পতনেও বড় কষ্ট পায় তারা, মৃত্যুতেও

রাজা ভট্টাচার্য্য

রাজা ভট্টাচার্য্য

( কলকাতা থেকে) আমার স্কুলটা এমন পাড়ায় যে, একবার স্কুলে ঢুকে গেলে আর বেরোতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু অন্তত একবার – আর কেউ না-বেরোলেও – আমায় বেরোতেই হয়। চা খেতে যাই বিডন স্ট্রিটের একটা চায়ের দোকানে। যেদিনই সেই যাওয়াটা হয় সাড়ে বারোটা নাগাদ – দেখতে পাই এক ভদ্রলোককে। ধীর গতিতে সাইকেল চালিয়ে আসেন তিনি ; স্পষ্টতই বয়েসের ভার তাঁকে গ্রাস করেছে। পরনে রোজই থাকে একটা আধময়লা লুঙ্গি আর ফতুয়া। সাইকেলের সামনের ক্যারিয়ারে থাকে একটা গণশক্তি আর একটা আঠার কৌটো। চায়ের দোকানের ঠিক উলটো দিকেই একটা বোর্ডে তিনি সেঁটে দেন নতুন কাগজটা – বড় যত্নে, বড় শ্রদ্ধায়। তারপর এক কাপ চা খেয়ে আবার ধীরে ধীরে সাইকেল চালিয়ে চলে যান মিনার্ভার দিকে। আমি চা খেতে খেতে ভাবি – এখন আর কে-ই বা পড়ে এই কাগজটা! তিনি নিশ্চই ভাবেন না ; কেননা তাঁর নিষ্ঠায় আমি কখনো ভাঁটা পড়তে দেখি নি।
আজও গেছি চা খেতে। একটু দেরিই হয়েছে আজ – কাজ ছিল স্কুলে। গিয়ে অভ্যেসবশতঃ চোখ গেল বোর্ডটার দিকে। দেখি, কালকের কাগজটাই তখনো টাঙানো। কী ব্যাপার? ভাবতে ভাবতেই দেখি – আসছেন তিনি, দেরি হয়ে গেছে বলে আজ গতি কিঞ্চিত বেশি। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে লেগে পড়লেন দৈনন্দিন কাজে। লাগানো হল নতুন কাগজ। কাজ সেরে রোজকার মতোই এসে বসলেন পুরনো কাঠের বেঞ্চে, আমার ঠিক পাশটিতে। আর তক্ষুনি বেজে উঠল তাঁর ফোন। পকেট থেকে বেরলো আদ্যিকালের একটা নোকিয়া এগারশো আট। আর পাশে বসে একদিকের প্রতিক্রিয়া শুনেই আমি বুঝে গেলাম – মস্ত একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে তাঁর বাড়িতে। -“কী বলছিস!… কে বলল তোকে?… ঠিক শুনেছিস তুই?…” ইত্যাদি কথার ওই একটাই মানে হয়। কথা সেরে, ফোন পকেটে রেখে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন তিনি – মুখে তাঁর সদ্য আত্মীয়হারা হওয়ার বেদনার গাঢ় রেখা।
পাশে বসা প্রায়-সমবয়সী ভদ্রলোক এঁর পরিচিত – দু’জনের কথাবার্তা ঠাট্টাতামাসা এর আগেও শুনেছি আমি। আজ তিনিই প্রথম শুধোলেন -“কী হয়েছে, রমেনদা? বাড়িতে সবাই ঠিক আছে তো?”
গভীর বিষাদের সঙ্গে তিনি বললেন -“না রে। ফিদেল কাস্ত্রো একটু আগে মারা গেছেন।”fidel-castro
সামনে এসে দাঁড়ানো অল্পবয়সী ছেলেটি এবার উৎকণ্ঠা ভেঙে হেসে উঠল হো হো করে। বলল সে হাসি-ভরা গলায় -“বেঁচে ছিলেন না কি! উরিব্বাস – কতদিন পর নামটাই শুনলাম! মাইরি, আপনি না…এমনভাবে কথা বলছিলেন – আমি তো ভেবেছি বাড়িতেই…পারেনও বটে…”- বলে হাসতে হাসতে গিয়ে বসল আবার বেঞ্চে, নিজের ছেড়ে-আসা জায়গাটায়।
কোনও প্রতিবাদ করলেন না তিনি। শুধু শোকস্তব্ধ অভিমানী চোখে একবার তাকালেন ছেলেটির দিকে। তারপর মাথা নীচু করে বসে রইলেন চুপ করে। বেশ খানিক পরে অস্ফুটে বললেন -“বাড়িতেই তো…..”

আর অমনি আমার চোখে ভেসে উঠল একটা পড়ো পড়ো আদ্যিকালের ঘর। বড়মার – মানে আমার বড়জেঠিমার ঘর সেটা। তার কুলুঙ্গিতে দু’টো ছবি। গাভাসকার আর কাস্ত্রোর। জীর্ণ জানলায় আমরা ছোটরা লিখে রাখতাম আগুন-ঝরানো স্লোগান – দেওয়াল থেকে মুখস্থ করে আনতাম সেগুলো ; যদিও মানে বুঝতাম না আদৌ। মনে পড়ল আমার জেল-খাটা বাবা, গুলি-খাওয়া ন’জ্যাঠামণি আর বিনা-দোষে ফাঁসি যেতে বসা ছোটকাকুর কথা। মনে পড়ল বাড়ির উলটোদিকের কারখানাটার দেওয়ালের অপটু হাতের লিখন -‘শহীদ দীপু লাল সেলাম। সত্তরের দশক মুক্তির দশক।’ আমার জ্ঞান হতে হতে সে লেখা প্রায় মুছে এসেছে – তবু পড়া যায় বইকি!

কাস্ত্রো ভাল ছিলেন, না মন্দ ; মুক্তিযুদ্ধের নায়ক ছিলেন, না ভয়াল একনায়ক – আমি জানি না। রাজনীতি আমি বুঝি না। তবে এটুকু বুঝি – একটা গোটা প্রজন্মকে তিনি – আর তাঁর মতো আরও কয়েকজন – স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। মুক্তির স্বপ্ন। সাম্যের স্বপ্ন। সে পথে হাঁটতে গিয়ে কোথায় যে ভুল হয়ে গিয়েছিল – অত বোঝার বুদ্ধি নেই আমার। কারা সেই স্বপ্ন ভাঙিয়ে আখের গুছিয়ে নিল – তাও ভাল বুঝি না। কিন্তু আজও সে স্বপ্ন যে কয়েকজন মলিন লুঙ্গি-পরা মানুষের বুকের মধ্যে ডানা ঝাপটায় – দেখাই যাচ্ছে। পতনেও বড় কষ্ট পায় তারা, আবার মৃত্যুতেও।

সাইকেলটা টানতে টানতে আস্তে আস্তে ফিরে যাচ্ছিলেন একজন আধবুড়ো মানুষ। আর আমি ভাবছিলাম – ইতিহাস শুধু সফল স্বপ্নই মনে রাখে কেন!