ল্যাবরেটরি

দীপারনি ভট্টাচার্য্য

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

(কলকাতা থেকে) এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে আমি বড় হয়েছি। কোলকাতার ফুলবাগানের ডঃ শ্যামাপ্রাসাদ মুখার্জী ইনস্টিটিউশনে আমার উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা। আমার স্কুলের বেশির ভাগ বন্ধুরাও ছিলো আমারই মতো সাধারণ। নিজগুণে এখন অবশ্য অনেকেই বড় চাকরি বা ব্যবসা করছে দেশে বিদেশে। স্কুলের কথা মনে হলে আজও অনেক কথা মনে ভিড় করে। আমাদের স্কুলের লাইব্রেরীর মত লাইব্রেরী তখন পূর্ব-কোলকাতার আর কোন স্কুলে ছিলোনা। একই রকম সুনাম ছিলো আমাদের পদার্থ, রসায়ন বা জীববিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিরও। আমি যখন ছোট ক্লাসে ছিলাম তখন বড় দাদাদের ল্যাবরেটরি ক্লাসে যেতে দেখতাম। আমার ল্যাবরেটরি প্রেম শুরু তখন থেকেই।
মাধ্যমিকের পর আমাদের প্রায় পুরো দলটাই স্কুলেই এগারো ক্লাসে ভর্তি হই। বন্ধুরা স্কুলের নাম তখন ছোটো করে দেয় শ্যাম বয়েজ। হয়তো কোলকাতা বয়েজ এর সাথে মেলানোর একটা চেষ্টা। যাই হোক, এগারো ক্লাস থেকে আমার বহু প্রতীক্ষিত ল্যাবরেটরি ক্লাস শুরু হলো। পার্থ, গড়াই আমাদের স্কুলের কাছেই থাকতো। ওদের বাড়ীতে আর আমাদের স্কুলে কোল গ্যাসের লাইন ছিলো। সেদিন সকালেই পার্থ জানিয়ে দিলো, আজ গ্যাস নেই তাই বুনসেন বাতি জ্বলবেনা। অথচ সেদিনই আমাদের কেমিস্ট্রি ল্যাব। কিন্তু বুনসেন বাতি না জ্বললে ক্লাস হবে কিভাবে! বসে বসে গুলতানি করছি, একসময় শুভ্রাংশু বাবু বললেন, আজ ক্লাস হবেনা সবাই বাড়ী যাও।
অগত্যা একে একে বেরোচ্ছি এমন সময় শুভ্রাংশু ঘোষ ফোঁস করে উঠলো, নিলয়, তোর পকেটটা অত উঁচু কেনোরে?
নিলয় সে কথায় কান না দিয়ে পা বাড়ালো। কোথা থেকে যেন দারোয়ান শঙ্কর দা এসে জাপটে ধরলো তাকে। পকেট থেকে বেরোলো একটা কাঁচের বিকার। প্রথমে সে বলল, কেউ অজান্তে তার পকেটে রেখেছে। ব্যাপারটা ধোপে না টেকাতে বললো, স্যার, বিকারে করে চা খাবার ইচ্ছা আমার অনেক দিনের, পরের ক্লাসেই ফেরত দিতাম। প্রধান শিক্ষক প্রত্যুষ বাবু বললেন, ও বিকারগ্রস্থ, ওকে ছেড়ে দাও শুভ্রাংশু। পরের দিনের ক্লাসে মনের হলো শুভ্রাংশু কে একটু শায়েস্তা করা উচিৎ। ক্লাস শেষে সবাই একে একে বেরিয়ে গেল, আমি বেরোলাম শেষে।শুভ্রাংশু বাবু তখন একমনে কিছু একটা পড়ছেন। খানিকটা বিশুদ্ধ সালফিউরিক এসিড একটা বিকারে ঢেলে তাঁর পায়ের কাছে আগেই রেখেছিলাম। বেরোনোর সময় তাতে কিছুটা তামার ছিবড়ে ফেলে পালালাম। যা হওয়ার তাই হলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘর ভরে গেলো কপার সালফেটের ঘন বাদামী ধোঁয়াতে। ভীতুরডিম শুভ্রাংশু ঘোষ আগুন আগুন চিৎকার করতে করতে ল্যাব ছেড়ে labপালাল।

ব্যাপারটা দেখে ফেলেছিলেন আমাদের নবাগত ফিজিক্সের শিক্ষক ধৃতিব্রত বাবু। কানমলা মিলেছিলো ভরপেট। কাজেই বন্ধুদের আক্রোশ গিয়ে পড়লো ধৃতিব্রত বাবুর উপর। তার নাম হলো ধুতি বাবু। ঠিক হলো পরের ক্লাসেই ধুতি খুলতে হবে। কিন্তু তিনিতো প্যান্ট পরেন। তন্ময় বলল, তোরা ওসব আমার উপর ছেড়ে দে, যা বলছি শুধু তাই কর। জানি না কি হতে চলেছে; তবে তন্ময়ের নির্দেশে সেদিন ফিজিক্স ল্যাবে আমরা ব্রিজ-রেকটিফায়ার সার্কিট সাজাতেই পারলামনা। অগত্যা ধৃতিব্রত বাবুকেই হাত লাগাতে হলো। যখন তিনি নিজের হাতে সার্কিট বানাচ্ছেন এমন সময় সাপ্লাই অন হলো তিন সেকেন্ডের জন্য। ধৃতিব্রত তখন বিদ্যুৎ রসে নিমজ্জিত। সেদিন আর ক্লাস হলোনা।

জীববিজ্ঞানে সুকোমল বাবু ছিলেন খুব রাসভারী মানুষ। তুলনায় শুখেন্দু বাবু অনেক প্রাণখোলা। ব্যাঙ কেটে আমাদের জীববিজ্ঞানের ল্যাবের প্রকৃত যাত্রা শুরু হলো। ব্যাঙকে এক বিশেষ কায়দাতে অজ্ঞান করে তবে কাটা হতো। পদ্ধতিটার নাম “পিথ” করা। তাজা ব্যাঙকে হাতে ধরে পিথ করা সহজ নয়। আমি সেটা সুন্দর করতে পারতাম। পারে অবশ্য ক্লোরোফর্ম ব্যাবহার হতো। একদিন পিথ করছি, তাপস আমাকে সাহায্য করছে। হঠাৎ বিকট শব্দ, দেখি ব্যাঙকে অজ্ঞান করা দেখে তুহিন মাথা ঘুরে পড়ে গেল।
অরুণাভ ছিল তুহিনের মতোই দুর্বল হৃদয়। জীববিজ্ঞানের ল্যাব সে মোটামুটি এড়িয়েই চলতো। সেদিন সুকোমল বাবু বললেন, আজ রক্ত পরীক্ষা হবে। সবাই নিজের হাতে ছুঁচ ফুঁটিয়ে একফোঁটা রক্ত দেবে কাঁচের উপর। তার পর সেটা অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা হবে। রক্তের সঙ্গে সেই আমাদের নিবিড় ও প্রথম পরিচয়। সবাই একে একে পার হলো কিন্তু অরুণাভ আর আসেনা। শেষে সুকোমল বাবু নিজেই তার হাত টেনে নিয়ে বললেন, দেখ কিভাবে করতে হয়। হাত রইলো হাতের মুঠোয়, ছুঁচ ফোটাবার আগেই অরুণাভ অজ্ঞান। তখন সব ছেড়ে শুরু হলো অরুণাভর শুশ্রষা। তাকে বেঞ্চের উপর শুইয়ে সুকোমল বাবু নিজেই হাওয়া করতে লাগলেন। শুখেন্দু বাবু চোখে মুখে জল দিচ্ছেন। আমরাও নিজেদের মতো চেষ্টা করছি। শুধু কুনাল মল্লিক আর প্রণব পাল দেখলাম এক কোনে দাঁড়িয়ে গুঁজগুঁজ করছে। পরের ক্লাসে তাদের আবার ছুঁচ ফোঁটাতে হবে বলে।

এমন সময় অরুণাভ চেঁচিয়ে উঠলো, আমি কোথায়? সুকোমল বাবুর যেন ধরে প্রাণ এলো; বললেন, এই তো তুমি ভালোই আছো। অরুণাভ আবার প্রশ্নটা করলো, আমায় কোথায় রেখেছো?
– জাঙ্গিয়ারের বুক পকেটে।
ভিড়ের মধ্যে থেকে ভেসে এলো কথাটা। সবাই হেসে উঠলাম হো হো করে। আড় চোখে তাকিয়ে দেখি অরুণাভ নিজেও বোকা বোকা হাসছে।

ছবি: টুটুল নেসার ও জয়দীপ দে শাপলু