‘রূপান্তরের ঘোড়া’ এবং কবি ফেরদৌস নাহার

আন্জুমান রোজী

কবিতায় যিনি ব্রতী হয়েছেন, বেঁধেছেন জীবন কবিতার অনুরণনে। যিনি বলেন, আমি কবিতা শ্রমিক এবং কবিতা আমার বেঁচে থাকার অনুষঙ্গ, তিনি কবি ফেরদৌস নাহার। দেশ সমাজ মানুষ প্রকৃতি রাজনীতি দ্রোহ বিদ্রোহ সবকিছু মিলিয়ে মানুষের যে জীবন, তার নির্যাসটুকু তুলে এনেছেন কবিতায়।
তার কবিতা সমসাময়িক থেকে চলে যায় সুদূর অতীতে, ভর করে নস্টালজিয়া, যেন বৃষ্টিমুখর স্মৃতিকথা ভিজিয়ে দেয় মনের উঠোন। নির্দিষ্ট এক ছায়ারেখা এঁকে চলে যান দিগন্তের দিকে ভবিষ্যৎ সেখানে পরাহত। কারণ, বর্তমান ঘটনার অঘটন প্রবাহে কবি প্রায়ই মুহ্যমান থাকেন। অন্তহীন সমস্যার ডামাডোলে কবিতায় প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। আবার কখনো ভালোবাসায় পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেন। কবিতাও হয়ে ওঠে মায়াময়। আশানিরাশা আর হতাশা এবং নিত্য নতুন দীর্ঘশ্বাসের ডালী সাজিয়ে শব্দ গাঁথেন কবিতাছন্দে। এভাবে কবিতার দীর্ঘপথ ধরে হেঁটে চলেছেন কবি। ভবঘুরে মনটা বাঁধেননি কোথাও, বাহির পথে পা রেখে চলতে চলতে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন পৃথিবীর অপর প্রান্তে।

ferdous-pic-229x300

কবি ফেরদৌস নাহার

দেশছাড়া হয়েও কবি ফেরদৌস নাহার থেমে যাননি। তার মননে মগজে কবিতার বীজ বপন হয়ে আছে। তাই ভিনদেশে বসেও লিখে যাচ্ছেন দেশবিদেশের মিশ্র অনুভূতি মাখা ফিউশন কবিতা। তেমনই আবেদনে এবারের নতুন সৃষ্টি, ‘রূপান্তরের ঘোড়া’ কবিতাগ্রন্থটি। যেখানে সময়ের বিবর্তনকে ধরেছেন শব্দমালায়। ‘রূপান্তরের ঘোড়া’ কবিতাগ্রন্থটি প্রসঙ্গে কবি নিজেই বলেন, কবিতাপথ চলায় বাঁক পরিবর্তনের কাব্যগ্রন্থ। সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে,ভিন্ন ভাবের আবির্ভাবে গ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় নতুন এক মাত্রার উন্মেষ ঘটেছে। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে ছুটে গেছেন কবি, তুলে এনেছেন মানুষ এবং জীবনের এপিটাফ। অতীতকে তুলে এনে বর্তমানকে ভেঙ্গেছেন। কবি কমলা রোদের খোঁজে আইসবার্গ ভাংতে চেয়ে বলেন, ‘আইসবার্গ ভেঙ্গে দিলে নিশ্চয়ই শেষ হবে রক্তবাসনা’;  চলে ‘অ্যাকুয়া অ্যাকুস্টিক খেলা’; কবি বলেন,
“ঘুমাতে ঘুমাতে এত যে বিষমন্ত্রের ছবি এঁকে যাই
তাও তো ভাঙে না
ঘুম জীবন শুয়ে আছে মরফিন মিডিয়ায়”
(অ্যাকুয়া অ্যাকুস্টিক খেলা)

কিম্বা নিজেকে যখন আর এই পৃথিবীর মানুষ ভাবা যায় না তখন কবি ভাবেন,
“তীব্র নেশার ঘোরে কেটে যাচ্ছি বাতাসের নাড়ি,সঙ্গম যন্ত্রণা
উজার করে গিলছি হাজার হাজার ক্রীতদাস আগুন এবং
মরচে ধরা সিংহ দরজায় উড়িয়েছি বুদ্ধের রংহীন চীবর”
(ভিনগ্রহে পাঠিয়েছি বখাটে সংবাদ)

সময়ের গতিকে ধারণ করতে গিয়ে কবি দেখেন সময়ও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে আছে, ঠিক যেন এভাবে,
“ছায়া নামে, মুছে যায় ল্যান্ডস্ক্যাপ গতি
তুলির হালকা চাল এঁকে যায় হারানো বিজ্ঞপ্তি
কোলাহল প্রাচীন পাথর সরিয়ে ডেকে আনে
গোলকধাঁধার স্বর, লাগাতার নিবিড় ফাটল”
(ল্যান্ডস্ক্যাপ গতি)

জীবনযবনিকার ঘণ্টাধ্বনিও বেজেছে কবির কবিতায়,
“এখন প্রতিদিন মৃত্যুদিন
বারান্দা থেকে মৃত্যু আসেছে
আকাশের তারা থেকে মৃত্যু নামেছে
উৎসবের ঘাটে এসে থেমেছে মৃত্যু জাহাজ ”
(বিমূর্ত টান)

আবার স্মৃতির পাহাড় ডিঙ্গিয়ে তেপান্তরে ছুটে কবি পরিবর্তনের অহর্নিশি রূপটিই দেখেছেন বেশী, যা উত্তরাধুনিক কবিতায় বা পোস্ট মর্ডানিজমের ধারায় তুলে ধরা যায়। শব্দের ব্যবহারে এনেছেন নতুনত্ব। সহজ সরল শব্দ সম্ভারে সাজানো ‘রূপান্তরের ঘোড়া’ গ্রন্থটি। গ্রন্থটির প্রচ্ছদও অনেক কথা বলে। কালি ও রঙয়ের আঁচড়ে এক অভূতপূর্ব কবিতাবিস্ময় ফুটে উঠেছে। প্রচ্ছদশিল্পী একজন গ্রীকবাসী এবং কবিবন্ধু ক্যাতেরিনা দ্রামিতিনো। সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘রূপান্তরের ঘোড়া’, পাওয়া অনুপ্রাণন প্রকাশন।

‘রূপান্তরের ঘোড়া’ কবিতাগ্রন্থটি ছাড়াও কবি ফেরদৌস নাহারের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত আরো অন্যান্য কবিতাগ্রন্থগুলো হলো, ছিঁড়ে যাই বিংশতি বন্ধন(চর্যাপদ ১৯৮৬), সময় ভেঙ্গেছে সংশয় (নিখিল ১৯৮৭), উলঙ্গ সেনাপতি অক্টোপাস প্রেম (নসাস ১৯৮৮), দেহঘর রক্তপাখি(চর্যাপদ ১৯৯৩), সমুদ্রে যাবো অবিচল এলোমেলো(বিশাকা ১৯৯৬), বর্ষার দুয়েন্দে (শ্রাবণ ২০০০), উদ্ধত আয়ু(অন্যপ্রকাশ ২০০৯), বৃষ্টির কোনো বিদেশ নেই (ভাষাচিত্র ২০০৯), পান করি জগৎ তরল (অ্যাডর্ন ২০১০), চারুঘাটের নৌকোগুলো (আড়িয়াল ২০১৩), নেশার ঘোরে কবিতা ওড়ে(আড়িয়াল ২০১৩), পাখিদের ধর্মগ্রন্থ (কৌরব ২০১৫) , নাভি ও নন্দন (চৈতন্য ২০১৫), রূপান্তরের ঘোড়া (অনুপ্রাণন ২০১৬)।
প্রবন্ধ, কবিতার নিজস্ব প্রহর (প্রত্ন ২০০২), পশ্চিমে হেলান দেয়া গদ্য (আড়িয়াল ২০১২), কফি শপ (বাহান্ন প্রকাশ ২০১৫)।