মটরসাইকেল ডায়রী…২

সুব্রত গোস্বামী

সুব্রত গোস্বামী

এই সে বিখ্যাত আরাকু ভ্যালি। চারটে বাইক সহ শুধুমাত্র আমরা চারজন, পাহাড় ঘেরা আস্ত একটা সবুজ উপত্যকা আর মাঝ নভেম্বরের মিষ্টি একটা সকাল। কমল মিত্রের মত মানুষের মনও রোম্যাণ্টিক হতে বাধ্য।

আবার সামনে অনেকটা চলতে হবে, তাই ঘিঞ্জি আরাকু শহরে দাঁড়িয়ে একটু চা খেয়ে নেওয়া।  এই চা ব্যাপারটা বাইক ট্রিপে এক অন্য মাত্রা আনে। ঘণ্টা দেড়েক চালানোর পরই কোথাও দাঁড়ানো। আর দাঁড়ানো মানেই মোটামুটি তা চায়ের দোকান দেখে তবেই। আরাকু ছাড়ার খানিক পরেই আবার উড়িষ্যায় ঢুকে পড়লাম। এলাকাটা অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা আর ছত্রিশগড়, তিন রাজ্যের মিলনস্থলের মত। একই দিনে অন্ধ্রপ্রদেশ ছেড়ে উড়িষ্যা হয়ে ছত্রিশগড় পৌঁছব আজ আমরা।

অনন্তগিরি যাবার পথে

অনন্তগিরি যাবার পথে

এটা উড়িষ্যার কোরাপুট। মুলতঃ আদিবাসি অধ্যুষিত অঞ্চল বলে শুনেছি। এ পথে কোনো মানুষের সঙ্গে দেখা হয়নি। প্রকৃতি তার উজাড় করা সৌন্দর্য নিয়ে আপনার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। এ হেন প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে সাক্ষী হয়ে থাকার লোভ সামলানো বড্ড কঠিন। আর আমার মত লোভী মানুষের পক্ষে তো নয়ই।

কোরাপুটের এই পথটা বেশ কিছুক্ষণ আমাদের চোখে নদী পাহাড় আকাশ বয়ে নিয়ে এগিয়ে চলল। মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে কোথাও বা কিঞ্চিৎ ফলাহার কোথাওবা শুধুই জলাহার। আমরা আবার ছত্রিশগড়ে ঢুকে পড়েছি। জগদলপুর পৌঁছতে হবে। সেখান থেকে আরো চল্লিশ কিলোমিটার গেলে তবে চিত্রকূট।

চিত্রকূট ফলসের সামনে আমার বাইক।

চিত্রকূট ফলসের সামনে আমার বাইক।

চিত্রকূটের দণ্ডামি লাক্সারি রিসর্ট। কাল এখানে পৌঁছতে একপ্রস্থ নাইট বাইকিং করতে হয়েছে। সে এক অন্য রোমাঞ্চ। হোটেলের ঘর থেকেই চিত্রকূট জলপ্রপাত দেখা যায়। আজ ভোর পাঁচটায় উঠে ছটায় বেরিয়ে পড়ার তাড়া নেই। তিনশ কিলোমিটার কভার করার চ্যালেঞ্জ নেই। মোটামুটি একটা গাহাতপা ছাড়া ভাব সকলের মধ্যে। তবে একেবারে শুয়ে বসে কাটালে হবেনা। কাছে গিয়ে চিত্রকূটের জলপ্রপাত চাক্ষুষ করতে হবে। তারপর কাঙ্গের ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক যেতে হবে, তিরথগড় ফলস দেখতে হবে। সেও প্রায় যাতায়াত মিলিয়ে একশষাট কিলোমিটার বাইকিং। ভেতর ভেতর একটা তাড়া আছে বইকি।

চিত্রকূট

চিত্রকূট

হোটেলের ঘর থেকে চিত্রকূট দেখার পর কাছে এসে এমন দৃশ্য দেখে আমরা চমকিত। ইন্দ্রাবতীর বুকে জলপ্রপাতের ধোঁয়া আর সূর্যের সম্মিলিত কারসাজী রামধনু এঁকে রেখেছে। দুচোখ ভরে গিললাম। আর মনেমনে কল্পনা করতে থাকলাম বর্ষায় চিত্রকূটের উদ্দাম রূপ। ব্রেকফাস্ট করার সময় দোকানির কাছে জানতে পারলাম মাঝিরা ডিঙি নিয়ে প্রপাতের জলে গা ভিজিয়ে নিয়ে আসেন। অতএব সময় নষ্ট নাকরে তড়িঘড়ি নিচে নামা, লাইফ জ্যাকেট পরে নৌকোয় উঠে পড়া, আর ক্যামেরা তাক করে প্রকৃতির এক অনবদ্য সৃষ্টির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা।

নাহ্‌, একবার দেখেই তৃপ্ত হয়ে ঢেকুর তুলব এমন বান্দা আমরা নই। অতএব আরো একবার। একেবারে কাছে গিয়ে যে ভয় হচ্ছিলনা, এমনটা বললে বেশ মিথ্যেই বলা হবে। তবু দ্বিতীয়বার। আমরা বেশ ভালোরকমই জানতাম, বস্তাপচা লাইফ জ্যাকেটটা একটা ছেলেভোলানো খেলনা মাত্র। প্রপাতের ভারে নৌকো কুপোকাত হলে বেঁচে হয়ত ফিরতাম, কিন্তু মোবাইল হারালে এই স্মৃতিচিত্রের পরিকল্পনার আক্ষরিক অর্থেই সলিল সমাধি হত সেদিন।

টাইডার রিসর্ট।

টাইডার রিসোর্ট।

রানাদা আর অশোকদা আজ আর তিরথগড় যাবেনা। বলল এপাশটাই ঘুরে দেখবে। চিত্রকূটের প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে বিকেলে আরো দুবার ওরা দুজন ওই নৌসাফারি করেছিল শুনেছি। আমি আর চির বেরিয়ে পড়লাম। কাঙ্গের ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক। লাল কাঁকড়ের পথ। মোটরবাইল চলেছে আপন মহিমায়। বাকি তিনখানা হাই-এণ্ড বাইকের পাশে আমার একশ সিসির ক্ষুদ্র জীবটি যে এমন পারফর্ম করবে আশা করিনি। আসার আগে অনেকেই দুয়ো দিয়েছিল। “বাইক গাড়িতে তুলে নিয়ে ফিরতে হবে”, “দড়ি দিয়ে রানাদার বুলেটের পেছনে বেঁধে নিস” গোছের। পার্থদা, রানাদা, চির এরা কিন্তু সাহস জুগিয়েছিল। আর সাহস জুগিয়েছিল বলেই ঝুঁকিটা নিয়েছিলাম। ঝুঁকিটা নিয়েছিলাম বলেই না অভিজ্ঞতার ঝোলায় এমন একটা রূপকথা জন্ম নিচ্ছে। টিমমেটদের আড়ালে বাইকটাকে বেশ কয়েকবার চুমু খেয়েছি। এটা ওর প্রাপ্যই বটে।

পৌঁছলাম কুটুমসার গুহা। গাইড নিয়ে ঢুকতে হয়। গুহায় ঢুকে টর্চটা বন্ধ করে দিলে বিশ্বাস করা কঠিন যে চোখ খুলে আছি। এ এক জীবন্ত গুহা। প্রকৃতি আজও সৃষ্টির খেলা চালিয়ে যাচ্ছে এ গুহার ভেতর।

কুটুমসার গুহা

কুটুমসার গুহা

কুটুমসারের উলটো পথে ষোলো কিলোমিটার মত চালিয়ে এসে পৌঁছলাম তিরথগড় ফলস। দেখা হয়ে গেল এঁদের সঙ্গে। ছবি তোলায় এঁদের বড় আপত্তি। পারলে থাবাও বসিয়ে দেয়।

তিরথগড় ফলসটা কিন্তু চিত্রকূটের থেকে একদম আলাদা। এটা ধাপে ধাপে নামে। চিত্রকূটের মত হুড়মুড়িয়ে নয়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে স্নানের লোভ সামলানো মুশকিল। কুটমসারের গাইডের কথা শুনে বুঝলাম চিত্রকূটের সঙ্গে এদের একটা মানসিক রেষারেষি আছে। বোরগুহা বনাম কুটুমসার আর চিত্রকূট বনাম তিরথগড়।

unnamed

তিরথগড় ফলসের সামনে চির

ফেরার পথে জগদলপুরে জলখাবার খেতে খেতে সন্ধে নেমে এল। অন্ধকারে বাইকিং করার লোভে ইচ্ছে করেই গড়িমসি করছিলাম। চল্লিশ কিলোমিটার পথ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। হোটেলের আরামশয্যা আমাদের অপেক্ষায় রয়েছে। ডিনার সেরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমিয়ে নিতে হবে। কাল ভোরে আবার নতুন পথের উদ্দেশে রওনা।

সকাল ছটা বাজতে পাঁচ। বাইক চারখানা আমাদের অপেক্ষায়। রানাদার সময়জ্ঞান বেশ ভালো। আর ছবি তুলতে হবে বলে আমায় সবার আগে তৈরি হয়ে নিতেই হয়। কিন্তু আজ চিরও বেশ সময় মতই। ওকে তাড়া লাগাতে হয়নি।

বেড়িয়ে পড়লাম ভবাণীপাটনার পথে। তবে গতকাল চিত্রকূটের যে সৌন্দর্য্য চাক্ষুশ করেছি তা বারবার ভেসে উঠছে। এই ভোরে যদি সম্ভব হত তবে নৌকো করেই আরো বার দুয়েক ঘুরে আসতাম ইন্দ্রাবতীর বুকে। তা হলনা যখন তখন দুরত্বই সই। যাদের পিঠে চেপে এতদূরে এলাম তাদের এ দৃশ্য না দেখালে ভারি অন্যায় করা হবে।(চলবে)