এই ওষ্ঠ বলেছে ভালোবসি…

উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের রোমিও জুলিয়েট নাটকের অন্তিমে বিষপানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে গিয়ে রোমিও বলেছিল ‘একটি চুম্বন, তারপর আমার মৃত্যু’। অথবা কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত নীরা বিষয়ক একটি কবিতার লাইন
এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে , ভালোবাসি–
এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?
ওষ্ঠের ভাষা কী চুম্বন? স্পর্শ, গন্ধ আর স্বাদে মস্তিষ্কে পৌঁছে যাওয়া ভালোবাসার এক আলোকিত আহ্বান? যে আহ্বানে মানব-মানবী সেই আবহমান কাল থেকে ঘর বাঁধে, সংসার গড়ে, জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকে?
নারী পুরুষের চুম্বনের ইতিহাস বহু পুরনো। ভালোবাসা প্রকাশের এই ভাষা বহুকাল ধরে মানুষ ব্যবহার করছে। এই প্রকাশভঙ্গীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জৈবিক তাড়না, যৌন সম্পর্কের গভীরতা আর কমিটমেন্ট।
চুম্বন নিয়ে গবেষণাও কম হয়নি। লেখা হয়েছে বই, আাঁকা হয়েছে ছবি, গাঁথা হয়েছে গান। চুম্বনকে নানা নাম দিয়েছে মানুষই। অলংকার জুড়েছে এই দুটি অক্ষরের সঙ্গে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে একজন স্বাস্থ্যবান মানুষ গড়পড়তা আয়ুষ্কালের ২০ হাজার মিনিট ব্যয় করে চুম্বনে।
প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদের আয়োজন চুম্বন নিয়ে নানা কথা উল্টেপাল্টে দেখা।

2385_perfect-red-rose-nails-and-lipsঅধর মরিতে চায় তোমার অধরে
চুম্বন হল দুই ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে কাউকে আদর করা বা স্নেহ প্রকাশ করা। সাধারণভাবে প্রেম, কাম, স্নেহ, অনুরাগ, শ্রদ্ধা, সৌজন্য অথবা শুভেচ্ছা প্রকাশার্থে অন্য কারো চিবুক, অধরোষ্ঠ, করতল, কপাল বা অন্য কোন অঙ্গে ঠোঁট অর্থাৎ অধরোষ্ঠ স্পর্শ করা। সৌভাগ্য কামনায়, সম্মান প্রদর্শনার্থে বা কিছু প্রাপ্তির আনন্দ প্রকাশার্থে ঐ বস্তুতে অধরোষ্ঠ স্পর্শ করানোও চুম্বন। স্নেহ-ভালবাসা প্রকাশার্থে চুম্বন একটি সাধারণ প্রথা।সঙ্গমের সময় এই চুম্বন একটি গুরুত্বপূর্ণ শৃংগার।
সংস্কৃত “চুম্বন” থেকে বাংলায় “চুমা”, “চুমু”, “চুমো” প্রভৃতি শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। মানব সভ্যতার বিভিন্ন পর্যায়ে নানা অনুষ্ঠান ও উৎসবে চুম্বন প্রথা ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এটি অভিবাদনের সাধারণ একটি রীতি। পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলিতেও চুম্বন বর্ণিত হয়েছে। হোমারের রচনা থেকে জানা যায় যে প্রাচীন গ্রিসে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পন্থা হিসেবে ওষ্ঠ, হস্ত ও পদ চুম্বনের প্রথা প্রচলিত ছিল। প্রাচীন রোমে, ইসাক ডি’ইসরায়েলির বর্ণনা থেকে জানা যায়, কেউ কেউ একনায়কের হস্ত চুম্বনের অনুমতি প্রাপ্ত হলে “নিজেদের ভাগ্যবান মনে করতেন”। আধুনিক যুগেও চুম্বন প্রায়শই ধর্মোপাসনার অঙ্গ হিসেবে পরিগণিত হয়।9264467f22e8e05d2ffe9ba3efc48430
তাহলে মানবসমাজে চুম্বনের শুরুটা কোথায়, আর কীভাবে? উত্তর দেয়াটা বেশ কঠিন। তবে ১৯৬০ সালে ইংরেজ প্রাণিবিজ্ঞানী ডেসমন্ড মরিস প্রথম প্রস্তাব করেন যে, চুম্বন সম্ভবত উদ্ভূত হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষ প্রাইমেট মায়েদের খাবার চিবানো আর সেই খাবার অপরিণত সন্তানকে খাওয়ানোর মাধ্যমে। শিম্পাঞ্জি মায়েরা এখনও এভাবে সন্তানদের খাওয়ায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও ব্যাপারটা ঠিক এভাবেই এবং এ কারণেই তৈরি হয়েছিল। আর এভাবেই একটা সময় চুম্বন মানববিবর্তনের একটি অংশ হয়ে ওঠে। এর পরিধি বৃদ্ধি পায় সন্তানের প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রেমিক-প্রেমিকার রোমান্টিকতায়, যার নানা ধরণের অভিব্যক্তি আমরা লক্ষ্য করি মানবসমাজের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে। ১৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে বৈদিক সাহিত্যে নাসিকা ঘর্ষণের কথা জানতে পারা যায় | যার মাধ্যমে প্রকাশিত হত নর নারীর প্রগাঢ় অনুরাগ | সাহিত্যে, মহাভারতের মত মহাকাব্যে পাওয়া যায় প্রথম চুম্বনের বীজ — সে ছুঁয়েছিল আমার ওষ্ঠ/ তৃপ্তির ফুল ফুটেছিল বুকে/ চারদিক জ্যোৎস্নাময়/ কী অফুরন্ত সুখে !

প্রথম চুম্বন
প্রথম চুমু কথটার মাঝে ঘোরলাগা বিষয় আছে। স্মৃতির পাতা উল্টে গেলে ঠিক শোনা যায় পেছনে ফেলে আসা অনেক সময় আগের সেই বুকের ধুকপুক। অনুভবে ফিরে আসে ওষ্ঠ আর জিব মিলেমিশে তৈরী তৈরী হওয়া তীব্র আস্বাদ। wallpapergang-1মনে পড়ে কোন এক ভালোবাসায় আচ্ছন্ন দিনের ছবি। প্রথম চুমু খাওয়ার ওপর সাহিত্যে শত শত লাইন লেখা হয়েছে, ব্যবহার করা হয়েছে বহু উপমা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই চুমুর মাঝে লুকিয়ে থাকে সংকেত। চুমু সহায়তা করে সঠিক সঙ্গী খুঁজে নিতে।
গবেষণা পাওয়া গেছে, পুরুষের তুলনায় একজন নারী অনেক বেশী চুম্বনকে গুরুত্ব দেয়। তাদের শরীরে যখন ‘প্রজেস্টেরন’ নামে একটি বিশেষ হরমোনের মাত্রা বেশী থাকে তখনই তারা বেশী চুমু খেতে চায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মেয়েরা তখন স্বাস্থ্যবান, নরম অবয়বের এবং নিম্ন কন্ঠের পুরুষকে চুমু খেতে বেশী আগ্রহী হয়। মেয়েদের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে তারা দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্য সম্পর্ক এবং সুন্দর সম্পর্কের জন্য চুম্বনের ভূমিকাকে সব সময় ভোটে এগিয়ে রাখে। বিজ্ঞান বেলে, নারীর ভেতরে বংশ বৃদ্ধির যে প্রবণতা কাজ করে তারই সূত্র ধরে তারা পুরুষ সঙ্গীকে বেঁধে রাখতে চায় চুম্বনে।

সে ছুঁয়েছিল আমার ওষ্ঠedith-shain-kiss1
ঠোঁটের মধ্যে ঠোঁট বসে যাওয়া-ইংরেজিতে যাকে ‘লিপ লক’ বলা হয় তার এতো জয়গান কেন? এই গভীর, মাদকতাময় স্পর্শের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে কেন মানব-মানবী? এই তীব্র আকর্ষণ কি শুধুই হৃদয়াবেগ প্রকাশের ভাষা না মানুষের মস্তিষ্কে ঘটে যাওয়া অন্য কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল?
মানুষের ঠোঁট হল দেহের সবচেয়ে পাতলা ত্বক। দেহের বাইরের দিককার ত্বকের সবকটা অংশ করনিয়াম নামের আবরণে আবৃত থাকে। ঠোঁট এতে একমাত্র ব্যতিক্রম, তাইতো ঠোঁটের ত্বক এত বেশি কোমল, নমনীয়।ত্বকের সংবেদনশীলতা নিয়ন্ত্রণের যে সংবেদী ছোট ছোট অণু রয়েছে তাদের ঘনত্ব ঠোঁটের ত্বকে অন্য যে কোনো জায়গার চেয়েও অনেক বেশি। ঠোঁটের সংবেদনশীলতা সরাসরি মস্তিষক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ঠোঁট দেহের অন্য যে কোনো জায়গা অপেক্ষা অনেক বেশি স্পর্শকাতর।  আমাদের মস্তিষেকর এক এক অংশ দেহের এক একটা জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে রাখে।

চুমুর বিপদ
চুমু খাওেয়া বিষয়টা মানব ইতিহাসে সবসমিই তার বিজয় নিশান উড়িয়ে থাকলেও মাঝেমধ্যে যে সংকটে পড়েনি এমন নয়।
মধ্য যুগে যখন গোটা ইউরোপ জুড়ে মহামারি দেখা দেয় প্লেগের কারণে তখন মানুষ চুমু খেতে ভয় পেত। চুম্বন তখন দ্রুত তার জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। সে সময়ে মানুষ চুমুর বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছিল ভ্রু উঁচু করা অথবা হাঁচি দেয়াকে।kiss...bang
এইডস রোগের আক্রমণের সময়ও চুমুর ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা জারি করে চিকিৎসা বিজ্ঞান। তখন একেবারে রেড অ্যালার্ট পরিস্থিতি। অপরিচিত ওষ্ঠ তখন চুম্বনের ক্ষেত্রে খলনায়কের ভূমিকায়। ওই সময় ‘ফ্রেঞ্চ কিস’ বা ‘ফরাসি চুম্বন’ বেশ সমালোচিত হয়। কাএই পদ্ধতিতে চুম্বন এইড ছড়াতে পারে। সাধারণ চুম্বন থেকে এই ফরাসি চুম্বনের বাড়তি বিশেষত্ব কি? আসলে সাধারণ চুম্বনে ঠোঁটের সঙ্গে ঠোঁটের সপর্শ ঘটানো হয়। কিন্তু ফরাসি চুম্বনে কেবলমাত্র ঠোঁটের স্পর্শ নয় জিবেরও বড় ভূমিকা থাকে। আর জিব থেকেই তো ঘটে লালার আদান প্রদান। ঘাতক এইডস জীবাণু কিন্তু আক্রান্তদের লালাতে ঘুরে বেড়ায়। সুতরাং অসতর্ক হলে বিপদ ঘটে যেতে পারে। তাই ওই সময়ে এই পদ্ধতির চুম্বন নারী, পুরুষ সবার কাছেই জনপ্রিয়তা হারায়।

ভালোমন্দের চুমু
চুম্বনের এক প্রান্ত যদি ধরে রাখে আলোকিত প্রেমের আহ্বান তবে তার অন্য প্রান্তে আছে বিজ্ঞান। খুঁজে পেতে বিজ্ঞানীরা চুমু খাওয়ার অনেক সুফল আবিষ্কার করেছেন। অবশ্য চুমু খাওয়ার বিপদও যে নেই এমন নয়। শুনলে অবাক হবেন না চুমু কমিয়ে দেয় উচ্চমাত্রার রক্তচাপ, কমায় কোলস্টোরল।
suchitra-sen-the-wrong-cheekগবেষণায় দেখা গেছে জৈবিক ভাবে আমাদের শরীরে চুমু একসঙ্গে তিন ধরণের হরমনকে উদ্দীপ্ত করে। এরা হচ্ছে, টেস্টোটেরন, ডোপামিন ও আরও কিছু ভালো-অনুভূতিদায়ক হরমোন। মুখের ভেতরে মিউকাস মেমব্রেনে এই হরমোনগুলো ছড়িয়ে পড়লে তা নারীকে উত্তেজিত করে এবং তার মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় সঙ্গমের জন্য। আর এই সঙ্গম থেকেই ঘটে বংশবৃদ্ধি।
চুম্বনের ফলে আমাদের শরীরের রক্তবাহী শিরাগুলো শিথিল হয়। আর তাতে করে মাথা ব্যথাও কমে যায়। কমে মাংশপেশীর খিঁচুনি।
চুম্বন সংকেত দিলে মানুষের মস্তিষ্ক একসঙ্গে ডোপামিন ও অক্সাইটোসিন নামে দুটো হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়। কিকিৎসকরা বলেন, এই দুই হরমোন শুধু মানুষের মনে আনন্দ সঞ্চরিত করে না সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখতেও সাহায্য করে।
চুমু খেলে মানব দেহে ক্যালেরিও বার্ন হয় দ্রুত। পাশাপাশি মানসিক চাপ এবং উত্তেজনাও দূর হয়।

চুমু নিয়ে যত কান্ড
tumblr_o87j3wkese1sodugzo8_1280চুমু নিয়ে পৃথিবীতে কান্ডকারখানার কোন অন্ত নেই। সিনেমার পোস্টার থেকে শুরু করে দীর্ঘতম চুম্বন-সব জায়গায় সুপারহিট। পঞ্চাশের দশকে হলিউডের ছবি ‘গন উইথ দা উইন্ড’-এর পোস্টারে নায়ক-নায়িকার চুমু খাওয়ার দৃশ্য আজ পর্যন্ত সবচাইতে রোমান্টিক দৃশ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মানুষের সবচাইতে দীর্ঘ চুমু খাওয়ার রেকর্ড রয়েছে ৫৮ ঘন্টা ৩৫ মিনিট এবং ৫৮ সেকেন্ডের।
তবে সিনেমায় রোমান্টিক চুম্বন দৃশ্য যেমন আছে তেমনি পৃথিবীর আকর্ষণীয় ঠোঁট নিয়েও জরিপ চালিয়েছে মানুষ। আর তাতে দেখা গেছে এখন পর্যন্ত সব চাইতে বেশী ভোট পেয়েছে অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ঠোঁট।
অনেক পুরুষ অথবা নারী আছে যাদের চুম্বনে ভীতি আছে। ডাক্তারি ভাষায় এটা একটি রোগ এবং এর নাম Philematophobia।

নয়ন চৌধুরী