ভালোবাসার শহর -১

শারমিন শামস্

শারমিন শামস্

21dddd

আজিজ মার্কেটে বইয়ের দোকান।

ভালোবাসার শহর জিনিসটা কি? যে শহরে আমার ভালোবাসা থাকে? নাকি যে শহরকে আমি ভালোবাসি? নাকি দুইটাই? নাকি যে শহরে আমি ভালোবাসা খুঁজতে যাই? ভালোবাসা কি খুঁজে যাওয়া যায়? কিংবা ভালোবাসার শহর কি সেটাই, খুঁজতে খুঁজতে যেখানে গিয়ে ভালোবাসাকে খুঁজে পাওয়া যায়? ভারতের বেস্ট সেলিং লেখক চেতন ভগতের হাফ গার্লফ্রেন্ড পড়লাম মাস তিনেক আগে। সেখানে ছেলেটা ওর ভালোবাসার মেয়েটাকে খুঁজে পেতে কী না করে! শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কে গিয়ে হাজার হাজার মিউজিক ক্যাফেতে হারিকেন খোঁজা খুঁজে অবশেষে পেয়ে যায় মেয়েটাকে।তাও এক প্রচন্ড শীতের রাতে কয়েক কিলোমিটার দৌড়ে গিয়ে। পুরাই ফিল্মি। চেতনের উপন্যাস তো এখন ফিল্ম হচ্ছেই।

52933917a8a7b-3

শীতের রাতে ফুটপাতে পিঠা বিক্রি।

যাই হোক, ভালোবাসার শহর যদি হয় শহরটাকেই ভালোবাসা, শহরটার প্রেমে পরা, তবে সেই শহরের নাম নিশ্চিতভাবেই– ঢাকা! নিত্যদিন এই শহরটাকে ঘৃণা আর যন্ত্রণা দিয়ে স্পর্শ করে, চেখে, চেটে, গড়াগড়ি করে শেষ পর্যন্ত আমরা সকলেই এই উপলব্ধিতে আসি যে এই শহরটাকে ছেড়ে কিংবা একে ফিরিয়ে দিয়ে আমরা খুব বেশিদিন থাকতে পারি না। ঢাকার বাইরে পা রেখে দেশের যে প্রান্তেই যাই, একটা দুটো রাত পেরোলেই মনটা আইঢাই করতে থাকে ধুলাধুসরিত পথ, লাখ কোটি যানবাহনের ট্যা ফো, মানুষের গাদাগাদিওয়ালা ওই ঢাকার জন্যই। ঢাকায় কি আছে? কিচ্ছু নাই। একটা ভালো সবুজ পার্ক নাই, পার্কের আরামদায়ক বেঞ্চ নাই-যেখানে একা বসে থেকে পুরোনো প্রেমের কথা ভেবে ভেবে মন খারাপ করা যায়।

amika

ফুটপাতে কাপড়, জুতা বিক্রি।

একটা নিরিবিলি রাস্তা নাই যেখানে হেঁটে যাওয়া যায় নির্বিঘ্নে, একটা হু হু বাতাসওয়ালা সবুজ ময়দান নাই যেখানে হাতপা ছড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা যায়! এই শহরে বইয়ের দোকানে যাব বলে ফুরফুরে মন নিয়ে বের হই শাহবাগের দিকে। তারপর ঘামে গরমে যানজটে শব্দদূষনে বইয়ের প্রতি প্রেম ফুরুৎ করে উড়ে গিয়ে গা রি রি করতে থাকে আর শাপশাপান্ত করি নিজেকেই। তবু আজিজের চেয়ে আপন কোন বইয়ের দোকান আর হয় না। কিংবা নিউমার্কেটের সেই লাইব্রেরিগুলো, মর্ডান নামের স্টেশনারি, ফুচকার দোকান, চুড়ি, মালা টিপ আর আন্ডারগার্মেন্টসের পসরা সাজিয়ে বসা ফেরিওয়ালা। ন্যাপথলিন, সেফটিপিন আর তোয়ালে নিয়ে হুট করে সামনে এসে দাঁড়ানো ছেলেটা, পেয়ারা আর আমরাওয়ালা, ঝুড়িতে নাম না জানা টক টক ফল সাজিয়ে গেটের বাইরে বসা লোকটা,কেতলিতে চায়ের গন্ধ, অলিম্পিয়ার বিস্কুট আর কেক- এই সব আর কোথায় গেলে পাওয়া যায়? আর কোন দেশে কোন শহরে মানুষ এমন ঘৃণামাখানো ভালবাসা নিয়ে বাঁচে!

flower1455254931

ফুলের দোকান।

তাই ঢাকা আমার ভালোবাসা পেয়েছে। প্রেমিক হিসেবে শহর ক্যাটাগরিতে সে এক নম্বর। বলা যায় আমি একে ছাড়া একেবারে চলতেই পারি না। ঘৃনা আর চূড়ান্ত বিরক্তির দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকাই, ছ্যা ছ্যা করতে থাকি, ভুরু কুঁচকাই, ধমকাই, আস্ফালন করি- তবু ঢাকাকে ছাড়তে পারি না। এই অদ্ভুত দোটানাময় প্রেম আমার। এমন অর্ধশিক্ষিত, প্রায় অসভ্য প্রেমিক আমার- যার কোন নিয়ম মানার জ্ঞান নেই, পরিচ্ছন্নতার ইচ্ছে নেই, অশান্ত অস্থির আর সারাক্ষণ খেউ খেউ করছে! এমন এক দিকচিহ্নহীনকে ভালবেসে তার বুকে বাসা বেধে থাকি, তাকে ছেড়ে কোত্থাও যাই নে কো।

mg_5663

ফুটপাতে ফল বিক্রি।

হয়তো তার শরীরের গন্ধটা মিশে আছে আমার আত্মায়, আমার শৈশব কৈশোর তারুণ্যে! হয়তো আমি ওর রোদমাথা রাজপথে ছুটে যেতে যেতে নিজের সঙ্গে নিজের বলা কথা খুঁজে পাই, হয়তো হুড ফেলে রিকশায় যেতে আমি হু হু বাতাসে নতুন করে লড়াইয়ের শক্তি পাই, আরো সংগ্রাম আরো সংঘর্ষ, আরো অস্থিরতার ভিতরে কয়েক কোটি মানুষের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে মিশিয়ে আমি খুব আপন আপন এক অস্তিত্বের নাগাল পাই। এই ঢাকা, এই শহর- আমি তাকে ঘৃণা করি, আমি তাকে ভালো পাই, আমি তাকে খুব ভালোবাসি।

শীতের বিকেলে চিতই পিঠার ঝালে, কৃষ্ণচূড়ার দুপুরে মানিক মিয়ার বিস্তৃতিতে, সার সার শপিং মলের ঝলমলানিতে, কফি শপে, পিজ্জা হাটে, রিকশার হুট ফেলা সন্ধ্যায় রাশি রাশি আলো জ্বলা দোকান পথের পর হুট করে লোডশেডিংয়ের এলাকায় ঢুকে পরা ঘুটঘুটানি, টাউন হলের চ্যাচামেচিতে টুক করে নেমে পরে ফল কিনে নেয়া, পরিচিত হাসি হেসে মুরগিওয়ালার সাথে কুশল বিনিময়! এই শহরে আমি এক ভালোবাসার বাতি জ্বালিয়ে রাখি, দিনমান তাকে গোপনে লাই দিয়ে বাড় বাড়াই। আমার প্রেমিক, তার নাম ঢাকা- তাকে ছেড়ে যাবার কথা কক্ষনো ভাবি না।