়েছিল। তারপর দুই দিন স্কুলে গেছি বিয়ের আসরের নতুন জামাই এর মত মুখ রুমাল দিয়ে ঢেকে।মনে ভয় ছিল বাকীরা সবাই হয়ত ঐ নাপিতের মত মুচকি হাসা শুরু করবে। সেই থেকে শুরু।কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। জীবনে প্রথমবার কোন মেয়েকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি তাকে পছন্দ করি।কি করা যায়? এক বন্ধু এগিয়ে এল বিপদের সাথী হিসেবে। কথা হলো সে আমার সঙ্গে যাবে, মেয়েটার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবে আমাকে, তারপর যা বলার আমি বলব।প্ল্যান মাফিক সেই স্পটে যাওয়া হোল, কিন্তু মেয়েটাকে দেখে আমার বন্ধু যেই এক পা বাড়িয়েছে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে বলে, আমি ততক্ষনে পগার পার! স্বাভাবিক ভাবেই আমার মত ভীতুর ডিমের পক্ষে প্রথম রোমান্টিক অভিজ্ঞতা নেয়ার সৌভাগ্য হয়নি। মাধ্যমিকের পর আমরা চার বন্ধু ঢাকার গুলিস্থান সিনেমা হলে যেয়ে একটা মুভি দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তো গুলিস্থান এলাকা যে চোর বাটপারের আস্তানা সেটা আমরা জানতাম, তাই বলে সিনেমা হলের সামনে দাঁড়ানো সামান্য এক ব্ল্যাকার চারজনকেই এক সঙ্গে বোকা বানিয়ে ৩০ টাকার টিকেট ১০০ টাকা করে বিক্রি করবে কে জানতো?সিনেমা হলে বসে আনন্দ পাওয়া দূরে থাক, হাত খরচের পুরো টাকাটাই ব্ল্যাকারের হাতে চলে যাওয়ার শোকে, দুঃখে, রাগে আমরা পুরো মুভি না দেখেই বেরিয়ে এসেছিলাম। egtw6tlপ্রথমবার মুরগি হওয়া বলে কথা। জীবনের প্রথম ফাইভ স্টার হোটেলে যাওয়ার পর আমার সামনে যখন কাচ্চি বিরিয়ানীর প্লেট সার্ভ করা হলো, আমি টেবিলে রাখা ছুরি চামচ হাতে তুলে নিয়েছিলাম সিনেমায় দেখা ইংলিশম্যানদের মত।তারপর অসীম সাহসিকতার সঙ্গে সেই ছুরি আর চামচ দিয়ে মাংসের টুকরা ‘সাইজ’ করার চেষ্টা করেছি প্রাণপনে।তখনো জানতাম না, সব খাবার ছুরি চামচ দিয়ে খেতে হয়না, তাহলে বার্গারও ঐ ‘বিদেশী’রা চামচ দিয়েই খেত। আমাদের দেশে কাচ্চি বিরিয়ানিতে যে হাড়সহ মাটনের টুকরা দেয়া হয়, সেটা আসলে কাটা চামচের আগায় তুলে খাওয়ার জিনিষ না। বিরিয়ানির বনেদিপনা ঐ শুকনো রুটিখোর সাদা চামড়ার লোকজন কি বুঝবে? জীবনে প্রথমবার যখন নতুন কেনা দামী মোবাইলটা পকেটমার নিয়ে গেল, সেদিনই প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম বিলাসিতা করা ভাল জিনিষ নয়। এরপরে পুরোনো মোবাইল পকেটে নিয়ে ইচ্ছা করে লোকাল বাসে উঠেছি বহুবার যেন এত সেটটা হারালে নতুন আরেকটা কিনতে পারি। কিন্তু না, আমি চলি ডালে ডালে, পকেটমার পাতায় পাতায়। ভুলেও তারপর কোনদিন আর আশেপাশে ভেড়েনি। ঢাকার রাস্তায় বিকেলে যখন অফিস টাইম শেষ হয়, তখন একটা সিএনজি( থ্রি হুইলার অটো রিকশা) পাওয়া রীতিমত ভাগ্যের ব্যাপার। অনেক সময় হাতে পায়ে ধরে রাজী করাতে হয়। অথচ যেদিন আমি ইউনিভার্সিটির একটা প্রোগ্রামে যাওয়ার জন্য জীবনের প্রথম স্যুট পরে রাস্তায় নামলাম, স্পষ্ট মনে আছে ৩/৪ জন সিএনজি ড্রাইভার নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করেছিল, স্যার কোথায় যাবেন? ছাত্র বয়সে পকেটে অত টাকাও ছিলনা যে নবাবি দেখাবো। আর এখন পকেটে টাকা থাকে, শুধু স্যুট পরতে ভালো লাগে না বলে সিএনজি ড্রাইভাররা পাত্তা দেয় না।যাই হোক, সব কাজই কোন না কোন সময় জীবনে প্রথম করতে হয়। এতে ভুলত্রুটি হলেও অন্যরা একে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতেই দেখে। যেমন আপনার সাত নম্বর গার্লফ্রেন্ডের কাছে বিশেষ মুহূর্তে যদি ধরা খেয়েই যান, মিষ্টি করে হেসে বলতে পারেন, ‘স্যরি, ইয়ে.. মানে, বুঝতেই তো পারছো এটাই আমার প্রথমবার!