আমার দুই শহর

জয়দীপ দে শাপলু

জয়দীপ দে শাপলু

শুকনো এলাকায় বড়ো হয়েছি। তেমন নদী দেখা হয়নি। নদী দেখার লোভে কিছুদিন আগে বরিশাল গিয়েছিলাম। ভরা বর্ষায় নৌপথে এতোটা পথ পাড়ি দেব, একটু ভয় ভয়ই করছিল।যাত্রাটা কিভাবে একটু নিরাপদ করা যায়, সে নিয়ে খুব ভাবনায় ছিলাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদেরসাথে শলা পরামর্শ করি। তাদের বুদ্ধিতেই ঠিক হলো ঢাকা হয়ে যাবো। নইলে চাঁদপুর হয়ে দ্রুত ও কম খরচে যাওয়া যেত। সদরঘাটে আসা পর্যন্ত মনেরভেতরে একটা দ্বিধা ছিল। জাহাজের ভেতরটা কেমন না কেমন হয়। মাঝ নদীতে যদি রোলিং শুরু হয়; আমি তো হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়েই অক্কা যাব।
জাহাজে পা দিয়ে আক্কেলগুড়–ম। এ কি দেখছি!হাজার ঝাড়াবাতিতে আলোকিত এক রাজপ্রাসাদ। বরিশালের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে আমার দীর্ঘদিনের যে ধারণা ছিল তাতে ছেদ পড়ল।এর আগে বরিশালের লোকজনকে নিয়ে বড়ো মায়া হত। এদের রেল লাইন নেই। নেই ভালো সড়ক যোগাযোগ। ঈদের সময় দেখতাম ধুপধাপ লঞ্চগুলো ডুবে যায়। পিঁপড়ার মতো মানুষ মরে। কিন্তু

অক্সফোর্ড মিশন চার্চ,

অক্সফোর্ড মিশন চার্চ,

প্রথম বরিশালের পথে যাত্রা করেই অনুভূতিটা হলো বিপরীত। আফসোস জাগলো, চট্টগ্রাম ঢাকা অথবা চট্টগ্রাম সিলেট রুটে কেন লঞ্চ নেই। ঢাকা-বরিশাল রুটের সবচেয়ে বিলাসবহুল লঞ্চ সুন্দরবন ১০-এ রুম বুকিং ছিল। মাত্র এক হাজার টাকায় পেলাম এসি কেবিন। কেবিনে সফেদ সাদা কম্বলসহ বেডিং, টিভি, আলমারি… মনে হলো জলের উপর একটা হোটেলের কামরা। জানালা খুললেই প্রমত্তা নদী। আবার করিডরে চেয়ার সাজানো। চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে নদী দেখা। ডোরবেল চাপলেই রুম সার্ভিসের বয়। রুমে রাতের খাবার এনে দেয়। ঝকঝকে তকতকে তৈজস্বপত্র। এতো তাজা ইলিশ মাছ ভাজা কত দিন পরে খেলাম ঠিক করে বলতে পারছি না। এই খাবারের লোভে আরেকবার লঞ্চে উঠতে হবে। কোন যানজট নেই। নেই দূষণ। নেই ঝাঁকুনি। নেই বিকট আওয়াজ। একটা মসৃণ ও আরামদায়ক যাত্রা হলো রাতভর। ভোর আলো ফুটতে না ফুটতেই বরিশাল পৌঁছে গেলাম। এতো আরামের যাত্রা আর কোন পথেই সম্ভব নয়। হয়ত ভাবছেন ঝুঁকির কথা। ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়েতে প্রতি এক হাজার জন ভ্রমণ করলে কত জন দুর্ঘটনায় পতিত হয়, তার সঙ্গে নৌরুটের দুর্ঘটনার হারকে তুলনা করলে নৌপথকেই নিরাপদ মনে হবে। অথচ নদীমাতৃক এই দেশে নৌপথটাই সবচেয়ে অবহেলিত। নৌপথগুলোকে যদি আমরা ঠিকমতো সংরক্ষণ করতে পারতাম, তাহলে লোকজন অল্প খরচে (মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকায় লোকজন ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে পারে) আরামদায়ক যাত্রা করতে পারত। এলোমেলো রাস্তাঘাট আর রেল লাইনের কারণে বন্যা সমস্যা প্রকটও হতো না। বরিশাল গিয়ে শুনলাম চট্টগ্রাম বরিশাল রুটে শিঘ্রই জাহাজ চালু হচ্ছে। খুবই ভালো খবর।
লঞ্চের ডেকে বসেই বরিশালের লোকজনের সাথে কথা হচ্ছিলো। তারা তাদের শহর নিয়ে খুব গর্বিত ও আশাবাদী। বিশেষ করে পদ্মা সেতু আর পায়রা বন্দর হয়ে গেলে পাল্টে যাবে বরিশালের চেহারা। তাদের মতে, চট্টগ্রামের ঘাড়ে এসে উন্নয়নের নিঃশ্বাস ফেলবে বরিশাল। তারা বারাবার বলছে, ‘শহরটায় গেলে বুঝতে পারবেন, শহরটাকে কি সুন্দর করে দিয়ে গেছেন হিরন সাহেব।’ হিরন সাহেব হলেন শওকত হোসেন হিরন। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র। গত ৯ এপ্রিল তিনি মারা গেছেন। তারা যেমন সাবেক মেয়রের প্রশংসা করছিলেন, তেমনি নগর পুলিশের। বিশেষ করে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের। একজন একটু মজা করে বললেন, ‘শহরে কোন কালো ধোঁয়া নির্গত হওয়া গাড়ি পাবেন না। পুলিশ নাকি ড্রাইভারদের বলে, কালো ধোঁয়া ছাড়ার ইচ্ছা থাকলে তোর বাড়িতে গিয়ে ছাড়, রাস্তায় না।’

ব্রজমোহন কলেজ

ব্রজমোহন কলেজ

লঞ্চ ভোরে ঘাটে এসে ভিড়লেও সকাল সাতটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম গাড়ির জন্য। শহরে পা রাখতেই একটা বিস্ময়ানুভূতি ঘিরে ধরল আমাকে। শেষমেশ জীবনানন্দ মুকুন্দ দাস শেরেবাংলার বরিশালে এসে পড়লাম। আর যে নদী থেকে ঘাটে নামলাম সেটা কীর্তনখোলা। সেলিম আল দীন- মহাদেব সাহার কীর্তনখোলা। আশেপাশেই আগুনখোলা বিশখালি আড়িয়ালখাঁ!
শহরটাকে ভালো করে দেখার জন্য বিকেলে বেরুলাম। প্রথমে ফিশারি ঘাট থেকে নৌকায় চড়লাম কীর্তনখোলা দেখার জন্য। প্রমত্তা কীর্তনখোলা।মহাদেব সাহার ভাষায়-

দ্যাখো এই বর্ষাকাল, গাঁ-গেরামে ফুঁসে ওঠে নদী
হাঁসেরা নেমেছে জলে আমাকে বিভোর করো যদি,
কীর্তনখোলার বুকে উঠিয়াছে পূর্ণিমার চাঁদ
সেখানে পরানসখা-তুমি আমি দুজনে বিবাদ।

উজানের জলের স্রোত ছিল প্রবল। তাই টইটম্বুর কীর্তনখোলা। দুপাশে ঘন সবুজ বন বাদাড়। ঝালকাঠির দিকে বড়ো বড়ো জাহাজ যাচ্ছে একটু পর পর। দূর থেকে রাজহাঁসের মতো দেখায়। মাথার ওপর ঘন কালো মেঘ। মহাদেব সাহার বর্ণনার সাথে খাপে খাপ মিলে যাচ্ছিল। রোমান্টিক একটা বাতাস বইছিল। শান্ত নিরুপদ্রব একটা নৌভ্রমণ হলো। ভাবছিলাম, এই কীর্তনখোলায় নৌভ্রমণকে ঘিরে বিরাট পর্যটন ব্যবসা করা যায়। যেমনটা করা যায় কর্ণফুলীতেও। তবে যেটা লক্ষ্য করলাম চট্টগ্রাম-ঢাকার মতো এখানে এখনো নদীর দুধারে দখল ও দূষণের উৎসব লাগেনি। কদিন থাকবে এমন কে জানে।
নদীর তীরে ছোট্ট একটা পার্ক হয়েছে। নাম মুক্তিযোদ্ধা পার্ক। পার্কটা ছোট্ট, কিন্তু রুচির সংকট নেই। সুন্দরকরে গাছ লাগানো। রাস্তাগুলোতে যত্নের ছাপ। সবচেয়ে ভালো লাগলো ছোট্ট একটা পরিচ্ছন্ন শৌচাগার দেখে। লোকজন তা ব্যবহার করছে। নষ্ট করছে না। পার্কে অনেকগুলো বিন। বিনের বাইরে তেমন একটা ময়লা নেই।

মুক্তিযোদ্ধা পার্ক

মুক্তিযোদ্ধা পার্ক

পার্ক থেকে বেরিয়ে বান্দ রোড ধরে হাঁটলাম। ছোট্ট শহরের তুলনায় অনেক প্রশস্থ রাস্তা। একটু হাঁটতেই আরেকটা পার্ক চোখে পড়ল। প্ল্যানেট পার্ক। আরো একটু যেতেই চোখে পড়ল সুন্দর একটা মাঠ। মাঠের চারপাশে ইউরোপের মতো করে ছাটানো গাছের সারি। আবার মানুষের হাঁটার রাস্তা। মাঠটার কোথাও উচু নীচু নেই। সবুজ ঘন ঘাসে ছাওয়া। ভাবতে অবাক লাগছে বাংলাদেশের একটা মফস্বল শহরে এতো সুন্দর একটা মাঠ আছে। আমার এক সহকর্মী বললেন,‘আজ থেকে ১০ বছর আগে এই মাঠের ছবি যদি দেখতেন, তাহলে বুঝতেন কি জিনিস কি হয়েছে।’ পাশেই চমৎকার একটা লেক। ১০ মিনিট রাস্তায় হেঁটেই বুঝতে পারলাম, এ শহরের মানুষের আর কিছুর অভাব থাকুক বা না থাকুক, মুক্ত বাতাস আর ঘুরে বেড়ানোর জায়গার অভাব নেই। আমার শহরের সব উন্মুক্ত স্থানগুলো ঢেকে ফেলেছি এটা ওটা বানিয়ে। মনটা বিষাদে ভরে গেল।
পরদিন আরো ঘুরলাম। সারা শহর জুড়ে প্রশস্থ রাস্তা। রাস্তার মধ্যে ডিভাইডার জুড়ে গাছের সারি। কিছু দূর পর পর দৃষ্টি নন্দন স্থাপত্য আর ফোয়ারা। কোথাও উলঙ্গ নালা নর্দমা দেখলাম না। দেখলাম না ময়লার স্তূপ। শহরের একেবারে ঘিঞ্জি এলাকায় মনোমুগ্ধকর একটা পুকুর দেখে অবাক হয়ে গেলাম। নাম বিবি পুকুর। একসময় কাঁচা বাজারের ময়লা ফেলবার জায়গা ছিল এটা। অনেকটা আমাদের আসকরদীঘির মতো। এখন চারপাশ সুন্দর করে বাঁধানো। রাতে আলোর ব্যবস্থা। আছে ফোয়ার। ছবি তুলে বিদেশের কোন জায়গা বলে চালিয়ে দেয়া যাবে দিব্যি। পুরো বরিশাল শহর জুড়ে এরকম অসংখ্য পুকুর। আমার চোখে পড়ল এমন ক’টা: কাটপট্টি থানা পুকুর, কালেক্টর পুকুর, পুলিশ লাইন পুকুর, রাজা বাহাদুর রোডের পুকুর, পরেশ সাগর, ব্রজমোহন কলেজে ৬ টি পুকুর। সবগুলো পুকুরেই কমবেশি সৌন্দয্যবর্ধনের কাজ করেছে সিটি কর্পোরেশন। আর আমার শহরের পুকুরগুলো টং দোকানের আড়ালে হারিয়ে গেছে। ঘাট বাঁধা আর ফোয়ারা তো দূরে থাক, কুচুরীপানা পরিস্কারের কেউ নেই।

বিবি পুকুর

বিবি পুকুর

যত দেখি আফসোস বাড়ে। বরিশালের নদী ছাড়া আছে কি? আমাদের নদী আছে, পাহাড় আছে, আছে সমূদ্র। অথচ আমাদের এই শহর দিন দিন মলিন হয়ে পড়ছে। আর বরিশালের রূপ-যৌবন যেন ফেটে পড়ছে।  নগরবাসী যদি তাদের শহরের প্রতি সচেতন না হতেন, পুকুর নর্দমায় পুরনো অভ্যাসমতো ময়লা আবর্জনা ফেলতেন, তাহলে এই সৌন্দর্য ধরে রাখা যেত না। কথায় আছে না, অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন।
বরিশালের লোকজনের সচেতনতার স্তর কোন পর্যায়ের তার একটা উদাহরণ দেই। গেলো ৩ সেপ্টেম্বরবরিশালের সাধারণ মানুষজন ফেসবুকের মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে দারুণ একটা কাজ করেছে। তারা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত জেল খালটি দখলমুক্ত করেপরিস্কার করে ফেলেছে একদিনে। পাক্কা তিন কিলোমিটার খাল। চিন্তা করা যায়। শহরের সাধারণ মানুষ মানে ছাত্র শিক্ষক চিকিৎসক আইনজীবী শ্রমজীবী- এরাই। আমাদের মতো এরা পত্র পত্রিকায় বিশেষজ্ঞ মতামত দিতে যায়নি। সিটি কর্পোরেশন বা সরকারের ভুল ধরতেও না। নিজেরা কিছু করে দেখিয়ে দিয়েছে তাদের সক্ষমতা।
মানুষ সুন্দর না হলে শহর সুন্দর হতে পারে না। বরিশালের এই দৃষ্টান্ত চট্টগ্রামের মানুষও গ্রহণ করতে পারেন।