যে জন আছে মাঝখানে…

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

রাজা ভট্টাচার্য

রাজা ভট্টাচার্য

এখনও সুর্য ওঠে নি। কিন্তু বাইরে অন্ধকার তরল হয়ে এসেছে। এইমাত্র শুনেছি একটা পাখির প্রথম ডাক। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলাম। লেপ থেকে পা বের করতেই কনকনে ঠান্ডাটা মালুম হল। আস্তে আস্তে সোজা হতে হয় আজকাল। বয়েস হচ্ছে। চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে বাইরে এসে দেখলাম – পাতায় ছেয়ে আছে উঠোন থেকে গেট পর্যন্ত রাস্তাটুকু। এখনও প্রায় অন্ধকার। শীত আসছে। হাঁটা দেওয়া যাক তবে। দু’মাইল হেঁটে পৌঁছলাম বুড়ো পাইনের নিচের পাথরটার নিচে। পাশ দিয়েই নেমেছে তিরতিরে ঝর্ণাটা। সামনে একটা মস্ত ফাঁকা জমি। ঢালু হয়ে নেমে গেছে সবুজ জমি। অনেক… অনেক নিচে তিস্তা। নীল-সবুজ জhimaloyলধারা চলেছে নাচতে নাচতে উপলসঙ্কুল পথে। আর অনেক উপরে কাঞ্চনজঙ্ঘায় রঙ ধরছে এবার। লাল, গোলাপি কমলা..এবার আবার সাদা। সূর্য উঠল। এতবড় একটা মহাজাগতিক ঘটনা কী নিঃশব্দে ঘটে যায়! আর আমরা কত কথা বলি!
উঠি। এখন আমি হেঁটে যাব বসন্ত তামাং-এর চায়ের দোকান অবধি – নিচে, আমাদের বাড়ি পেরিয়ে আরও প্রায় এক মাইল। এক কাপ চা খাব। তারপর একটা সিগারেট। দিনের পাওনা দু’টোর মধ্যে একটা আমি এখানেই খাই। তারপরেও বেশ খানিকক্ষণ বসে থাকি দোকানের বাইরে, চেয়ারের উপর। কথা হয় বসন্তর সঙ্গে, আনাগোনা করা পর্যটকদের সঙ্গেও। তারা আসে, চা খায়, কুরকুরে কেনে, চলে যায়। আমি থাকি। রোদ ক্রমে কড়া হয়। উঠে আসি। কাছের দোকান থেকে টুকটাক সব্জি কিনে বাড়ির পথ ধরি। পাইনের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া, পনের মিনিটের ছায়া-ঢাকা পথ। তারপর লোহার পলকা গেট খুলে নিচে নামতে হয়। এক চিলতে বাগানের পর ছোট্ট কাঠের বাড়িটা নতুন। রিটায়ার করার ঠিক আগে তৈরি করেছি আমরা দুজন। ছেলে বাইরে। কলকাতায় পড়ে থাকার কোনও কারণ ছিল না আর। আমাদের স্বামী-স্ত্রীর দুজনেরই বহুদিনের স্বপ্ন – অবসর জীবন পাহাড়ে কাটাব। ছ’মাস হয়ে গেল এখানে। নিরিবিলিতে।
গিন্নি উঠে গেছে বহুক্ষণ। জলখাবার খেয়ে বাইরে গিয়ে বসলাম রোদ্দুরে। বাগানেই টেবিল-চেয়ার পাতা। কফি নিয়ে এসে বসে গিন্নি, গপ্প করি দু’জনে। কখনও লেখালেখি করি খানিক – যা মাথায় আসে – ছাই-পাঁশ। নইলে তাকিয়ে থাকি দূর পাহাড়ের দিকে। কাছের পাহাড়গুলো সবুজ দেখায়, দূরেরগুলো নীল। হলুদ-ঠোঁট কুচকুচে-কালো পাহাড়ি ময়না এসে বসে বেড়া-তে।
খেয়ে-দেয়ে একটু গড়িয়ে বিকেলের দিকে বেরোলাম দু’জন। হাঁটি যেদিকে খুশি। বাঁকা পথ ধরে হেঁটে যাই আলগাড়া বা লাভার দিকে। সন্ধ্যা নামে। কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকি বুড়োবুড়িতে, পথের পাশের কালভার্টে। হাঁফ ধরে। সবুজ কুয়াশা ওঠে নিচের তিস্তা থেকে। তারপর ফিরি।
রাত হল। ফায়ারপ্লেসে আগুন উঠেছে গনগনিয়ে। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। গিন্নি এখন ব্যস্ত সোয়েটার বুনতে। নাতির জন্য। শীতে আসবে ওরা। আমি সোফায় লম্বা, হাঁটু অবধি কম্বল। জগজিৎ সিং গাইছেন -“গরজ বরস প্যায়াসি ধরতি পর…”। কোলে জিম করবেটের ‘মাই ইন্ডিয়া’ – পছন্দের বই। এখন ঠিক দু’পেগ খাব আমি। তারপর খাব পাওনা দ্বিতীয় সিগারেটটা। বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বৃষ্টি…তার মানে কাল সানরাইজটা হবে খাসা…গিন্নি খেতে ডাকছে…
* * * * * * * *

এইসব ভাবতে ভাবতে আমি প্রাণপণে চেষ্টা করি মধ্যমগ্রাম স্টেশন থেকে রুদ্ধশ্বাস ভীড়ে-ঠাসা হাবরা লোকালটায় ওঠার। নইলে আজও স্কুলে লেট হয়ে যাবে…সি.এল. তো প্রায় শেষ…
শীত আসছে…..