মোটর সাইকেল ডায়রী …১

সুব্রত গোস্বামী

সুব্রত গোস্বামী

গতবছর কালী পুজোর দিন তিনেক পেরিয়েছে সবে। তখনও শহরে শীত ঢোকেনি। বেরিয়ে পড়লাম চারজন। মোটরবাইক নিয়ে। প্ল্যান, উড়িষ্যার গোপালপুর অন্ধ্রের আরাকু হয়ে ছত্রিশগড়ের চিত্রকূট গিয়ে আবার উড়িষ্যায় ঢুকে সাতকোশিয়া, বাংরিপোসি হয়ে বাড়ি। দিন দশেকের হিসেব। রিটার্ন টিকিটের হ্যাপা নেই, কোথাও থেকে যেতে ইচ্ছে হলে দিন বাড়বে। একটা বেড়ানোকে স্বর্গীয় উচ্চতায় পৌঁছে দিতে এর থেকে বেশি আর কী প্রয়োজন। চারটে বাইক, পেছনে স্যাডল ব্যাগ আর চারজন সওয়ার। রানাদা, অশোকদা, চির আর আমি। অন্যবারের মত ভাল্লাগছেনা বলে একটু বেরিয়ে পড়ে, দূরে গিয়ে কলকাতার জন্য মন কেমন করাবো, আর আবার ছুটে আসব বলে এই বেড়ানোটা ছিলনা কিন্তু। আইআরসিটিসিতে দু-মাস আগে টিকিট বুকিং, মিডল বার্থের লোকটা সাড়ে আটটা অব্দি ঘুমোবে বলে থ্রি-টায়ারে ঘাড় নিচু করে বসে থাকা, সাইট-সিয়িং এর গাড়িতে সামনের সারির উইণ্ডো সিট না পাওয়ার যন্ত্রণা, এসব কোনো কিছুর পরোয়া ছিলনা এ জার্নিতে। হ্যাঁ জার্নি। চলার পথে যে জায়গাটা চোখে ধরবে সেখানেই থমকে গিয়ে তাকে মনে ধরানোর জার্নি। চলতে চলতে যেদিকে চোখ যায় সেদিকে চেয়ে থাকার জার্নি।

গোপালপুর যাবার পথে আমাদের বাইক

গোপালপুর যাবার পথে আমাদের বাইক

বোম্বে রোড দিয়ে যাওয়া আর আজাদ-হিন্দ-ধাবায় ব্রেকফাস্ট করার রীতির অন্যথা এবারেও হলনা। সেই একই মেনু, তন্দুরী রুটি, তড়কা, মিক্সড ভেজ আর অমলেট। ও হ্যাঁ চা-ও ছিল। চাখেয়েই আবার বাইক স্টার্ট দেওয়া। আজকের গন্তব্য ভদ্রক ছাড়িয়ে চণ্ডিখোল। কটকের কাছেই একটা জায়গা। চণ্ডিখোল পৌঁছতে পৌঁছতে রাত সাড়ে-আটটা বেজে গেল। জীবনের এক দশমিক এক পাচতম লং বাইক জার্নির প্রথমেই একদিনে চারশ ষোলো কিলোমিটার বাইক চালিয়ে ফেললাম। আসলে প্রথমে ঠিক হয়েছিল ভদ্রকে থাকা হবে। ভদ্রক আমরা বিকেলে আলো থাকতে থাকতেই পেরিয়ে এসেছি। বন্ধু রাজুদার কাছে এই পথের অভিজ্ঞতা আমরা শুনে এসেছিলাম। ওরা যখন এসেছিল চণ্ডিখোলের যে হোটেলে ছিল, আমরাও সেই হোটেলটাই খুঁজে বের করলাম। জমজমাট জায়গায় হোটেল। সস্তার শেষ কথা। চার’শ টাকায় অত বড় বড় মাথা খুঁড়লেও পাওয়া দায়। এখানে শুধু রাতটুকু কাটিয়ে পরদিন ভোর ভোর বেরিয়ে পড়তে হবে গোপালপুরের উদ্দেশ্যে। অতএব খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়াই ভালো। তবে ঘুমোনোর আগে আমার এক দশমিক এক পাচতম লং বাইক জার্নির ব্যাপারটা খোলসা করে দিই। বছর আটেক আগে বউ নিয়ে একবার মন্দারমণি আর একবার অ্যাডভেঞ্চার কোর্সের গেট-টুগেদারে কৃষ্ণনগরের বনগ্রাম। এটাকে এক ধরলে ওগুলোকে যথাক্রমে দশমিক এক আর দশমিক শুন্য পাঁচের বেশি ধরতে পারছিনা।

কাকভোরে চণ্ডীখোল ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। বেশ কিছুদূর বাইকিং করার পর চিলিকার কাছাকাছি একটা জায়গা‍য় এসে দাঁড়িয়ে দেখলাম হাইওয়ের ধারের সৌন্দর্য্যেরা হাত বাড়িয়ে আছে জড়িয়ে ধরবে বলে। আগের দিনের বেশকিছুটা পথ অতিরিক্ত চালিয়ে ফেলা, পরদিন আমাদের সময় নষ্টের বিলাসীতা করার একটা অনুমোদন দিয়েই রেখেছিল। জানা নেই সামনে কত সৌন্দর্য্য অপেক্ষা করছে। যা দেখছি তাতেই বিভোর হয়ে ক্লিক শব্দে ছুটে চলা ট্রাকের আওয়াজকে টেক্কা দিচ্ছিলাম আমরা। হেলেদুলেও দুপুর দুপুর গোপালপুর পৌঁছব সেটুকু বিশ্বাস সকলেরই ছিল। যাক চোখ, ক্যামেরা ও মোবাইল দিয়ে প্রকৃতি দেখার পালা চুকিয়ে আবার বাইক স্টার্ট দিলাম আমরা।

বিকেলের গোপালপুর।

বিকেলের গোপালপুর।

মসৃণ রাস্তার প্রশংসা করতে “মাখন-এর মত” ছাড়া অন্য বিশেষণ খুঁজে না পেয়ে বলতেই হচ্ছে, “মাখনের মত রাস্তা”। এমন মাখনসম পথে আশি-নব্বইয়ের নীচে গাড়ি চালানোই দায়। মসৃণ হাইওয়ে মিশে যায় দূরের পাহাড়ে, আর আমরা চলতে থাকি। সিনিক বিউটিরা কখোনো আবার ডানপা টাকে ব্রেক লিভারে চাপ দিতে বাধ্য করায়। চলতে থাকে ফটো সেশন। খানিক বিশ্রামের পর আবার চলা। গোপালপুর পৌঁছনোর আগে পরিচয়গুলো আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। তখন তো শুধু নাম জানানো হল। রানা রায়। অভিজ্ঞ বাইক রাইডার। লাদাখ, বার তিনেক জুলুক, গুরুদোংমার এমনকি এই রুটের অর্ধেকটার অভিজ্ঞতাও রয়েছে ঝুলিতে। বাহন তিনশ পঞ্চাশ সিসির এনফিল্ড বুলেট।

অশোক নন্দী। শিলিগুড়ির মানুষ। তিনশ পঞ্চাশ সিসির এনফিল্ড বুলেটখানা কোলকাতায় টেনে এনে আবার বেরোনো। ফিটনেসের প্রশংসনীয়। বাড়ি থেকে অফিসের দুরত্ত্ব তিনশ মিটার বলে বাইক চালানোর অভ্যেস কম। তবু সাহস করে এত বড় ট্রিপ। এটাই প্রথম বাইক এক্সপিডিশন।

চিরঞ্জীব দাস। আমাদের চির। বাইক নিয়ে একদিনে কালিঙপং একদিনে বেনারস, এমনকি ট্রেন মিস করে বাইক নিয়ে মুন্সিয়ারি পৌঁছনোর রেকর্ডও রয়েছে। তাছাড়া লাদাখ, ব্যাঙ্গালোর, গুরুদোংমার, জুলুক, আর এই রুটের অর্ধেকটার অভিজ্ঞতা তো রয়েইছে। দুশো তেইশ সিসির হিরো করিজমা।

আর আমি। সুব্রত। সম্বল আমার এক দশমিক এক পাচ বারের অভিজ্ঞতা, সঙ্গী একশ সিসির বাজাজ ডিস্কভার আর বাকি তিন বন্ধু।

গোপালপুর হোটেলের বারান্দা থেকে তোলা।

গোপালপুর হোটেলের বারান্দা থেকে তোলা।

হেলে দুলে পৌঁছে গেলাম গোপালপুর। গোপালপুর অন সী। এখানে আজ রাত্রিবাস। আবার কাল সকাল পাঁচটায় ওঠা, তৈরি হয়ে নিয়ে ছটায় নতুন গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেওয়া। এই রুটিনটা কিন্তু গোটা ট্রিপেই আমাদের মেনে চলতে হয়েছে। আসলে উৎশৃঙ্খল হতে গেলেও একটা শৃঙ্খলা থাকা দরকার। গোটা ট্রিপে যে রুটিনটা আমরা মেনে চলেছি সেটা একবার বলে নিই বরং। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠা। “কাল সকালের চা-টা আমিই বানাবো” এই সংলাপটিও নিজেদের অবচেতনে নিয়ম মেনেই বলেছি আমরা। প্রশন হল চা কিসে বানালাম। আসার আগে বৌদি, মানে অশোকদার বউ অর্প্যাটের একটা ইলেকট্রিক টি কেটলি আমাদের চারজনের উদ্দেশ্যে উপহার দিয়েছিল। বর আসলে টি-টেস্টার। বৌদি ভালো করেই জানত টেমি টি-গার্ডেনের বাছাই করা পাতা ভেজানো চা নাহলে বরের ঘুম ভাঙেনা। তা যাই হোক, চা খেয়ে তৈরি হয়ে নিয়ে ঠিক ছটার সময় বাইক স্টার্ট। পথে জলখাবার, পথেই দুপুরের খাবার। এভাবেই আলো থাকতে থাকতে সেদিনের গন্তব্যে পৌঁছনো।

গোপালপুর পৌঁছে সমুদ্রের ধারে একটা পুরোনো হোটেল আমরা নিজেরাই পছন্দ করে নিলাম। ঘর খালি আছে কি না জানিনা, পছন্দ তো করে নিই আগে। রানাদা আর চির আগে এখানে থেকে গেছে। দু-তলা বাড়ি, পাশে বিরাট খালি জায়গা আর সামনে সমুদ্র। চির বলল ঘরে শুয়ে শুয়ে সমুদ্র দেখা যায় নাকি। আমাদের পছন্দের ওপর সবটুকু নির্ভর করে বসে নেই বুঝলাম। জনমানবহীন হোটেলে দেখলাম ম্যানেজার কেয়ার-টেকার নামক বস্তুটিও উধাও। সাইনবোর্ডে লেখা নম্বরে বার-তিনেক ফোন করে বেজে গেল। অন্য একটা হোটেল খুঁজে নিলাম অগত্যা। ভালো, তবে হোটেলের ঘরে শুয়ে শুয়ে সমুদ্র দেখা যায়না। দুপুরে একটা ফাটাফাটি খাওয়াদাওয়ার পর আমি আর অশোকদা ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। রানাদা আর চির সি-বিচে হেঁটে এসে বলল, “খোঁজ নিয়ে এলাম প্রতিদিন এখানে কাবাব বসে না।”  যাহ্‌। গোপালপুর ঢোকার আগে থেকে রানাদা বলে আসছিল যে এখানে নাকি সি-বিচে ‘অসসসসাধারণ সুন্দর’ কাবাক পাওয়া যায়। রাতে পেটপুরে কাবাব খাওয়া হবে। “সে গুড়ে বালি”র মত সে কাবাবে কি দিলে দুঃখটাকে ভালোভাবে বোঝানো যাবে বুঝতে পারছিনা। তবে রাতে দুপুরের মত আবার একটা ভালো-খানা জুটে গেল। সঙ্গে উড়িষ্যার বিখ্যাত ছানাপোড়া। বেকড ছানা। জিভকে এক অপূর্ব আরামের মুখোমুখি করা। হোটেলের বিছানায় গা এলানোর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল। কাল ভোরেই গোপালপুরকে বিদায় জানাতে হবে।

রুটিন মাফিক ভোরে ঘুম থেকে উঠে সমুদ্রসৈকতে একটু পায়চারি করে এলাম। যা বুঝলাম

শ্রীকাকুলামে রাণা আর চির

শ্রীকাকুলামে রাণা আর চির

সমুদ্রকে সাক্ষী রেখে একটা সেলফি না নিলে অন্যায় হয়ে যাবে। অতএব সেলফি স্ন্যাপন এবং পরবর্তি গন্তব্যের উদ্দেশে গমন।

এই জায়গাটার নাম শ্রীকাকুলাম। অন্ধ্রপ্রদেশ। ব্রেকফাস্টের মেনু আর মোবাইলে “ওয়েলকাম টু ভোডাফোন এপি অ্যাণ্ড তেলেঙ্গানা” মেসেজটা আগামী কদিনের খাবারের একটা আগাম রূপরেখা দিয়ে রাখল। জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ার কিছু পরেই বৃষ্টি নামল। রেনকোট পরে বাইক চালাতে চালাতে সে ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। তাই দেখানো গেলনা।

৫নম্বর ন্যাশনাল হাইওয়ে ছেড়ে বিজয়নগরম পেরিয়ে তখন আমরা টাইডার পথ ধরেছি। বৃষ্টি চলছে। প্রায় দুশো কিলোমিটার রেন বাইকিং যেন ট্রিপটাকে একটা অন্য মাত্রা দিল। হয়ত দিনটাই বাড়তি কিছু পাওয়ার দিন ছিল। চিরর জিপিএসে ধরা পড়ল কাছেই একটা জলাধার আছে। থাটিপুড়ি লেক। ঝিরঝিরে বৃষ্টির সঙ্গে শনশনে হাওয়া। চোখের সামনে মুক্ত প্রকৃতি। আর কিছুক্ষণ নিশ্বাস নিই বরং। .

বৃষ্টি মাথায় নিয়েই পৌঁছলাম টাইডা। এপিটিডিসির রিসর্ট। আগে থেকেই বুক করে রেখেছিল চির। পাহাড়ি জঙ্গলের ভেতর অসাধারণ এক বাংলো। আমরা ঘর পেয়েছি একদম টঙে। একবার ঠেঙিয়ে উঠলে আর নামতে ইচ্ছে করেনা। ডাইনিং হল থেকে আমাদের রুমে ঠেঙিয়ে উঠতে উঠতে আবার ক্ষিদে পেতে বাধ্য।   আমাদের আজকের রাত্রিবাস এখানেই। এর ফাঁকেই ভিজে যাওয়া সবকিছু যতটা পারা যায় শুকিয়ে নেওয়া। পরদিন আবার এক রুটিন। পাঁচটায় উঠে তৈরি হয়ে নেওয়া। অনন্তগিরি, আরাকুভ্যালি, কোরাপুট দেখতে দেখতে পৌঁছতে হবে জগদলপুর। সেখান থেকে চিত্রকূট।

বলেছিলামনা, প্রকৃতি যেখানে চাকার লাগাম টেনে ধরে। তেমনই একটা জায়গা। অনন্তগিরির আশেপাশে। পুরো রাস্তাটাই যেন ভিউপয়েণ্ট। আবার বাইক স্টার্ট দেওয়া, আবার চলা শুরু। আবার থামা আবার চলা এভাবে কখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছি, মালুম হচ্ছেনা।(চলবে)

 a