একগুচ্ছ দেড়ফুটিয়াদের জন্য…!!

দেবপ্রিয়া রায়

দেবপ্রিয়া রায়

(কলকাতা): একবাক্স ললিপপ আর দু’পকেট ভরতি দুষ্টুমির নাম তিন্নি! তিন্নি; আমার পাড়াতুতো দেড়ফুটিয়া লেজুড়, যে এই পাতাঝরার মরশুমে পাঁচে পড়বে। এমন পুঁচকে ক্ষমতা ধরে কুড়ি থেকে বুড়ি সক্কলকে তার ‘স্কুলের গল্প’, তার রোজ হওয়া নতুন নতুন বন্ধুদের গল্প, তার ‘খুব বকা দেয়’ মিসের গল্প গালে হাত দিয়ে চোখ গোল গোল করে শুনতে! ক্যালেন্ডার বলে তিন্নি নাকী ১৫ বছরের ছোটো আমার থেকে…!! আর তার আধছেঁড়া,টুকরো-টাকরা গল্পগুলোয় অভিজ্ঞতার সেলোটেপ জুড়ে টের পেলাম…আমি বোধহয় ১০০ বছর পিছিয়ে আছি তিন্নির চেয়ে…!

তিন্নির দুপুরবেলায় মাথার উপর এসে বসে না ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি…! ওর দুপুরবেলায় যখন এক মস্ত গোব্দা খাতায় ‘সামস্’ করে ও, তখন ওর জানলা দিয়ে চড়াইদের কনফারেন্সে গলে যাওয়া অন্যমনস্কতাকে কান ধরে নামতার ছকে ফিরিয়ে আনে “তুমি না গুড গার্ল!”…! আর ঠিক তার পাশেই বসে আমার ছোটবেলা ইউক্রেনের রূপকথার ওম মেখে, রাজকন্যার ছোঁয়ায় ব্যাঙ থেকে রাজপুত্তুর হওয়ার জাদু দেখতে…!! তিন্নিরা যখন অঙ্ক শেখে; শিখেছি আমিও, আমরাও!! শিখেছি স্বপ্ন দেখতে… কল্পনার ঝাঁপি উপুড় করতে!!!

তিন্নিরা যখন হাঁফায়, স্কুল বাস থেকে নেমেই ছুট্টে নাচের স্কুল বা আঁকা শিখতে যেতে… হাঁফাতাম আমরাও; এককাদা মাঠে ফুটবল নিয়ে দাপাদাপি করার পর!! তিন্নিরাও পুতুল খেলে, খেলনা তো তাদেরও আছে! কিন্তু তিন্নিরা মজছে কই? বুঁদ হয়ে থাকে তিন্নি স্মার্টফোনের টকিং টমি বা অন্য কোনো গেমে!! আর তার বা তাদের খেলনারা , টেডিরা সুন্দর হয়ে থেকে যায় দামী শোকেসের কাঁচবন্দী হয়ে।।বন্দী দু’পক্ষই, টের পায় শুধু তৃ্তীয় পক্ষ!!! যাদের ছোটবেলায় এত খেলনা ছিলনা, ছিলনা এত আয়োজন!!! ছিল খুব, খুউউউব কম… কয়েকটা মাত্র খেলনা! কিন্তু সেই খেলনাগুলোর উপর একছত্র আধিপত্যও ছিল বলীয়ান!!! child_ma1

স্বীকার্য যে তিন্নিদের ছোটবেলাটার অনেকটাই ভুলে ভরা!আমাদের শৈশব থেকে কয়েক’শ যোজন দূরে আস্তানা তাদের!!স্বীকার্য যে তিন্নিদের কাছে রোববারের দুপুরবেলার একদালান রোদ্দুর মাখা বনেদীয়ানা নেই,নেই বুড়ো বটগাছানিয়া শিকড়…!! আছে ভেসে চলা…!!! অনবরত!!অস্বীকার করা যাবে না  যে তিন্নিদের না পাওয়ার খাতা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রতিনিয়ত!!তবুও, তবুও তিন্নিদের পুরো ছেলেবেলা বা মেয়েবেলাটাই যে ভুলে ভরা বা আমাদের পুরো ছোটোবেলাটাতেই যে শুধু সবুজকালি; এমনটা উপসংহার টানাও ঠিক নয়!!!প্রত্যেক প্রজন্মেরই মনে হয় তাদের ‘বেলা’গুলোই শ্রেষ্ঠ!তাদের বড়ো হওয়াটাই সর্বোত্তম! তাদের পরের প্রজন্মের জন্য বরাদ্দ থাকে এক বাক্সকরুণা আর আগের প্রজন্মের জন্য ‘ইসস!! কী অল্ড ফ্যাশনড”-এর ঝোলা ভরতি বিরক্তি!!!এহেন আমিত্বের অবশেসনওয়ালা আজব অসুস্থ মানসিকতা আস্তাকুঁড় ছাড়া আর কোত্থাও থাকা স্বাস্থ্যকর নয়!

আর কিছুদিন পর তিন্নিরা ভুল করা শুরু করবে, শোধরাবো আমরা না ওদের তখন!! বরং ময়নাতদন্তের টেবিলে তুলবো ওদের ভুলগুলোকে, কাটাছেঁড়া করবো, দেখবো ওদের এই ভুলের পিছনে ওদের চাকুরীরতা মায়েদের কতটা দায় আছে, কতটা বিগড়েছে ওরা ইন্টারনেট হাতে পেয়ে…!!সস্তা সেন্টিমেন্টের সুরে তুলোধোনা করতে ভুলবো না য়ামরা কীভাবে ওদের মা-বাবারা নষ্ট করেছে ওদের!!! নিয়মটা আমাদেরই বানানো।। তাই শোধরাবেনা ভুল, লওওম্বা হবে ভুল,দোষ, অন্যায়ের লিষ্টিগুলো!! আমরাও গর্জাবো।।কিন্তু শোধরাবোনা নিজেদের বা তিন্নিদের!!!

‘ইন্টারনেট দূর হঠাও’ বা ‘মোবাইল তুমি নিপাত যাও’ কোনো সমাধান হতে পারেনা!! দায় বলুন বা দোষ, পুরোটাই তো আমাদের…!! আমরা সদ্য বয়ঃসন্ধির ইস্টিশনে গ্রীন সিগন্যাল পাওয়া ছেলেমেয়েগুলোর এক আ্যটাচি প্রশ্নদের এড়িয়ে যাবো গাম্ভীর্যের ধুয়ো দিয়ে, আর আশা রাখবো যে ওরা নিছকই কৌ্তূহলবশবর্তী হয়েও কোনো পর্ণ সাইটে হানা দেবেনা কোনোদিন এই তুমুল নেটম্যানিয়ার দুনিয়ায় থাকা স্বত্ত্বেও…!!  আমরা রাতদিন বিজ্ঞাপন বা সোশ্যালনেটওয়ার্কিং সাইটে পন্য হিসেবে তুলে ধরবো সমস্ত মেয়েদের, আমরা বাড়ীতে কানে shushuধরে শেখাবো পিতৃ্তান্ত্রিকতার সংজ্ঞা,প্রয়োগ ইত্যাদি… আর আশা করবো আমার ঘরের ছেলেটা কোনোদিনও ভিড় বাসে করবেনা অভব্যতা, আমার মেয়ের ওড়নায় যেন কোনো দিন পড়বে না কোনো হ্যাঁচকা টান!! আমরা সব্বাই আমাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে ‘থ্রি ইডিয়টস’ বা ‘ইচ্ছে’ দেখতে যাবো… আর বাড়ী ফিরে খাবার টেবিলে তুমুল তুলোধোনা করবো আমার মে্ডিক্যাল এন্ট্রান্স উতরোতে না পারা মেয়েটাকে…সেই আমরাই ছুঁড়ে ফেলবো আমাদের ছেলের ক্যানভাস বা রংতুলি যাতে সে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মন দেয়!! আমরাই তিন্নিদের উপর চাপাবো বোঝা; আমাদের অপূরনীয় প্রত্যাশার আর বইয়ের…!! আমরাই আশা রাখবো যে ওরা একসাথে নাচ-গান-পড়া-খেলা সব্বেতে এক নম্বর হবে!! আমাদের দ্বিচারিতা আমাদের ভুলতে শেখাবে যে ১ এর পরেও সংখ্যাছিল,আমরা ভুলে যাবো যে ভালো মানুষ হওয়াটাই শেষ কথা!!!! আমরাই ছাড়বো ওদের ইঁদুর দৌড়ের ধনতান্ত্রিকতার গুঁড়ো দিয়ে দাগানো ট্র্যাকে!!! আর তারপর যখন ওরা আরো চাই এর স্লোগান দেবে প্রত্যেকদিন… তখন আবার আমরাই দোষ চাপাবো জেনারেশনের গায়ে!!!আমরা বেমালুম ভুলে যাবো যে খুশী না হতে শিখিয়েছি আমরাই, হাতে ধরে; যখন ওরা ছোট  ছিল আর ওদের কোনো কাজেই সন্তুষ্টির আস্বাদন পাইনি আমরা !!

অতএব বদল চাই, বদল চাই দৃষ্টিভঙ্গীতে, বদল চাই তিন্নিদের মতো সমস্ত দেড়ফুটিয়া বা দুফুটিয়াগুলোকে্ পাঁচফুটিয়া  করায়…!!বদলাতে হবে আমাদের!! আমাদের দাদু-ঠাকুমাদের কালে টেলিফোন ছিলনা, আমাদের বাবা-মায়েদের বড়ো হওয়া ভাগ হয়ে যাইনি মোবাইলে,আমাদের ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’ আ্মাদের বাবা-মাএরা ইউটিউব না দেখেই শিখিয়েছেন… তা বলে কী এই প্রত্যেকটা সময় ফ্রেমে বখাটে ছেলে ছিল না??? ধর্ষন ছিল না?? ছিল না আ্যসিড হানা???ছিলনা বুঝি বেকারত্ব বা প্রেম করা!! আলবাৎ ছিল।।অন্য খাপে ছিল হয়তোবা!!খারাপ, কালো যা কিছু;সওওওব ছিল সাদাদের গা ঘেঁষে, আছে আর হয়তো বা থাকবেও যদি এখনো আমরা নিজেদের না বদলে সমস্ত দায়-দোষ-ঘাট প্রযুক্তি, গ্লোবালাইজেশন বা অন্য কিছুতে চাপাই!!যা কিছু নতুন তাকে অস্বীকার করার জন্য কোনো খোপ নেই, আছে সুযোগ অভিযোজিত হবার,বড়ো হওয়ার বা নিজেদের বেঁচে থাকার কারুকৌশলে অল্প রদবদলকরার!!

তবে তিন্নিদের বিপদ কিন্তু আসন্ন!! ওদের শৈশব কিন্তু নিশ্চিৎ ধুঁকছে…!!একটু পদস্থলন আমাদের, আর ওদের ছোটবেলা ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ কাটা পড়বে!! উধাও হবে তো তখন মৃত শৈশবের আঁশটে গন্ধ আমাদের হাত থেকে??!